১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গৌরবের ২৫ বছর ॥ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী

  • অমল সাহা

২৫ বছর পূর্ণ করল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। গত ২৫ নবেম্বর শিক্ষা কার্যক্রমের ২৫ বছর পূর্তি হয়। রজতজয়ন্তীর এই দিনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো ৫ম সমাবর্তন। সমাবর্তন অনুষ্ঠান ও বছরব্যাপী রজতজয়ন্তী উদ্যাপনের সূচনালগ্নে গত বুধবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সনদপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট ও স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। শিক্ষক-কর্মকর্তারাও ছিলেন আনন্দিত- উদ্বেলিত। আমন্ত্রিত অতিথিরা ছিলেন উৎফুল্ল। এ অনুষ্ঠানে আলোক বর্তিকা জ্বালিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মোঃ আবদুল হামিদ। সমাবর্তন শোভাযাত্রা সহকারে মঞ্চে আসন গ্রহণের পর বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং তিনি সভাপতির ভাষণের শেষ লগ্নে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পুরনো খেলার মাঠে। এখানে তৈরি করা হয় বিশাল প্যান্ডেল ও মঞ্চ। অনুষ্ঠানকে ঘিরে একদিন আগে থেকেই অংশগ্রহণকারী গ্র্যাজুয়েটদের কালো গাউন পরে, টুপি মাথায় মহড়া শুরু করে। অনুষ্ঠান শুরুর আগেও স্বর্ণপদকপ্রাপ্তরা কিভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে পদক গ্রহণ করবেন সে ব্যাপারে বাস্তব ধারণা দেয়া হয়। দুপুর ২টা থেকে সমাবর্তন অনুষ্ঠান স্থলে আসতে শুরু করেন অতিথিরা। গ্র্যাজুয়েটরা এসে নির্ধারিত আসন গ্রহণ করেন। ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত যে সমস্ত শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে তাদের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার গ্র্যাজুয়েট এই সমাবর্তনে উপস্থিত ছিলেন।

বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটে সমাবর্তন শোভাযাত্রা সহকারে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ মঞ্চে আসেন। তিনি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠান শুরুর পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বক্তব্য রাখেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গ্র্যাজুয়েটদের ডিগ্রী প্রদান ও পরীক্ষার ফলাফলে অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারীদের স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। পরে পর্যায়ক্রমে বিশেষ অতিথি ও সমাবর্তন বক্তা বক্তব্য রাখেন। ট্রেজারার কর্তৃক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়। ক্রেস্ট বিনিময় শেষে অনুষ্ঠানের সভাপতি, রাষ্ট্রপতি ৪টা ৭ মিনিটে তাঁর ভাষণ শুরু“করেন। ভাষণ শেষ করেন ৪টা ১৭ মিনিটে। ভাষণের শেষ লগ্নে রাষ্ট্রপতি খুলনা বিশ্বদ্যিালয়ের রজতজয়ন্তী উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। রজতজয়ন্তীর মূল অনুষ্ঠান হবে আগামী ২৫ ডিসেম্বর।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আদর্শ শিক্ষক-গবেষক জাতির মূল্যবান সম্পদ, অনুসরণীয় আদর্শ। শিক্ষক-গবেষকদের জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রজ্ঞা ভবিষ্যত জাতি গঠনের অন্যতম নিয়ামক শক্তি। তাই শিক্ষার মান্নোয়নের প্রয়োজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ এবং জ্ঞানের প্রতি গভীর অনুরাগী শিক্ষকম-লী যারা নিজেরা নিরন্তর সর্বশেষ জ্ঞানচর্চায় রত থাকবেন এবং তা শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ করবেন। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ওতপ্রতোভাবে জড়িত উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সফল গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত জ্ঞান মানব জাতির অশেষ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। তিনি বলেন, খুলনা অঞ্চলে রয়েছে জীববেচিত্র্যে সমৃদ্ধ সুন্দরবন ও সামুদ্রিক সম্পদ সমৃদ্ধ বিশাল উপকূল। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষকদের প্রতি এ জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় মূল্যবান সম্পদ বিষয়ে গবেষণা জোরদারের আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা প্রফেসর ইমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের ক্ষেত্র নয়, নতুন জ্ঞান সৃষ্টিই তার বড় কাজ। তাই গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ সেখানে থাকতে হবে, গবেষণার ফল প্রকাশ করতে হবে, সবাই দেখবে আমরা নতুন কী করলাম। সারা পৃথিবীতে এখন জ্ঞানের যে-বিস্ফোরণ ঘটছে, তা বিস্ময়কর। পৃথিবীর এককোণে বসে আমরা সেই জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হতে চাই। তার সঙ্গে নিজেদের সৃষ্ট জ্ঞান যুক্ত করতে চাই। এ কথা জানতে হবে যে, জ্ঞানের সৃষ্টি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন নয়, সমাজ ও দেশের প্রয়োজন। সমাজ যদি জ্ঞানভিত্তিক না হয়, তার অগ্রগতি থেমে যেতে বাধ্য। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান বলেন যে, খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পঁচিশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। রজতজয়ন্তীর এ প্রেক্ষাপটে দেশের তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উচ্চশিক্ষার বিকাশে স্থানীয় সম্পদ আহরণ, উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং দেশকে সমৃদ্ধির সোপানে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া সত্যি গৌরবের বিষয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর বলেন, ১৯৮৭ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯১ সালের ২৫ নবেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু“হয়। অনেক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই দিনটিকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস তথা রজতজয়ন্তীর দিনেই ৫ম সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির কারণে এই যুগলবন্দী সম্ভব হয়েছে।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত যে সমস্ত শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে তাদের রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রীর স্বীকৃতিস্বরূপ সনদপত্র প্রদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫টি স্কুলের ডিনবৃন্দ ও চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্ব-স্ব স্কুল ও ইনস্টিটিউটের গ্র্যাজুয়েটদের রাষ্ট্রপতির সামনে উপস্থিত করেন। অনুষ্ঠানে ১ জনকে পিএইচ ডি ডিগ্রী এবং পরীক্ষার ফলাফলে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ১৪ জনকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ১৩ জন রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন। স্বর্ণপদকপ্রাপ্তরা হলেন- বিজ্ঞান প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা স্কুলের ইলেক্ট্রনিক্স এ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপিনের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের উজ্জ্বল বিশ্বাস, গণিত ডিসিপিনের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের রীনা পারভীন, গণিত ডিসিপিনর ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের আফরোজা পারভীন, পদার্থবিজ্ঞান ডিসিপিনের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের মোঃ ইমরান হোসেন, জীববিজ্ঞান স্কুলের ফিসারিজ এ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপিনের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের জয়ন্ত বীর, এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপিনের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শেখ মোজাম্মেল হোসেন, ফিসারিজ এ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপিনের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের শারমীন আক্তার, এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপিনের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের জয়দেব গোমস্তা, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় প্রশাসন স্কুলের ব্যবসায় প্রশাসন ডিসিপিনের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের মোঃ রুবেল হাসান বাপ্পী, ২০১১-১২ শিক্ষবর্ষের জান্নাতুল ফেরদৌস বৃষ্টি, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের মোহাইমিনুল ইসলাম, সামাজিক বিজ্ঞান স্কুলের অর্থনীতি ডিসিপিনের ২০১১-১২ শিক্ষবর্ষের অপূর্ব রায়, ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের নুসরাত জাহান ও চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রিন্ট মেকিং ডিসিপিনের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের লুৎফন্নাহার লিজা। এদের মধ্যে ফিসারিজ এ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপিনের জয়ন্ত বীর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। পিএইচডি ডিগ্রীপ্রাপ্ত হয়েছেন মোঃ হাসানুজ্জামান।

সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারী কৌশিক, দিলরুবা, মাসুদ রানাসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় তারা সকলেই উচ্ছ্বাস ও আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, এ দিনটির কথা ভোলার নয়। এ ক্যাম্পাসে তারা বহু দিন কাটিয়েছেন, কিন্তু এমন আনন্দ কখনও হয়নি। কালো গাউন, ক্যাপ মাথায়, টাইপরা-এর অনুভূতিই আলাদা। এ দিনটি সব সময় আসে না। সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে ক্যামেরা ও মোবাইলে গ্রুপভিত্তিক ছবি তোলেন, আনন্দে ছুটোছুটিও করেন তারা।

ইতিহাসের পাতা থেকে : ১৯৮৭ সালের ৪ জানুয়ারি এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সংক্রান্ত আদেশ সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের সূচনা হয় এবং ১৯৮৯ সালের ৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে ৪টি ডিসিপ্লিনে (আর্কিটেকচার, কম্পিউটার সায়েন্স এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, আরবান এ্যান্ড রুরাল প্লানিং ও ব্যবসায় প্রশাসন) ৮০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে ৩০ আগস্ট প্রথম ওরিয়েন্টেশন ও পরদিন ৩১ আগস্ট খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯১ সালের ২৫ নবেম্বর শিক্ষাকার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষাকার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া