২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টিপিপি ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

  • যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের যে চাহিদা রয়েছে, তা দখলে চলে যেতে পারে ভিয়েতনামের

খায়রুল আলম ষ

আন্তঃপ্রশান্তীয় অংশীদারিত্ব বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) চুক্তি মুক্ত বাণিজ্য এলাকা গঠনের চুক্তি। এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার বারোটি দেশ এই চুক্তিতে সম্মত হয়। বহুল আলোচিত এই চুক্তি প্রস্তাব আলোর মুখ দেখে গত ৫ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় দীর্ঘ আলোচনার পর এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ব্রুনাই দারুস সালাম, কানাডা, চিলি, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, পেরু, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। বর্তমান বিশ্বের মোট বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এইগুলো। এই চুক্তির মাধ্যেমে নিজেদের মধ্যকার শুল্ক বাধা কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ নীতি অনুসরণ করে এসব দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব বাড়াবে বলে আশা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই চুক্তি বাংলাদেশের জন্য ভয়ের কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হবে ভিয়েতনাম। টিপিপিতে থাকায় ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিনা শুল্কে তৈরি পোশাক রফতানি করতে পারবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের যে চাহিদা রয়েছে, তা দখলে চলে যেতে পারে ভিয়েতনামের। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রায় ১৬ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করে। এ বিষয়ে বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই ) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে বাংলাদেশ যদি বিভিন্ন পণ্য আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনতে না পারে, তাহলে আগামী দিনে আমাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকাবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভিয়েতনাম যদি টিপিপিসহ আসিয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বড় বগ বাণিজ্যিক জোটে নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন তা পারছেন না তা আমাদের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।’

টিপিপির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেই মনে করছেন পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম। তিনি বলেন, চুক্তিটির ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেই আমরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ব। এটিই আমাদের বড় বাজার। তবে কানাডায় শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকায় সমস্যা হবে না। শহিদউল্লাহ আজিম আরও বলেন, ‘চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো এক লাফে এগিয়ে গেল। সবার জন্য সমান সুযোগ আর থাকল না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের পোশাক রফতানিতে ১৭ থেকে ২২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। তবে ভিয়েতনাম এখন শূন্যশুল্কেই রফতানি করতে পারবে। সব মিলিয়ে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হতে যাচ্ছে।’ তবে আশার কথা হলো ভিয়েতনামসহ টিপিপির অন্য দেশগুলোর বর্তমানে এত সক্ষমতা নেই যে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের সব চাহিদা পূরণ করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। তবে এটিকে আমাদের এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে।

ডেইরি পণ্য ও ওষুধশিল্প খাতের সুরক্ষা নিয়ে ১২টি দেশের মতপার্থক্য থাকলেও চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে তা দূর হলো। এই চুক্তির ফলে দেশগুলো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিনা শুল্ক সুবিধা পাবে। বাণিজ্য-সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব চুক্তির (ট্রিপস) ফলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজস্ব মেধাস্বত্ব আইনের আওতায় উন্নত বিশ্বের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছিল। কিন্তু টিপিপিতে ‘বাণিজ্য সম্পর্কিত মেধা’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এখন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থে উন্নত প্রযুক্তি কিনতে হবে। বাংলাদেশের কৃষি খাত ও ওষুধশিল্প এতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে টিপিপির আওতায় ১২টি দেশ তাদের পরস্পরের জন্য শুল্ক অপসারণ করলে তাতে চীনের জিডিপি কমবে দশমিক ২ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ২০৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। আর বাংলাদেশের জিডিপি কমবে দশমিক ১১ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ১০ কোটি ১৬ লাখ ডলার। টিপিপির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া থাকায় এই জিডিপি কমার ধারণা করা হয়েছে।

পাকিস্তানের দৈনিক ‘ডন’ এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, টিপিপি চুক্তি স্বাক্ষরের এক সপ্তাহের মাথায় এ চুক্তির বাইরে থাকা তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশগুলো ইতোমধ্যেই নিজেদের অর্থনীতিতে টিপিপির সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণ করতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ চুক্তি কার্যকর হলে টিপিপিবহির্ভূত ভারত, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক রফতানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস পাবে। স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এখনও টিপিপি চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও টিপিপিবহির্ভূত দেশে চুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ ও হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, টিপিপি চুক্তির অংশীদার হিসেবে সবচেয়ে লাভবান হবে ভিয়েতনাম। এ চুক্তি থেকে লাভের হিসেবে ভিয়েতনামের পরে অবস্থান করবে মালয়েশিয়া। টিপিপি চুক্তির সম্ভাব্যতার কারণেই চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ভিয়েতনামের বস্ত্র খাতে বিদেশী কোম্পানিগুলো প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য ভয়ের কারণ।

তৈরি পোশাক রফতানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশ। জিএসপি সুবিধা ছাড়াই একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ সালের পুরোটা সময় বাংলাদেশ থেকে দেশটির পোশাক আমদানি ছিল নিম্নমুখী। চলতি বছর থেকে এই ধারা পরিবর্তন হতে থাকে। ২০১৫ সালের প্রথম ৬ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক থেকে রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র পোশাক আমদানি করেছে ২৮০ কোটি ৮৮ লাখ ২১ হাজার ডলারের। গত বছর ঠিক একই সময় ছিল ২৫৬ কোটি ৩ লাখ ৫৭ হাজার ডলার। সেই হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২৪ কোটি ৮৪ লাখ ৬৪ হাজার ডলার। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উত্তর আমেরিকার ক্রেতা জোট এ্যালায়েন্সের পোশাক কারখানা পরিদর্শনের পর বাংলাদেশের ক্রেতাদের প্রতি আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানির আয়ের প্রবৃদ্ধি গত বছর ঋণাত্মক থাকলেও এবছর ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। রফতানি বাড়লেও, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার দখলে তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। ২০০০ সাল থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাজার দখলে একই অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এখন পোশাক রফতানিতে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে। এ সময়ে প্রতিযোগী দেশ হিসেবে ভিয়েতনামের পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া ও হুন্ডুরাসও দাঁড়িয়ে গেছে। তাই টিপিপি নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় টিপিপি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার তেমন কিছু নেই। বরং এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে বিশ্ববাজারে নিজেদের সক্ষমতা প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি অর্থনীতির নতুন দ্বার উন্মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সুচিন্তিত ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : গণমাধ্যম ও উন্নয়নকর্মী

alammym@gmail.com