২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আবার সংলাপ সংলাপ খেলা

  • শাহীন রেজা নূর

বেশ কিছুদিন নীরব থাকার পর অবশেষে মওদুদ সাহেব আবার মুখ খুলেছেন। শুধু মুখই খোলেননি, জাতির এই ‘সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে’ কিভাবে দেশ ও জাতি উদ্ধার পেতে পারে তার পথ বাতলেছেন তিনি। দেশে মৌলবাদী তথা উগ্রপন্থী ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করতে ভোলেননি এই কীর্তিমান ব্যারিস্টার। সম্প্রতি নিজ দল বিএনপির সমর্থক বা মতাবলম্বী একটি সংগঠনের সভায় বক্তব্য দানকালে তিনি দুই দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন ‘জাতীয় সঙ্কট’ কাটিয়ে উঠবার জন্য। এর একটি হচ্ছে অবিলম্বে সর্বদলীয় ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান ও দ্বিতীয়টি হলো সন্ত্রাস দমনে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। এই করিৎকর্মা আইনজ্ঞ কোন নতুন কথা বলেননি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে যে খেসারত আজ তার দলকে দিতে হচ্ছে তা থেকে বেরুবার জন্য আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের এই দাবিটি বিএনপি সেই ডে-ওয়ান থেকেই করে আসছে। আর প্রস্তাবিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে জঙ্গী-জামায়াতের তত্ত্বাবধানে বিএনপি দেশব্যাপী জ্বালাও-পোড়াও ও পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করতে দ্বিধা করেনি। তাছাড়া, তাদের বিদেশী মুরব্বিদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের ওপর অযাচিত অন্যায় ও অযৌক্তিক চাপ প্রয়োগ করতেও কসুর কম করেনি। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এত সত্ত্বেও যখন সরকারকে একবিন্দু টলানো গেল না বরং দেশে-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি ক্রমশই উজ্জ্বলতর হলো, তখন ‘দেশনেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া লন্ডন পাড়ি জমিয়ে ছিলেন তার দুর্নীতিবাজ পুত্রের সঙ্গে বসে ভবিষ্যত ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা প্রণয়নের জন্য।

তিনিও বিদেশ গেলেন আর দেশেÑ বিদেশী নাগরিক, ব্লগার, মুক্তবুদ্ধি প্রকাশক হত্যা শুরু হলো, শিয়াদের ওপর বোমা হামলা হলো। বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব থাকার দাবি তুলে বিদেশীদের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে দেয়ার অপপ্রয়াসও কম হলো না। যে বিএনপি এতকাল জামায়াত-বিএনপির হত্যা-সন্ত্রাসকে রাজনৈতিক কর্মকা- হিসেবে অভিহিত করে এসেছে এবং সরকার এসব সহিংসতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে গেলেই জামায়াত-বিএনপি এবং তাদের সুশীল বাবুরা ও বিদেশী প্রভুরা সব শেয়ালের এক রা’ এর মতো করে এই বলে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে যে, সন্ত্রাস দমনের নামে সরকার প্রতিপক্ষীয় রাজনীতিবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদদের ঘায়েল করছে। মোদ্দাকথা, তারা বাংলাদেশে মৌলবাদী সন্ত্রাসী থাকার কথা এতদিন একটিবারের জন্যও স্বীকার করেনি। তাদের মতে এসবই নাকি সরকারের সাজানো নাটক। র‌্যাব ও পুলিশ যখন প্রায়দিনই অস্ত্র, গোলা-বারুদ, জেহাদী বই আর বোমা বানাবার পদ্ধতি ও জঙ্গী প্রশিক্ষণের সিডি ইত্যাদিসহ জামায়াত-শিবির-বিএনপি নেতাকর্মীদের আটক করছে তখন বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ হতে এদের সন্ত্রাসী নয়, রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দাবি করা হয়। হাতে-নাতে গ্রেফতার, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী, সাক্ষী-সাবুদ-প্রমাণ ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও বিএনপি-জামায়াত এদের সন্ত্রাসী হিসেবে মানতে নারাজ। আর এর সহজ ও একমাত্র কারণটি হচ্ছে, এসব সন্ত্রাসীকে তো সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিএনপি-জামায়াতই মাঠে নামিয়েছে। সরকার উৎখাতের জন্য গণতান্ত্রিক পথে না গিয়ে সন্ত্রাসের পথে কার্যসিদ্ধি সহজতর বলে ভেবেছিল তারা। তাছাড়া, জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক কোন নির্বাচনে বিজয় লাভ আদৌ সম্ভব কিনা সে ব্যাপারেও বিএনপি দ্বিধান্বিত থাকায় সহিংস পন্থায়ই কার্যকর হবে বলে তাদের ধারণা। আর এই ধারণাটি সন্দেহাতীতভাবে বিদেশী প্রভুদের পরামর্শে তারেক ও বেগম জিয়ার কাছ থেকেই এসেছে। তারেকের জঙ্গী কানেকশনের তথ্য, দলিল-দস্তাবেজ ও প্রমাণপুঞ্জি যে দেশী-বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের কাছে আছে তাতে বলাই বাহুল্য!

মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিম, উলফা, লস্করে তৈয়বা, জেএমবি, হুজি, জইশে মোহাম্মদ, আনসার উল্লাহ বাংলা টিম, হিযবুত তাহ্্রীর ইত্যাদির সঙ্গে জামায়াতের সহায়তায় খালেদা-তারেকের সম্পর্ক যে কত নিবিড় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকেরই হয়ত স্মরণ আছে, এই তারেক জিয়াই একসময় ঢাকার এক জনসভায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী গংয়ের হাতে হাত রেখে এই ঘোষণা দিয়েছিল যে, ‘আমরা একই পরিবারের সদস্য।’ এরপর থেকে অদ্যাবধি তাদের মধ্যকার সখ্য, পেয়ার-মহব্বত এতই গাঢ় যে একে ‘এক দুযে কে লিয়ে’ বললেও ভুল হবে না। অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াত এখন অভিন্ন সত্তা।

এই দুটি সংগঠনই প্রধানত পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের ক্রীড়নক হিসেবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এই রাজনীতির প্রধানতম বৈশিষ্ট্যই হলো ভারতবিদ্বেষ। ভারতবিরোধী ব্যাপক অপপ্রচার, বাঙালী সংস্কৃতিবিরোধী ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম আর ধর্মের অপব্যবহারের মাধ্যমে সরলপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে বাংলার আবহমান সেক্যুলার তথা অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও চরিত্র ধ্বংস করার যাবতীয় আয়োজনের মাধ্যমে এক জঘন্য অপরাজনীতির সূত্রপাত ঘটিয়েছে তারা। আইএসআইর রীতিমতো পেরোলে আছে বিএনপি। এ কথা আইএসআইর সাবেক প্রধান পাকিস্তানের আদালতে একটি মামলায় সাক্ষ্য প্রদানকালে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন। একাত্তরে সশস্ত্রযুদ্ধে পাকিস্তানকে পরাজিত করে বাংলাদেশের জন্মলাভ পাকিস্তানবাদী প্রতিক্রিয়াশীল ও তথাকথিত ধর্ম ব্যবসায়ীদের পক্ষে কিছুতেই মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি এবং হচ্ছেও না। আর তাই যে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা সেই ভিতটিকেই ধসিয়ে দেয়ার সর্বক্ষণিক প্রয়াস-প্রচেষ্টা চালায় বিএনপি ও জামায়াত। গণতান্ত্রিক উপায়ে জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নির্বাচনে জয়লাভপূর্বক ক্ষমতারোহণের কোন প্রকার চিন্তা-চেতনাই এদের মাথায় বোধকরি এখন আর কাজই করে না।

মওদুদ সাহেব ও রিপন সাহেবরাও কর্তাভজা নীতি অনুসরণ করে চলেছেন। অথচ, নির্বাচনের পূর্বে সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক উদ্যোগ ও প্রয়াসকে তারা সেদিন কি অসভ্যতার সঙ্গেই না উপেক্ষা করেছিল। বেগম জিয়া এযাবতকাল যে ধরনের সব অভব্য ও অসংস্কৃত আচরণ করেছেন তা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি কি ধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগেন! বিএনপির এত বড় বড় ব্যারিস্টার, আমলা, সাংবাদিক, অধ্যাপক, থিংট্যাংক, বুদ্ধিজীবী কি করে তারেক জিয়া ও বেগম জিয়ার এসব অভব্য ও অশালীন আচরণ সহ্য করেন বা নির্দ্বিধায় মেনে নেন! শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে তারেকের টেলি-সংলাপ যারা শুনেছেন তারা তার অভব্য ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের পরিচয় পেয়েছেন নিশ্চয়ই! একইভাবে বেগম জিয়ার যে সকল টেলি-কথোপকথন ফাঁস হয়েছে, তাতে নিজদলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি তার স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কোচিত চেহারাটাই প্রকট হয়ে ওঠে নয় কি?

লেখাটি শুরু করেছিলাম ব্যারিস্টার মওদুদের নতুন ফর্মুলা নিয়ে। তার এই ফর্মুলা মোতাবেক জঙ্গী বা সন্ত্রাস প্রতিরোধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার যে আহ্বান জানানো হয়েছে তা যে ‘সোনার পাথর বাটি’ ছাড়া কিছু নয়, সে কথা এই বিজ্ঞ ব্যারিস্টার বোঝেন না তা কি হয়? তবু তিনি কেন এই প্রস্তাব দিচ্ছেন? দিচ্ছেন এই জন্য যে, সরকার বিএনপির রক্তমাখা হাতের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে হাত যে মেলাবে না তা তিনি বিলক্ষণ বোঝেন ও জানেন।

সরকার বর্তমান বিএনপিকে সঙ্গে করে কোন ঐক্য গড়ে তোলা বা তাদের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠানে রাজি না হলেও বিএনপির এক প্রকার লাভ। আর তা হলো, তখন তারা দেশবাসীকে ও তাদের বিদেশী মুরব্বিদের মন জয়ের জন্য একথাই বোঝাতে চাইবে যে, আমরা সঙ্কট সমাধান করতে চাই, কিন্তু সরকার চায় না। আবার সংলাপ হলেও যেহেতু কোন-প্রকার ইতিবাচক সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সুতরাং সেক্ষেত্রেও তাদের লাভ। তখন তারা বলতে পারবে যে, সরকার আন্তরিক নয়, সমঝোতা চায় না, বিএনপিকে ধ্বংস করতে চায় ইত্যাদি। মওদুদ সাহেবদের আজকের বাস্তবতায় এ কথা বুঝতে হবে যে, চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র-ধাপ্পাবাজি জনগণ এখন পুরোটাই বুঝতে পারে। সুতরাং, তাদের বিপথগামী করার এ জাতীয় সস্তা ও বস্তাপচা কৌশল আর কাজে দেবে না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক