২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যাংক হয়রানির অভিযোগ ৪ হাজার গ্রাহকের

  • গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণায় শাস্তির ব্যবস্থা চান গবর্নর

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আর্থিক অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হয়ে প্রায় ৪ হাজার অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহকরা। এর মধ্যে ১৩৮৮ অভিযোগ ফোনে ও ২ হাজার ৫৪২ অভিযোগ লিখিতভাবে করেন। এসব অভিযোগগুলো শতভাগ নিষ্পত্তি এবং গত বছরের তুলনায় কমেছে বলে দাবি বাংলাদেশ ব্যাংকের।

গেল বছর অভিযোগের শীর্ষে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বেসরকারী ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। রবিবার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স রুমে গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটির মোড়ক উন্মোচন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান। যারা ব্যাংকিং খাতের গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে, বেইমানি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর। একই সঙ্গে প্রতিবছর এ ধরনের কতজন প্রতারককে কি ধরনের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে তা প্রকাশিত রিপোর্টে তুলে ধরারও নির্দেশ দেন তিনি।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৩০টি অভিযোগ আসে। এবারই প্রথম আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অভিযোগের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরের গ্রাহকরা ৪ হাজার ৪৭৬টি অভিযোগ করেছিল। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৪ হাজার ২৯১টি। অর্থাৎ নিষ্পত্তির হার ছিল ৯৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

গত বছরের তুলনায় অভিযোগ কমেছে। এর পাশাপাশি নিষ্পত্তি হয়েছে শতভাগ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে ৩ হাজার ৯৩০টি। নিষ্পত্তির এই হার আগের অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ২৯১টি বা ৯৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে। যা মোট অভিযোগের ৫৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, গেল অর্থবছরে প্রাপ্ত অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে। এর পরিমাণ ২৫৬টি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে বেসরকারী খাতের ব্র্যাক ব্যাংক। এ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মোট ১৭৫টি অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা রূপালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে ১৪৯টি। একইভাবে অগ্রণী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৪০টি, ইসলামী ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১২৩টি, জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১০৬টি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৮২টি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৭৯টি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৭০টি এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৫৯টি অভিযোগ এসেছে। এদিকে, গেল অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ২৮টি, বেসরকারী ব্যাংকে ৯৪টি ও বিদেশী ব্যাংকে ৫টি পরিদর্শন কার্যকম পরিচালনা করা হয়। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ১৪ বার পরিদশর্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় রাষ্ট্রীয় খাতের অগ্রণী ব্যাংকে। নতুনভাবে যুক্ত হওয়া ফারমার্স ব্যাংকে পরিদর্শন করা হয় ৯ বার। এছাড়া ইউসিবি ব্যাংকে ৭ বার, সোনালী ব্যাংকে ৬ বার এবং এনসিসি, প্রিমিয়ার ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে ৫ বার করে পরিদর্শন চালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এফআইসিএসডি।

প্রতিবেদন দেখা যায়, গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত মোট ১৪ হাজার ৯২০টি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে সবগুলো নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর মধ্যে টেলিফোনে সাধারণ ব্যাংকিং সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৮৪১, ঋণ ও অগ্রিম সংক্রান্ত ২০৮, কার্ড সংক্রান্ত ৮২, মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্ত ৫২, ট্রেড বিল সংক্রান্ত ২১, রেমিটেন্স সংক্রান্ত ৩৮ ও বিবিধ অভিযোগ ছিল ১৪৬টি। এছাড়া গতবছর লিখিতভাবে ২ হাজার ৫৪২টি অভিযোগ আসে। সাধারণ ব্যাংকিং সংক্রান্ত ৫২০, ঋণ ও অগ্রিম সংক্রান্ত ৪৬২, স্থানীয় বিল সংক্রান্ত ৪১২, বৈদেশিক বিল সংক্রান্ত ৩৬৮, কার্ড সংক্রান্ত ১৪৬, ব্যাংক গ্যারান্টি সংক্রান্ত ৮৭, মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্ত ৩৯, রেমিটেন্স সংক্রান্ত ২৬ ও বিবিধ অভিযোগ ছিল ৪৮২টি।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় গ্রাহকের হয়রানি ও ঝামেলামুক্ত সেবা প্রদান ব্যাংকিং খাতের একটি অঙ্গীকার হওয়া উচিত। আর এ অঙ্গীকার পূরণে সহায়তা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বদ্ধপরিকর। গবর্নর বলেন, গ্রাহকদের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকগুলোও প্রতিযোগিতামূলক উন্নত সেবাদানের মাধ্যমে গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন ও গ্রাহক ভিত্তি প্রশস্ত করতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রতি তিন মাস পরপর একটি গ্রাহক সমাবেশ করার আহ্বান জানিয়ে গবর্নর বলেন, যাতে করে ব্যাংকার ও গ্রাহক সম্পর্ক আরও সৃদৃঢ় হয়।

অদৃশ্য চার্জ (হিডেন চার্জ) সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা আছে গ্রাহককে না জানিয়ে কোন ব্যাংক কোন প্রকার চার্জ কর্তন করতে পারবে না। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সেই ব্যাংকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল এ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম আমজাত হোসেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর এস কে সুর চৌধুরী, কনজুমার এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম রহমান এবং এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের সভাপতি আলী রেজা ইফতেখারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের উর্ধতন কর্মকর্তারা।