২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সরকারী গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারে রেকর্ড ॥ সওজ অধিদফতরের ৫৫১ যানের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ নেই

সরকারী গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারে রেকর্ড ॥ সওজ অধিদফতরের ৫৫১ যানের জন্য জ্বালানি বরাদ্দ নেই
  • চলছে যথেচ্ছ অপব্যবহার ॥ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য

নাজনীন আখতার ॥ সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ৫৫১ যানবাহনের জন্য কোন জ্বালানি বরাদ্দ নেই। চলছে যথেচ্ছ অপব্যবহার। সরকারী গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের প্রবণতা রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। বছরে এক কিলোমিটার সড়কের জন্য প্রায় ৪০ হাজার টাকা শুধু জ্বালানি খাতে ব্যয় করা হয়েছে। চলতি মাসে সরকারী হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের পারফরম্যান্স অডিট (২০০৩Ñ২০০৬) প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা না থাকায় এবং গাড়ি ব্যবহারকারীদের অবৈধভাবে জ্বালানি ব্যয় পূরণ সুবিধা অব্যাহত রাখায় জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হচ্ছে। কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবেদনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে ব্যবহৃত গাড়িগুলোর জ্বালানি ব্যয়ের একটি হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের আওতাধীন কার, জীপ, পিকআপ, বাস, মাইক্রোবাস, ট্রাক প্রাধিকার এবং প্রয়োজন অনুসারে সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অথচ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে এ দায়িত্ব পালন করছে না। জ্বালানি ব্যয় অপরিহার্য হলেও অধিদফতরের জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত জ্বালানি কেনার জন্য কোন বাজেট বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করা হয়নি। ২০০৩Ñ২০০৪ অর্থবছর থেকে ২০০৫Ñ২০০৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৫৫১ যানবাহনের জ্বালানি কেনার জন্য কোন বাজেট রাখা হয়নি। বাজেট প্রণয়নের সময়ে এ ব্যয়ের বরাদ্দ না রাখা হলেও জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন কাজের তহবিল থেকে করা হচ্ছে। আর এ কারণে ব্যয় সরকারী হিসাবে স্থান পায়নি।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, শুধু সরকারী কাজে নয় ব্যক্তিগত কাজেও অনেক কর্মকর্তা গাড়ি ব্যবহার করছেন। এতে উল্লেখ করা হয়, বরাদ্দ সংক্রান্ত সীমারেখা না থাকায় যানবাহনের প্রাধিকারভিত্তিতে বা দফতরভিত্তিতে নিজ নিজ এলাকার ভেতরে শুধুমাত্র সরকারী কাজে গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে না। নিয়ম ভেঙে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের প্রবণতা রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে গেছে। আর এটা প্রতিরোধেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

নিরীক্ষায় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে গাড়ি ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ঢাকা বিভাগে ২৬৮ কিলোমিটার সড়কে ২০০৩Ñ২০০৪ অর্থবছরে জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে ৯১ লাখ ৭ হাজার ৬৩৫ টাকা। ২০০৪Ñ২০০৫ অর্থবছরে ৯৩ লাখ ৪৫ হাজার ৫৬১ টাকা এবং ২০০৫Ñ২০০৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৫ লাখ ৪৯ হাজার ২৯৫ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ২০০৫Ñ২০০৬ অর্থবছরে প্রতি কিলোমিটার সড়কের জন্য ৩৯ হাজার ৩৬৩ টাকা জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে ১৯১ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার সড়কে ২০০৫Ñ২০০৬ অর্থবছরে ৬১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮৮ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ওই অর্থবছরে প্রতি কিলোমিটার সড়কের জন্য ৩২ হাজার ৪৩ টাকা জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে।

মানিকগঞ্জে ২২৭ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার সড়কে ২০০৫Ñ২০০৬ অর্থবছরে মাত্র তিন মাসে ৩০ লাখ ১৪ হাজার ৫২৪ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ওই অর্থবছরে প্রতিকিলোমিটার সড়কের জন্য ১৩ হাজার ২৫৭ টাকা জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে।

মৌলভীবাজারে ৩২৫ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার সড়কে ২০০৪Ñ২০০৫ অর্থবছরে জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে ১৯ লাখ ৪০ হাজার ৯৫৪ টাকা। ২০০৫Ñ২০০৬ অর্থবছরে ৪১ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫৮ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। ওই অর্থবছরে প্রতিকিলোমিটার সড়কের জন্য ১২ হাজার ৮৪২ টাকা জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেখা যাচ্ছে, বছরে ১ কিলোমিটার সড়কের জন্য ৩৯ হাজার ৩৬৩ টাকা শুধুমাত্র জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে। সর্বমোট ২১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার সড়ক চলাচল উপযোগী রয়েছে। এভাবে উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ থেকে জ্বালানি ব্যয় করা হলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা না থাকায় এবং গাড়ি ব্যবহারকারীদের অবৈধভাবে জ্বালানি ব্যয় পূরণ সুবিধা অব্যাহত রাখায় জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হচ্ছে। নিরীক্ষা মন্তব্যে বলা হয়েছে, জ্বালানি বরাদ্দ দেয়া এবং ভ্রমণসূচী মোতাবেক জ্বালানি সরবরাহ, লগ বইতে এন্ট্রি করে মাসিক জ্বালানি ব্যবহার হিসাবনিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকে প্রেরণ বাধ্যতমূলক করা হয়নি। ব্যক্তিগত সুবিধা লাভের জন্য জাতীয় স্বার্থের অর্থাৎ উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন তহবিল যথেচ্ছ ব্যবহার করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে, ঢাকা বিভাগ ও বাকি তিনটি জেলা থেকেই কর্তৃপক্ষ পৃথক পৃথকভাবে যুক্তি উপস্থাপন করে আপত্তিগুলো নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে।

ঢাকা বিভাগ থেকে আপত্তি নিষ্পত্তির সুপারিশ করে বলা হয়, ৭৭টির মধ্যে ৬২ যান সচল ছিল ওই সময়ে। সরকারী ও জনগুরুত্বপূর্ণ কাজের স্বার্থেই পরিদর্শন যান ও বিভিন্ন ধরনের যান ব্যবহারের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যয় করা হয়েছে। এতে কোন আর্থিক ক্ষতি হয়নি। একই তথ্য দিয়ে মৌলভীবাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই জ্বালানি ব্যয়ে কোনভাবেই উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়নি। নারায়ণগঞ্জ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে বিভিন্ন সড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ওসব গাড়ি ও যন্ত্রপাতি সার্বক্ষণিক ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া তিনটি ফেরিঘাটও পরিচালনা করা হয়েছে। বাস্তব প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন জ্বালানি ইস্যু বা অর্থ ব্যয় করা হয়নি। মানিকগঞ্জ কর্তৃপক্ষ জানায়, বালিরটেকে ফেরিঘাটে তেল সার্ভিসিংয়ের লুব্রিকেন্ট নেয়া হয়। এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আলাদা জ্বালানি ও মেরামত বরাদ্দ না থাকায় জ্বালানি ব্যয় বেশি হয়।