২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৫ দেশের সঙ্গে যোগাযোগে উন্মোচিত হচ্ছে নতুন দিগন্ত

  • পহেলা জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ ভারত নেপাল ভুটানের মধ্যে সড়কপথে পণ্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচল

তৌহিদুর রহমান ॥ বাংলাদেশের সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচ দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে সড়ক ও নৌ পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিস্তৃত হচ্ছে। আগামী বছরের শুরুতে আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। এই লক্ষ্যে দুটি আঞ্চলিক ফোরাম কাজ করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এসব তথ্য জানায়।

সড়ক ও নৌ পথে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে এখন দুটি আঞ্চলিক ফোরাম কাজ করছে। একটি বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের (বিবিআইএন) মধ্যে সড়ক যোগাযোগ চালু করা। অপরটি বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীনের (বিসিআইএম) উদ্যোগ বাস্তবায়ন। এ ছাড়াও এসব দেশের মধ্যে পৃথক দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে আগামী বছরের শুরুতে এই অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচিত হতে চলেছে।

সূত্র জানায়, আগামী পহেলা জানুয়ারি হতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে সড়ক পথে পণ্য ও যাত্রীবাহী যান চলাচল শুরু হবে। বিবিআইএন’র উদ্যোগের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই চার দেশের মধ্যে পরীক্ষামূলক যান চলাচল শুরু হয়েছে। চার দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক চালু হয়েছে। আর পহেলা জানুয়ারি হতে যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে সড়ক পথে এই চার দেশের যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক সরাসরি আসা যাওয়া করতে পারবে। এদিকে বিবিআইএন উদ্যোগের পাশাপাশি বিসিআইএম উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীন একযোগে কাজ করছে। বিসিআইএম উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে এই চার দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের লক্ষ্যে সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর ফলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত সরাসরি সড়ক পথে যাতায়াত করা সম্ভব হবে। কলকাতা থেকে কুনমিং সড়ক যোগাযোগের জন্য প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হবে। কুনমিং থেকে কলকাতার দূরত্ব দুই হাজার ৪৯০ কিলোমিটার। চার দেশ একত্রে এই অর্থ সরবরাহ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে আঞ্চলিক ফোরাম ছাড়াও বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও চলছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে নৌ সিল্ক রুট চালু করার জন্য ইতোমধ্যেই চীন প্রস্তাব দিয়েছে। আর নৌ সিল্ক রুটে যুক্ত হওয়ার জন্য বেজিংয়ের প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে ঢাকা। দেশটির ওই প্রস্তাব ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নৌ সিল্ক রুটে যোগ দেয়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সড়ক পথে সিল্ক রুটের পাশাপাশি সমুদ্র পথে সিল্ক রুট পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দিয়েছে চীন। বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের কাছে নৌ সিল্ক রুটে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। চীনের এই প্রস্তাবে ইতোমধ্যেই সাড়া দিয়েছে বিভিন্ন দেশ। চীনের দক্ষিণ সাগর থেকে ভারত মহাসাগর, আরব সাগর, ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে যুক্ত হবে চীনের এই সিল্ক রুট। চীনের এই সিল্ক রুটে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপও রয়েছে।

নেপাল ও ভুটান উভয় দেশই বাংলাদেশের নৌ রুট ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভুটানের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠকে বাংলাদেশের নৌ রুট ব্যবহারের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সড়ক পথের পাশাপাশি বাংলাদেশের নৌ রুট ব্যবহার করে তার দেশে পণ্য নিতে চায় ভুটান। এছাড়া নেপালের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের কাছে একই প্রস্তাব রয়েছে। সড়ক পথে পণ্য ও যাত্রী সেবা চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও নৌ রুটের বিষয়ে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌ রুট আবার চালু হচ্ছে। এই রুট চালুর ফলে বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্য আনা নেয়ার ক্ষেত্রে আর সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কার বন্দর ব্যবহার করতে হবে না। দুই দেশ সরাসরি পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে। এর ফলে উভয় দেশের জাহাজকে অতিরিক্ত সাড়ে তিন হাজার নটিক্যাল মাইল আর ঘুরতে হবে না। এছাড়া বাংলাদেশের নৌ পথ ব্যবহার করে পণ্য নেয়ার জন্য ইতোমধ্যেই ‘ল্যান্ড লকড’ দেশ হিসেবে পরিচিত নেপাল ও ভুটানও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

দেশভাগের আগে ব্রিটিশ শাসনামলে চট্টগ্রাম, কলকাতা, রেঙ্গুন, চেন্নাই, বিশাখাপত্তম ও মুম্বাই বন্দর দিয়ে সরাসরি জাহাজ চলাচল করত। সে সময়ে পণ্য আনা নেয়ার পাশাপাশি জনসাধারণও এসব জাহাজে চলাচল করতেন। তবে দেশভাগের পরে এসব রুট বন্ধ হয়ে যায়। এখন নতুন করে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্য ও সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য নতুন করে নৌ রুট চালু হচ্ছে। ইতোমধ্যেই দিল্লীতে এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সই হয়েছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পণ্য আনা নেয়ার জন্য বর্তমানে শ্রীলঙ্কা ও সিঙ্গাপুরের তিনটি নৌবন্দর ব্যবহার করা হয়। শ্রীলঙ্কার কলম্বো ও হাম্বানটোটা এবং সিঙ্গাপুর নৌবন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে এসব পণ্য আনা নেয়া করা হয়। দুই দেশের পণ্য আনা নেয়ার ক্ষেত্রে কোন চুক্তি না থাকায় এতদিন ধরে এসব বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা নেয়া করা হচ্ছিল। এক্ষেত্রে কলকাতা বন্দর থেকে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা ও কলম্বো নৌবন্দরে পণ্য পাঠানো হতো। সেখান থেকে পণ্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দরে আনা হতো। আবার বাংলাদেশের পণ্য নেয়া হতো সিঙ্গাপুর নৌবন্দরে। সিঙ্গাপুর থেকে পণ্য নেয়া হতো কলকাতা বা বিশাখাপত্তম নৌবন্দরে। এ ক্ষেত্রে উভয় দেশের জাহাজকে অতিরিক্ত সাড়ে তিন হাজার নটিক্যাল মাইল ঘুরতে হতো। সে কারণে অপচয় হতো সময় ও অর্থ-দুটিরই। এখন থেকে সরাসরি দুই দেশের মধ্যে পণ্য আনা নেয়া সম্ভব হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নৌ চুক্তিতে বেশ কয়েকটি রুট চূড়ান্ত করা হয়েছে। এসব রুটের মধ্যে রয়েছে ভারতের কলকাতা, হলদিয়া, পারাদ্বীপ, বিশাখাপত্তম বন্দর থেকে বাংলাদেশের মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করবে। এছাড়া মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও আশুগঞ্জের মধ্যেও ভারতীয় পণ্যবাহী ছোট ছোট জাহাজ চলাচল করবে। এসব জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত তাদের উত্তর-পূর্ব প্রদেশে পণ্য পাঠাতে পারবে। এছাড়া একইভাবে ভারতের নৌপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশও বিভিন্ন স্থানে পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে। খুব শীঘ্রই দুই দেশের মধ্যে এই নৌ রুট চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নৌ রুটে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের পাশাপাশি যাত্রীবাহী জাহাজও চলাচল করতে পারবে। এর ফলে ঢাকা থেকে কলকাতা অথবা বিশাখাপত্তমের মধ্য দিয়ে সরাসরি যাত্রীরা দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করতে পারবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পর্যটক দিনে দিনে বাড়ছে। সে কারণে বিশাখাপত্তম, কলকাতা, ঢাকা ও সেন্টমার্টিনের মধ্যে জাহাজ চালানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে উভয় দেশ। ঢাকা থেকেই বাংলাদেশের পর্যটকরা কলকাতা ও বিশাখাপত্তমে যেতে পারবেন। এর ফলে দুই দেশের মধ্য সাধারণ যাত্রীদের চলাচলে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে।

সূত্র জানায়, দুই দেশের মধ্যে নৌ রুট চলাচল চুক্তির মধ্যে দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেননা নৌ রুট ব্যবহার করে ভারতের কলকাতা ও বিশাখাপত্তমের পণ্য সহজেই বাংলাদেশের আশুগঞ্জ নৌবন্দর দিয়ে উত্তর-পূর্ব প্রদেশের ‘সাতবোন’ খ্যাত রাজ্যগুলো পণ্য আনা নেয়া করতে পারবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ভারত টন প্রতি পণ্যের মাশুল দেবে। তবে সাতবোন খ্যাত রাজ্যগুলো বাংলাদেশের নৌবন্দর ব্যবহার না করে কলকাতা ও বিশাখাপত্তম থেকে ভারতের মধ্যে দিয়ে পণ্য আনা নেয়ার ক্ষেত্রে এর দ্বিগুণ খরচ হবে।