১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অন্তরালে

  • তাপস মজুমদার

থেমে গেল প্রণয়নৃত্য

বিস্তর জল্পনা-কল্পনা ও তুমুল প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ভারতের বিহারে জনতা দলের (সংযুক্ত) নেতা নিতীশ কুমারের নেতৃত্বে শপথ নিয়েছেন ২৮ মন্ত্রী। নীতিশ স্বভাবতই হবেন মুখ্যমন্ত্রী। আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) নেতা লালুপ্রসাদের দুই ছেলে তেজস্বী ও তেজপ্রতাপ হয়েছেন মন্ত্রী। পুত্র তেজস্বীর রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। উল্লেখ্য, গো-খাদ্য কেলেঙ্কারিতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় লালু আরও নয় বছর ভোটে লড়ার সুযোগ পাবেন না। সেক্ষেত্রে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার স্বাদ পেতে হবে পুত্রের মাধ্যমে। নিতীশের শপথের মধ্য দিয়ে যেটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে তা হলো, ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের প্রবল সম্ভাবনা। দেশের প্রায় সব বিজেপিবিরোধী দলের নেতা, জাতীয় কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীসহ উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে। ২০১৭ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতার অন্যতম নিয়ামক উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার নির্বাচন। সেখানে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহকে রুখে দিতে মহাজোট গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে বিহারে মোদি-শাহর নেতৃত্বাধীন বিজেপির বিরুদ্ধে নিতীশ-লালুর লড়াইটা মোটেও সহজসাধ্য ছিল না; বরং ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, ‘কেহ কারে নাহি জিনে সমানে সমান।’ সমগ্র রাজ্যে হোর্ডিং, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, লিফলেট ইত্যাদিতে মোদি-শাহ জুটি ছাড়া তৃতীয় কেউ আদৌ দৃশ্যমান ছিল না। দলের স্থানীয় অবিসংবাদী নেতা সুশীল মোদি পর্যন্ত ছিলেন কোণঠাসা। এর পাশাপাশি পত্র-পত্রিকা ও গণমাধ্যম, বিশেষ করে টিভি চ্যানেলগুলো ছিল মোদি বন্দনায় মুখরিত। কর্পোরেট স্বার্থরক্ষা আর কি! অতিরিক্ত ছিল গোমাংস বিতর্ক ইস্যু, যা নিয়ে সারা ভারত কম্পমান। এর বিপরীতে পোড়খাওয়া তৃণমূলের রাজনীতির নিতীশ-লালু বেছে নিয়েছিলেন মোক্ষম দাওয়াই- কেবল একটি সেøাগান : বিহারী বনাম বাহারি। সরলার্থ করলে দাঁড়ায়- বিহারবাসী বনাম বহিরাগত। ব্যস, তাতেই কেল্লাফতে, বাজিমাত!

বিশ্বের সব ভোটাভুটিতেই জনমত সমীক্ষা, বুথফেরত জরিপ, মিডিয়ার এক্সিটপোল- যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, তা নিয়ে থাকে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা, কথা চালাচালি। বিহারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে সেখানে সব জরিপ, সব পূর্বাভাস একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ে যখন ভোটের ফলাফল আসতে শুরু করে নির্বাচন কমিশনের সূত্রে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে। বিহারের নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের অধিকাংশ সংবাদ মাধ্যম ও নামী-দামী জরিপ সংস্থাগুলোর বহুকথিত এক্সিটপোলের ফল ভোটের আসল ফলাফলের সামনে যেভাবে ফুৎকারে উড়ে গেল, তার নজির বোধ করি বিশ্বের কোথাও মেলে না, এমনকি ভারতেও না। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হলো ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তথা গ্রহণযোগ্যতা। একে কেউ যদি এমনকি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা মিডিয়া ক্যু বলার চেষ্টা করেন, তবে বুঝি মানিয়ে যাবে তাও। এ যে একেবারে মুখ ঢেকে যায় লজ্জায়!

মূল ধারার মিডিয়া হিসেবে পরিচিত এনডিটিভি, টাইমস নাও, নিউজ এজ, চানক্য, জি নিউজ প্রথম থেকেই কেন যেন বিজেপিকে এগিয়ে রাখতে শুরু করে। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত বজায় ছিল এই ধারা। তবে সবাইকে টেক্কা দেন এনডিটিভির ড. প্রণয় রয়। এক পর্যায়ে সাতসকালেই তিনি বলে বসেন, এই ট্রেন্ড বজায় থাকলে বিজেপি জোটের জেতার কথা ১৪৫টি আসনে। আর লালু-নিতীশের ভাগে পড়বে মাত্র ৬০টি। মিডিয়ার এহেন প্রচারণায় জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী তথা নিশ্চিত হয়ে ভোটের দিন সকালেই বিজেপির সদর দফতরের সামনে শুরু হয় পটকা ফোটানো; বিতরিত হয় বিহারের বিখ্যাত লাড্ডু, অর্ডার দেয়া হয় কচুড়ি-সিঙ্গাড়ার। কিন্তু হায়, দুপুর ১১টার পর যখন অধিকাংশ কেন্দ্রের ভোট গণনার আসল ফলাফল আসতে শুরু করে তখন পাল্টে যায় পুরো পরিস্থিতি। অধিকাংশ টিভি চ্যানেল ও ওয়েবসাইটে যখন এগিয়ে থাকা বিজেপি এবং পিছিয়ে থাকা মহাজোটের মধ্যে ব্যবধানের পারদ কমতে থাকে, তখন ফাঁকা হতে শুরু করে বিজেপির নির্বাচনী অফিস। আর ভিড় বাড়তে থাকে কংগ্রেস ও লালু-নিতীশের ডেড়ায়। একপর্যায়ে এনডিটিভি অকস্মাৎ সম্প্রচার পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়। ভোট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা নজিরবিহীন। আম আদমি পার্টির সাবেক নেতা ও ভোট বিশেষজ্ঞ যোগেন্দ্র যাদবের মতে, এমন অসামঞ্জস্য এই প্রথম।

যা হোক, দিন শেষে ভোটের ফলাফল সবারই জানা : মহাজোট ১৭৮, বিজেপি জোট ৫৮ এবং অন্যান্য ৭। এনডিটিডি, চানক্য, ইন্ডিয়া টুডেসহ কারও হিসাবই শেষ পর্যন্ত মেলেনি, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই তো দূরের কথা! শেষ পর্যন্ত অন্তত মুখরক্ষার জন্য হলেও দুঃখ প্রকাশে বাধ্য হন ড. প্রণয় রয়। বিহারের ভোটের গরমিলকে গত ৩২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল বলে অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘আমরা কখনও ভুল, কখনও ঠিক করেছি। কিন্তু এত বড় ভুল গত ৩২ বছরে হয়নি। প্রথমদিকে যে এজেন্সি থেকে তথা-পরিসংখ্যান পাচ্ছিলাম, ভুল তাদেরই। তবে আমরা দায়িত্ব এড়াতে পারি না। এতে শেষ পর্যন্ত হয়ত এনডিটিভির কিছুটা হলেও মুখরক্ষা হয়েছে। তবে বিহারে এক্সিটপোলের পূর্বাভাস যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল, তাতে প্রশ্নবিদ্ধ হলো পুরো প্রক্রিয়াটাই।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ধর্ম পরীক্ষা

আমেরিকার নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, প্রচার-প্রচারণা, বাগ্বিত-া ও বিতর্কের পরিমাণ ততই বাড়ছে। গত সপ্তাহে লিখেছিলাম, আগামী মার্কিন নির্বাচনে অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠবে শ্রমজীবীদের ন্যূনতম মজুরি এবং অভিবাসন সমস্যা। প্যারিসে ব্যাপক বোমা হামলা এবং গুলিবর্ষণে দেড় শতাধিক দেশ-বিদেশের নাগরিকের প্রাণহানির পর যেন ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ, আমেরিকায়। সিরিয়া-ইরাকভিত্তিক প্রায় আন্তর্জাতিক ইসলামী জঙ্গী সংগঠন আইএস ইতোমধ্যে ওয়েবপেজে হামলার হুমকিও দিয়েছে ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক, লন্ডন, রোম, ব্রাসেলস ও অন্যত্র। তবে ভীতিটা স্বভাবতই বেশি ছড়িয়েছে আমেরিকায়। কেননা, সামনেই নির্বাচন। আর এত সতর্কতা, সাবধানতা অবলম্বন এবং গোয়েন্দা তৎপরতার পরও শেষ পর্যন্ত যদি হামলা এক বা একাধিক হয়েই যায়, তবে তার সুনিশ্চিত প্রভাব পড়বে নির্বাচনে। আর সেকারণেই প্রেসিডেন্ট পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা জিভে শান দিয়ে চলেছেন সমানে। যা খুশি তাই বলে বেড়াচ্ছেন বিভিন্ন জনসভায় ও সাক্ষাতকারে। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন রিপাবলিকান প্রার্থীরা। ডেমোক্র্যাটরা একটু রয়ে-সয়ে বলছেন বটে, তবে তাদের ভাবগতিকও বিশেষ ভাল ঠেকছে না। এ ক্ষেত্রে অন্যতম ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে সিরীয় উদ্বাস্তুরা, প্যারিসে জঙ্গী হামলার পেছনে যেহেতু সিরীয় জঙ্গী জড়িত ছিল। সেহেতু অধিকাংশ মার্কিনী, অন্তত ৫৪ শতাংশ সিরীয় উদ্বাস্তুদের আশ্রয়দানের বিরোধিতা করছে। গত সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে এমন একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে, যার ফলে সে দেশে সিরীয় রিফিউজিদের প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়বে। কাজেই বলা যায়, ওবামা এবং হিলারি আপাতত আছেন সংখ্যালঘুদের দলে।

রিপাবলিকান দল থেকে জেব বুশ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ফ্লোরিডার সাবেক গবর্নর জেব বুশ সোমবার মায়ামি থেকে তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন। অন্যদিকে বুধবার প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প। সবাই জানেন, জেব বুশ সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ছোট ভাই। এ সম্পর্কে গত সংখ্যায় সামান্য লিখেছি। তিনি টেক্সাসের দু’বারের সাবেক গবর্নর। বুশ পরিবারের সদস্য হিসেবে রিপাবলিকানদের কাছে তার কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা থাকলেও নিজের নাম থেকে প্রভাবশালী ‘বুশ’ অংশটি বাদ দিয়ে শুধু ‘জেব’ ব্যবহার করছেন তিনি। একে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। জরিপে মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে আপাতত তিনি এগিয়ে আছেন। ইরাকে মার্কিন সামরিক আগ্রাসনসহ সাদ্দাম সরকারকে নৃশংস ও অমানবিকভাবে উৎখাতের নেপথ্যে জুনিয়র বুশের অকপট ভূমিকার কথা সবারই জানা। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে আল কায়েদা, আইএসসহ যাবতীয় জঙ্গী অপশক্তির উত্থানও ঘটে তাঁর আমলেই। সুতরাং জেব বুশের অভিবাসন নীতি কট্টর না হওয়ার কোন কারণ নেই। সর্বোপরি তিনি মার্কিনীদের চাকরির সুবিধা বাড়াতে বৈধ অভিবাসীদের সংখ্যাও কমানোর পক্ষে।

প্রার্থী হওয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কথা উঠলেও অতীতে কখনও মাঠে নামেননি ট্রাম্প। আর এখন হেলিকপ্টার নিয়ে চক্কর দিয়ে বেড়াচ্ছেন যত্রতত্র। নিউইয়র্কে সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, আমরা আমাদের দেশকে আবার মহান করতে যাচ্ছি। তার মাজেজাটা একটু শুনুন : এ দেশে যারা মুসলমান তাদের ওপর নজরদারির জন্য একটি তালিকা করতে হবে। মসজিদগুলোতে পাহারা বসাতে হবে; প্রয়োজনে বন্ধ করে দিতে হবে। তাদের আলাদা পরিচয়পত্র দিতে হবে। এ কথায় অনেকটা নব্য নাৎসি তথা হিটলারের প্রতিধ্বনি শোনা যায় নাকি, যিনি টার্গেট করেছিলেন হতভাগ্য ইহুদীদের।

আরও এক কাঠি ওপরে উঠে গিয়ে রিপাবলিকান দলের অপর প্রার্থী বেন কারসন বলেছেন, ইসলাম ধর্ম মার্কিন সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একজন মুসলিমকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মানতে রাজি নন। এনবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘যদি বিষয়টি আমেরিকার মূল্যবোধ ও নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই ভাবতে হবে।’

অথচ বেন কারসন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পেডিয়াট্রিক নিউরোসার্জন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত এই স্নায়ুশল্যবিদ জড়িত ছিলেন বিশ্বখ্যাত জন হপকিন্স হাসপাতালের সঙ্গে। সে অবস্থায় একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর তো মানবদরদী হওয়ার কথা। ডাক্তারী পেশা ও রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর তাঁর লেখালেখিও রয়েছে। সিরীয় উদ্বাস্তুদের সে দেশে ঢুকতে না দেয়া প্রসঙ্গে বেন কারসনের যুক্তি, আপনার ঘরের আশপাশে যদি কোন পাগলা কুকুর ঘোরাফেরা করে, তবে আপনি কী করবেন? তাকে আদর করে ঘরে ডেকে নেবেন? পরে আত্মপক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে তিনি বলেন, সব কুকুরের কথা বলছি না, শুধু যেগুলো রোগগ্রস্ত ও পাগল, সেগুলো...

আগামীতে অভিবাসন বিতর্ক আরও কত নিচে নামতে পারে রিপাবলিকান প্রার্থীদের, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

মুরগির স্যুপ ও সর্দি

সুপ্রসিদ্ধ রম্যলেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর অনবদ্য একটি ছোটগল্প আছে ‘বেঁচে থাকো সর্দি-কাশি’ শিরোনামে। সম্ভবত তিনি তখন জার্মানিতে। বিদেশ বিভূঁইয়ে অকস্মাত আক্রান্ত হয়েছেন সর্দি জ্বরে। অগত্যা নিরুপায় হয়ে শরণাপন্ন হতে হয়েছে চিকিৎসকের। তখন তো চিকিৎসাবিজ্ঞানের তেমন উন্নতি হয়নি। বিশ্বব্যাপী চলছে স্মেলিং সল্ট, কারমিনেটিভ মিকচার ও কুইনাইনের যুগ। ডাক্তারের চেম্বারের পেছনের র‌্যাকে সারি সারি শিশি-বোতলে রংবেরঙের ওষুধ-বিষুধ। ডাক্তারও বোধকরি ছিলেন রসিক। সৈয়দ সাহেবকে দেখেশুনে পর্যবেক্ষণ করে পেছনের সারি সারি ওষুধের শিশি-বোতল দেখিয়ে বললেন, তোমাকে এর থেকে কোন্টা দেব? খেলে সাতদিন; না খেলে এক সপ্তাহ। পাঠক বোধকরি গল্পের মাজেজাটা ধরতে পেরেছেন। সুতরাং মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

দৈনন্দিন জীবনে সর্দি একটি অতি পরিচিত অসুখ। তবে অসুখ না বলে একে বুঝি উপসর্গ বলাই ভাল। এমন মানুষ বুঝি বিশ্বব্রহ্মা-ে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি জীবনে কখনও সর্দিতে আক্রান্ত হননি। সচরাচর মানুষ যেসব সাধারণ অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে থাকে, তার মধ্যে সর্দি অন্যতম। এটি প্রধানত ভাইরাসবাহিত ব্যাধি। এর অনেক রকমফের থাকলেও রাইনোভাইরাসের মাধ্যমেই বেশি ছড়িয়ে পড়ে সর্দি। বয়স্ক মানুষ প্রতিবছর ২-৩ বার এবং শিশুরা ৬-১২ বার আক্রান্ত হয় সর্দিতে।

সাধারণ লক্ষণসমূহ সবারই জানাÑ গলাব্যথা, মাথাব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি-কাশি, গা ম্যাজ ম্যাজ করা, কখনওবা সামান্য জ্বর, মাংসপেশীতে ব্যথা, রুচি কমে যাওয়া ইত্যাদি। স্থায়িত্বকাল এক সপ্তাহ বা সাতদিন, বড়জোর দশ দিন।

সর্দি নিয়ে নানা গালগল্প, হাসি-চুটকি এমনকি মিথ ছড়িয়ে আছে। ভাইরাসবাহিত বলে এ রোগের সুনির্দিষ্ট কোন ওষুধ নেই; তবে কিছু ক্ষেত্রে লক্ষণ অনুযায়ী ওষুধ বা টোটকা দাওয়াই দিলে সাময়িক আরাম ও উপশম মেলে বটে।

সর্দির ভাইরাস কণিকাগুলো দূষিত আঙ্গুল বা দূষিত বাতাস থেকে আমাদের নাকের ভেতর জমা হয়। তবে এক্ষেত্রে অতি অল্পসংখ্যক ভাইরাস কণিকা (১-৩০) সংক্রমণের জন্য যথেষ্ট। এরপর এগুলো আনুনাসিক কোষ পৃষ্ঠের ওপর রিসেপ্টরে যুক্ত হয়। অতঃপর ভাইরাস নতুন কোষের মধ্যে সংক্রমণসহ ভাইরাস উৎপাদন শুরু করে। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং এর ফলে আমরা খুব সহজেই সর্দিতে আক্রান্ত হয়ে থাকি।

রক্ষা পেতে করণীয়

প্রতিদিন সামান্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে সর্দি থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশি থেকে অন্তত তিন ফুট দূরে থাকতে হবে। কারণ জীবাণু খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে বাতাসের মাধ্যমে এবং তা উপস্থিত সুস্থ ব্যক্তির নাক-মুখ এমনকি চোখ দিয়ে সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি সব রকম সম্পর্ক এমনকি করমর্দন পর্যন্ত এড়িয়ে যাওয়া ভাল। গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমিত পানির গ্লাস, চায়ের কাপ, চেয়ার-টেবিল এমনকি আসবাবপত্র, কাপড়-চোপড়ের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।

ব্যক্তি বা বস্তুর সংস্পর্শের মাধ্যমে যেহেতু সর্দির জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে, সেজন্য হাত সর্বদাই পরিষ্কার রাখা বাঞ্ছনীয়। সাবান বা স্যানিটাইজার সব সময় সঙ্গে রাখুন। তবে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চেয়ে সাবানকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড দু’হাতে সাবান মেখে হাত ধুয়ে ফেলুন পরিষ্কার পানিতে। স্যানিটাইজার যদি ব্যবহার করতেই হয় তাহলে দেখে নিন তাতে ৬০ শতাংশ এ্যালকোহল আছে কিনা!

বিমান ভ্রমণ করলে সর্দিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকেÑ এ রকম একটি ধারণা প্রচলিত আছে। তবে এর সপক্ষে জোরালো তেমন কোন প্রমাণ নেই। সর্দি হলেই জ্বর হবে, এমন ধারণাও ভুল। উত্তাপ থাকতে পারে শরীরে, যাকে বলি গা ম্যাজ ম্যাজ। এর উপশমের জন্য বিশ্রামই যথেষ্ট। ঘরে ঘরে অনেকেই নানা টোটকা দাওয়াই খান, যা সাময়িক আরাম দিতে পারে। যেমন জিনসেং, ভিটামিন সি, চ্যাবন প্রাস, গরম পানি-মধু, কালিজিরা, আদা-মসলা, চা, ভিক্স ইত্যাদি। এসবই সাময়িক উপশম। সর্দির বিরুদ্ধে কার্যকর কোন প্রতিষেধক নেই। তবে ইদানীং ফ্লুর টিকা আবিষ্কার হয়েছে।

পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করুন, দৈনিক ৮-১০ গ্লাস। পানি শরীর বিশুদ্ধ রাখে এবং জীবাণু নির্গমনে সহায়তা করে। কম চর্বিযুক্ত চিকেন স্যুপ খান গরম গরম। কারণ গরম চিকেন স্যুপ প্রোটিন, ভিটামিনস ও খনিজ উপাদানের উৎস, যা সর্দির জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। সর্বোপরি বিশ্রাম, বিশ্রাম, বিশ্রাম। কেননা ওষুধ খেলেও সাতদিন না খেলেও এক সপ্তাহ!