২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিডনির মেলব্যাগ ॥ কলঙ্ক কখনও তিলক হয় না

  • অজয় দাশগুপ্ত

মৃত্যু কোন আনন্দের বিষয় হতে পারে না। অস্বাভাবিক মৃত্যু তো আরও নিরানন্দের। আমরা এমন এক আবেগপ্রবণ জাতি, সারাদিন-রাত হানাহানি, মারামারিতে থাকার পরও মৃত্যুকে মানতে চাই না। যে কোন কারণে, বিশেষ করে পরিচিত কেউ এভাবে বিদায় নিলে বাঙালীর অন্তরে বেদনা জন্মায়। তার স্পর্শকাতর মন দেশের মেঘের মতো অকারণে সজল হয়ে উঠতে চায়। মৃত্যুরও যে একটা সৌন্দর্য আছে, কোন্টা মধুর আর কোন্টা বিধুর সেটাও ঠাওর করে উঠতে পারি না আমরা। প্রয়াত গুণীজন ওয়াহিদুল হক ছিলেন গল্পের জলজ্যান্ত ভা-ার। হেন বিষয় নেই তিনি জানতেন না, বলতেনও অপূর্ব, তার কাছ থেকে শোনা একটি গল্প ছিল এ রকম- সম্মুখযুদ্ধে পাকিস্তানীদের পরাজিত করার পর উল্লাসরত মুক্তিযোদ্ধাদের একজন ছুটে গিয়েছিল ভূপাতিত পাকি সৈন্যটিকে দেখতে। তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে প্রকৃত প্রশিক্ষণহীন, তরুণ কোন মুক্তিযোদ্ধার গুলিতে ঝানু যুদ্ধবাজ পাকি সেনা মারা যেতে পারে। যুবকটি গিয়ে যখন ফিরে আসছিল না, বিলম্ব করছিল, বন্ধুরা গিয়েছিল তাকে ফিরিয়ে আনতে। হতভম্ভ তরুণ মুক্তিযোদ্ধা লাশ দেখে নাকি বলছিল, ‘এত বড় একটা আর্মি মাইরা ফালাইলাম, হায়রে কি করলাম!’ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার রেশ ও হতবিহ্বল অবস্থা কাটিয়ে পুনরায় যুদ্ধে ফিরে গেলেও এটাই ছিল বাঙালীর দুর্বল অথবা অতি আবেগপ্রবণ মনের বহিঃপ্রকাশ। অন্যদিকে পাকিস্তানীরা যাকেই মারত বুট জুতো দিয়ে লাথি মেরে পুনর্বার দেখে নিত আদৌ জান বেরিয়েছে কিনা। কনফার্ম হলে ‘চুতিয়া’ বাঙালী বলে গাল দিয়ে কখনও থুতু নিক্ষেপ করে তারপর চলে যেত। ওয়াহিদ ভাই তাই সাবধান হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, লিখেছিলেনও এই নিয়ে কিন্তু কে শোনে কার কথা। জানি না উপনিবেশবাদের কুফল, শারীরিক গঠনের খর্বতা নাকি হীনম্মন্যতা। তবে এখনও এই বৃত্তের বাইরে পা ফেলতে পারিনি আমরা।

আগেই বলেছি মৃত্যু উদযাপনের বিষয় নয়। কিন্তু এমন কোন কোন সময় উপস্থিত হয় যখন তাকে উদযাপন করার বিকল্প থাকে না। দেশে সদ্য ফাঁস দ-ে দ-িত দু’জন মানুষের মৃত্যু বেশিরভাগ বাঙালীর মনে স্বস্তি বইয়ে দিয়ে গেছে। এটা ওই দুই মানুষের জন্য কষ্টের হলেও তারাই এর নির্মাতা। বাংলায় প্রচলিত একটা কবিতা আছে। মা প্রায়ই শোনাতেন আমাকে।

এমন জীবন হবে করিতে গঠন

মরিলে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।

ওই মানুষগুলো ঠিক তার বিপরীতে। মৃত্যু বা অপমৃত্যুতে তাদের আত্মীয়স্বজন, ছেলেমেয়ে বা সমর্থকরা হৈচৈ করছে, কাঁদছে বটে, ভুবন কিন্তু মুখ ব্যাদান করে বা লুকিয়েও হেসে চলেছে। আজীবন বেয়াদবিতে অভ্যস্ত লাগামহীন কথার তোড়ে ভাসা কথিত রাজনীতিবিদ সাকা চৌধুরীর সন্তানরা যে সে ধারা বহন করবে এটাই স্বাভাবিক। হুম্মাম নামটাই তো একদিকে অশ্রুত, অবাঙালীসুলভ; অন্যদিকে ভয় ধরানোর। কোন বাপ আদর করে বড় গলায় ছেলেকে ‘হুম্মাম হুম্মাম’ ডাকলে পাড়া-প্রতিবেশীদের অনেকেই হয়ত ভয়ে পালাবে। এই যে আস্ফালন তর্জনী উঁচিয়ে চল্লিশ বছর পর পিতৃহত্যার বিচার করার নামে ধৃষ্টতা প্রদর্শন, এই যুবক কি জানে তার পিতৃহারা হতে পারত নিজের জন্মেরও আগে। মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ গুলিতে পাশের মানুষকে হারিয়ে জান নিয়ে পালিয়ে বাঁচা সাকা চৌধুরী সেদিন নাই হয়ে যাওয়ার কথা, পুত্র কি এও জানে, তার পিতামহ ও পিতা উভয়ে কারাগারে অন্তরীণ থাকতে থাকতেই মারা গেছে সহজ, সুন্দর, স্বাভাবিক জীবনের আলোয় পর্যন্ত মরতে পারেনি তারা। এই ছেলেটির উচিত তার পিতার কথাবার্তার ভিডিও টেপ বারংবার দেখতে থাকা। সংসদের মতো পবিত্র জায়গায় যে মানুষ নিকৃষ্ট, অশ্লীল ও প্রকাশের অযোগ্য শব্দ একাধিকবার ব্যবহার করতে পারে, বক্তৃতায় তা বলতে পারে বাপ হলেই কি তাকে ভদ্রলোক বলা যায়? ধরে নিলাম বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার জন্মশত্রু আদর্শিক বৈরী বলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা মশকরা বা বাজে কথা বলা হতো, আজ এই পরিবার শেষ সময়েও যার সাহায্য ও আশ্রয় চাইছে সে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও সাকার মন্তব্য ছিল অশীল, কুরুচিপূর্ণ। লেজ, কুকুর, বয়স, সৌন্দর্য এগুলোর নিকৃষ্ট ব্যবহারে অভ্যস্ত এই লোকটি হিন্দু নেতাদের খৎসা করতে পরামর্শ দিতেও কসুর করত না। পুত্রকে এটা প্রশ্ন করা যায়, একজন-দু’জন বা এক গ-া মানুষ মন্দ বললেও কিছু যায় আসে না, কিন্তু যখন লাখ লাখ, কোটি কোটি মানুষ কাউকে অন্তর থেকে ঘৃণা করে তখন কি সে মানুষটিকে নিয়ে আস্ফালন করা উচিত, না কৃতকর্মের জন্য তার পক্ষ থেকে ক্ষমা চেয়ে তাকে পরকালে হলেও কিঞ্চিৎ শান্তি দেয়া প্রয়োজন? খালি সাকা চৌধুরীর শরীর ছ’ফুট দু’ইঞ্চি? বঙ্গবন্ধুর শালপ্রাংশু দেহ ঝাঁজরা করার কালে উচ্চতা চোখে পড়েনি তাদের? যে মানুষ গ্রেনেড হামলার বিষয়ে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করতে গিয়ে বলতে পারে আমি মারলে তো মিস হতো না, যে বলত ‘... কেটে লাল করে দাও’, যার কথা হাসি মুখভঙ্গিতে চিরকাল ব্যঙ্গ আর বিদ্রƒপ মাটিই বা তাকে কতদিন সহ্য করবে?

হুম্মামদের সামনে খাড়া মাইক্রোফোন আর মিডিয়াকর্মীগুলোর মুখে কুলুপ, এই সব বিভ্রান্ত ইতিহাস না জানা, ভাত-রুটিতে বা পকেট ফুলে ওঠার জন্য মাইক্রোফোন নিয়ে ঘুরে বেড়ানোরা উল্টো কাজটি করে চলেছে অনবরত। কেন তারা বলতে পারে না- নূতনচন্দ্র সিংহের রক্ত কি পানি ছিল? ঊনসত্তরপাড়ায় নিহত মানুষগুলোর জীবন মানে কি কচুপাতার পানি? রাজনীতির নামে রাউজানের মাটি লাল করে দেয়া, যুবকদের প্রাণ নেয়া আর সুবিধাবাদী হয়ে লম্বা কথা বলাকে সময় এমনি এমনি ছেড়ে দেবে? প্রায় প্রতি বাক্য আর প্রতি এ্যাকশনে আল্লাহ’র দোহাই দেয়া এদের মনে রাখা প্রয়োজন- তাদের পিতা সাকা চৌধুরী ধার্মিক ছিলেন না, এমনকি বাংলাদেশের কোন ইসলামী দলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন না। তাদের পিতা ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী হলে নিদেনপক্ষে জামায়াতে থাকতে পারতেন, থাকেননি, বরং ক্ষমতার জন্য জাতীয় পার্টি, এনডিপি, বিএনপি যখন যা খুশি তাই করে গেছেন। তবে জীবনে একটি খাঁটি কথা বলেছিলেন বিএনপিতে যাওয়া ছিল কবিরা গুনাহ। এখন বোঝা যাচ্ছে একেবারে সঠিক ছিল এই বলাটা। ভূত ভবিষ্যত বর্তমানের দায়িত্ব নিতে না পারা দলের সঙ্গে জুটে আস্ফালনের ফলাফল তো ভোগ করতেই হবে। পুত্র-কন্যাদের জানা উচিতÑ এই দেশ, এই মাটি, এই পতাকা ও রক্তধারাকে অপমান করে গায়ের জোরে ক্ষমতায় যাওয়া গেলেও শরীর থেকে, পরিচয় থেকে ‘মীরজাফরী’ যায় না। তাদের হয়ত বাংলা-বাঙালীর ইতিহাস জানা নেই। তাই তারা জানে না জীবদ্দশায় যেমন, তেমনি মৃত্যুর পরও সাকা চৌধুরী ফাঁসির মতো একটি বিষয়কে কলঙ্কিত করে গেছেন। চট্টগ্রামেরই সন্তান ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সূর্যসেনের ফাঁসি ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়। সে ফাঁসি গান, কবিতা ও নাটকসহ শিল্পের জন্মদাতা, প্রেরণার উৎস। দেশের সীমানা পেরিয়ে উপমহাদেশে স্বাধীনতাস্পৃহার প্রথম আত্মদানের ফাঁসিকেও যুদ্ধাপরাধের কলঙ্ক দিয়ে কালো করে রেখে গেছেন সাকা চৌধুরী। ন্যূনতম ধারণা বা লেখাপড়া থাকলেও পুত্র-কন্যারা আস্ফালন করতে পারত না। জানত কোন মানুষের জীবন বা ইমেজ মৃত্যুর আগের কয়েক দিন নয়, তার সারাজীবনের পাপ-পুণ্য, ভাল-মন্দই তাকেই চিরঞ্জীব, আদর্শবান অথবা মানুষে খেদানো সা. কা. বানিয়ে তোলে।

dasguptaajoy@hotmail.com