২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চলে যাওয়া থামাতে হবে

নিজ দেশে নিজের জীবন নিরাপদ মনে করছেন না মুক্তচিন্তার লেখক, প্রকাশকরা। একের পর এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডে রীতিমতো শঙ্কিত তারা। অব্যাহত হুমকির মুখে ইতোমধ্যে দেশ ছাড়ছেন আতঙ্কিত অনেকে। কেউ বা চলে যাওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা দেয়ার কথা বললেও তারা আশ্বস্ত হতে পারছেন না। তাই জীবন বাঁচানোর তাগিদে পাড়ি জমাচ্ছেন ভিন দেশে। যাদের বেশিরভাগই গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী। ২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধী কাদের মোল্লার রায়ে কাক্সিক্ষত শাস্তি না হওয়ায় একদল তরুণ প্রতিবাদে সোচ্চার হয় রাজধানীর শাহবাগে। সেখানেই জন্ম গণজাগরণ মঞ্চের। একদল মুক্তমনা লেখক, অনলাইন এক্টিভিস্টসহ হাজার হাজার মুক্তমনা মানুষের মিলনে জেগে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। এক পর্যায়ে এর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। সেই থেকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নানা জঙ্গী সংগঠনের নামে মুক্তমনাদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে, বিভিন্ন সময় হত্যা করে রাজীব, অভিজিত রায়, অনন্ত বিজয়, ওয়াশিকুর বাবু, নিলাদ্রী নিলয়, সর্বশেষ জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী দীপনকে। এ পর্যন্ত ৩০ জনেরও বেশি মুক্তমনা ব্লগার দেশ ছেড়েছেন। বিভিন্ন সময় জঙ্গীদের প্রকাশিত তালিকায় তাদের অনেকেরই নাম ছিল। এরা বেশিরভাগই যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেনসহ ইউরোপের দেশগুলোতে গেছেন। কেউ কেউ পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায়। অভিজিত রায়ের হত্যার পর থেকেই মূলত শুরু হয় দেশ ছাড়ার প্রক্রিয়া।

গত মার্চে ৮৪ ব্লগারকে হত্যার একটি তালিকা প্রকাশ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। ২০১৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তালিকার ১১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এ তালিকা প্রতিদিনই বড় হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, মাজারের পীর, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নাম তাদের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়গুলো অবহিত। কিন্তু হত্যাকা-গুলোর তদন্ত থেকে শুরু করে তালিকায় নাম থাকাদের নিরাপত্তার বিষয়েই সন্তোষজনক খবর নেই। মাঝেমধ্যে দায়সারা বক্তব্য শোনা যায় প্রশাসনের কাছ থেকে। বলা যায়, এক ভয়াবহ অবস্থা। সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর তিন জনের ওপর হামলার ঘটনার কোন কূলকিনারা হয়নি। এই দুই ঘটনায় পুলিশ ও র‌্যাব মূল আসামি দূরে থাক, সন্দেহভাজন কাউকেও আটক করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে শুদ্ধস্বর প্রকাশনীতে হামলায় আহত প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল ও ব্লগার তারেক রহিম কয়েকদিন আগে দেশ ছেড়ে চলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। তারা বাসায় ফেরার পর আতঙ্কে ভুগছিলেন। অবস্থান জানতে পারলে, হামলাকারীরা আবারও তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে, এই আশঙ্কায় তারা বিদেশ চলে গেছেন।

একে একে এই মুক্তমনা মানুষগুলোর চলে যাওয়া দেশের মুক্তমত প্রকাশ ও প্রগতি চেতনার ওপর আঘাতের শামিল। এতে ক্ষতি হচ্ছে আমাদের দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি, ঐতিহ্য, মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা। লাভবান হচ্ছে মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠী’ যারা বার বার আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় সম্প্রীতিকে নষ্ট করার চেষ্টা করে আসছে। মুক্তমনা মানুষগুলোর এই চলে যাওয়া থামাতে হবে। তাদের নিরাপত্তার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এই দেশ জঙ্গীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হোক এটা কারও কাম্য হতে পারে না। সময় থাকতে সরকারের আরও সচেতন ও সতর্ক হওয়া দরকার। জঙ্গী দমনসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে আর সময়ক্ষেপণের অবকাশ নেই। সব ব্লগার, প্রকাশক, মুক্তমনা মানুষগুলোর জন্য জঙ্গীমুক্ত বাংলাদেশ হোক- এই প্রত্যাশা সবার।