২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অদম্য তারুণ্যের গল্প জয়রথে ওয়াসফিয়া

ওয়াসফিয়ার শৈশব-কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামে। সেই চট্টগ্রামেই পাহাড় প্রেম শুরু। তারপর পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান। ছোটবেলা থেকেই কিছুটা ডানপিটে স্বভাবের মেয়ে ওয়াসফিয়া নাজনীন। বাবা-মার আদরে কোন কিছুতেই বাধা পাননি তিনি। ঢাকার স্কলাসটিকা স্কুল থেকে ও এবং এ লেভেল সম্পন্ন করেন ওয়াসফিয়া নাজনীন। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় এগনেস স্কট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান ওয়াসফিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়ার পর সেখানে ওয়াসফিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় পর্বত এ্যাডভেঞ্চারকারীদের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ওয়াসফিয়া যান স্কটল্যান্ডে। পড়ার বিষয় সামাজিক মনোবিজ্ঞান আর স্টুডিও আর্ট। পেশায় তিনি একটি এনজিওর উন্নয়নকর্মী, কিন্তু নেশা তার পর্বতারোহণ। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি নিজের উদ্যোগে গড়ে তোলেন ‘বাংলাদেশ অন সেভেন সামিট’ নামে একটি ফাউন্ডেশন।

খরস্রোতা পাহাড়ী ঝরনা বা নদীতে রাবারের নৌকা চালানো, গ্লাইডারে ওড়া- অনেক কিছুই করেছেন ওয়াসফিয়া। ২০০৪ সালে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চাকরি নিয়ে আবার যান যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর ফিরে আসেন দেশে। কেয়ারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ভারত, ভুটান, নেপাল ও তিব্বতের পাহাড়-পর্বতে শুরু“হয় তাঁর ঘোরাফেরা। ধীরে ধীরে উঁচু পর্বতে ওঠা শুরু হয় ওয়াসফিয়ার। ২০০৯ সালে নেপালের লু রী, পরের বছর আইল্যান্ড পিক জয় করেন তিনি। এ দুটি পর্বতেরই উচ্চতা ছয় হাজার মিটারের ওপর।

ওয়াসফিয়া নাজনীন সাত মহাদেশের সাত চূড়া জয়ের অভিযান শুরু করেন ২০১১ সালের ৩ জুলাই। তবে প্রথম অভিযানেই ব্যর্থ হন ওয়াসফিয়া নাজনীন। ইউরোপের সর্বোচ্চ চূড়া এলবার্স জয় করতে গিয়ে মাত্র ৩০০ মিটারের জন্য চূড়াটি জয় করতে পারেননি ওয়াসফিয়া নাজনীন। বাধ্য হয়ে গাইডের পরামর্শ মেনে নিয়ে মাত্র ৩০০ ফুট নিচ থেকে ফিরে আসতে হয়। এলবার্স চূড়ার সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল ১৮,৫১০ ফুট।

তবে সাত মহাদেশের সাত চূড়া জয়ে এর জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। এক মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় উঠতেই প্যাকেজভেদে ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার খরচ হয়। ওয়াসফিয়া তাঁর মায়ের কাছ থেকে যে টাকা পেয়েছেন সেখান থেকে এসব অভিযানে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেন। এছাড়া অনেক মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ওয়াসফিয়া নাজনীনের এই সাত শীর্ষ চূড়ায় অভিযানে সমর্থন দিচ্ছে। এছাড়া আরও যতদূর জানা যায় বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা করছে।

সেভেন সামিট এর একটি হচ্ছে আফ্রিকার ‘কিলিমানজারো’। এটির উচ্চতা ৫,৮৯৫ মিটার বা ১৯, ৩৪০ ফুট। ২০১১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সেভেন সামিটের অংশ হিসেবে কিলিমানজারো অভিযানে তানজানিয়ার মোশি শহর থেকে শুরু“করেন অভিযান। ২০১১ সালের ২ অক্টোবর আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমানজারোর সর্বোচ্চ চূড়া ‘চূড়া উহুরুপিকে’র বুকে পা রাখেন ওয়াসফিয়া নাজনীন এবং উঁচিয়ে ধরেন লাল-সবুজের পতাকা। ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ৪০তম বিজয় দিবসে বিজয় করেন আর্জেন্টিনায় অবস্থিত হিমালয়ের বাইরের সবচেয়ে উঁচু পর্বত এ্যাকোনকাগুয়া (২২,৮৩০ ফুট)। কিন্তু এই চূড়ায় উঠতে গিয়ে অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। এই অভিযানে ওয়াসফিয়া ও তাঁর গাইডসহ মোট ৫ জন ছিলেন। এ্যাকোনকাগুয়া জয়ের আগেই ঠিক করেন এর পরের গন্তব্য ‘মাউন্ট এভারেস্ট’। ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ তিনি নেপালের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করেন। ২৬ মার্চ কাঠমান্ডু থেকে ওয়াসফিয়া নাজনীন এভারেস্ট অভিযান শুরু করেন। ওয়াসফিয়া নাজনীন এভারেস্ট হাইওয়ে দিয়ে এভারেস্ট বেসক্যাম্পে পৌঁছেন ৬ এপ্রিল। খুম্বু আইসফল, ক্যাম্প-১, ক্যাম্প-২, ক্যাম্প-৩, ক্যাম্প-৪, ব্যালকনি, ফার্স্টস্টেপ, সেকেন্ড স্টেপ, তারপর হিলারি স্টেপ হয়ে ২৬ মে সকাল ৬টা ৪১ মিনিটে পৌঁছালেন এমন এক উচ্চতায় যার ওপর এই ভূপৃষ্ঠের আর কিছুই নেই। আছে শুধু আকাশ। এভারেস্টে দ্বিতীয়বারের মতো কোন বাংলাদেশি নারীর হাতে উড়ল লাল-সবুজের পতাকা। আর সর্বকনিষ্ঠ বাংলাদেশী হিসেবে জয় করলেন এভারেস্ট চূড়া। এভারেস্টের চূড়ায় তিনি ৩০ মিনিট ছিলেন। ওয়াসফিয়া নাজনীনের সঙ্গে অন্য কোন সঙ্গী ছিলেন না। সেভেন সামিটের একটি হচ্ছে মাউন্ট ভিনসন ম্যাসিফ। এটি এন্টার্কটিকার উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। এটির উচ্চতা ৪,৮৯২ মিটার। ২০১২ সালের ৮ নবেম্বর ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি এটি জয় করেন। এলব্রুস পর্বত। রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশের দক্ষিণাংশে, জর্জিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সীমান্তের ঠিক উত্তরে অবস্থিত একটি পর্বত। ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা ৫১ মিনিটে ইউরোপের এই সর্বোচ্চ চূড়া জয় করেন ওয়াসফিয়া নাজনীন। এই শৃঙ্গ জয় করতে গিয়ে ওয়াসফিয়াকে ‘স্নো ব্লাইন্ডনেস’ এ আক্রান্ত হতে হয়েছে। তবে এই অসীম সাহসী নারী পরবর্তীতে সাত চূড়া জয়ে সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখেন এবং বিশ্বের বুকে বাংলার গর্বিত পদচিহ্ন এঁকে দেন।

যখন আটলান্টায় পড়াশোনা করার জন্য যান, তখন মানবতার পক্ষে নানা রকম আন্দোলনের কর্মী হিসেবে সক্রিয় হন। ইরাক যুদ্ধবিরোধী প্রচারণা, মানবতার পক্ষে বিভিন্ন প্রচারণায় অংশ নিতেন ওয়াসফিয়া। অভিনব কায়দায় প্রতিবাদ জানাতেন মানবতাবিরোধী নানা বৈশ্বিক ইস্যুর। ‘ধরুন প্ল্যাকার্ড নিয়ে ৩৫০ ফুট উঁচু দালানে দড়ি বেয়ে বেয়ে ওঠানামা, দড়ি বেঁধে উঁচু দালান থেকে ঝাঁপ দেয়া, বোঝা নিয়ে দেয়াল বাওয়া- এ সবই পরে কাজে লেগেছে পর্বত আরোহণে।’