১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব ॥ প্রজন্মের ভাবনা

  • অঞ্জন আচার্য

স্বকৃত নোমান কথাসাহিত্যিক

গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত বেঙ্গল ক্লাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভ্যালকে আমি সম্পূর্ণ ইতিবাচকভাবে দেখি। এই সঙ্গীত উৎসবে ভারত থেকে স্বনামখ্যাত শিল্পীরা গান গাইতে আসেন, যাঁদের নাম হরহামেশা শুনি, রেডিও-টেলিভিশনে যাদের গান শুনি, কিন্তু সরাসরি তাদের দেখা বা সরাসরি তাঁদের মুখে গান শোনা সম্ভব হয় না। এই উৎসব উপলক্ষে এই সুযোগটি ঘটে। বেঙ্গল আমাদের এই বড় সুযোগটি করে দিয়েছে। এজন্য তাদের সাধুবাদ। সবচেয়ে বড় কথা, এটি একটি সাংস্কৃতিক উৎসব। শিল্প-সংস্কৃতির ওপর তো প্রতিনিয়তই আঘাত আসছে। ষড়যন্ত্রকারীরা শিল্প-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে। অব্যাহত ষড়যন্ত্রে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বেঙ্গলের এই ধরনের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির চর্চা বাড়ছে, সংস্কৃতি চাঙ্গা হচ্ছে। সংস্কৃতির চর্চা যত বেশি বাড়বে, জাতি হিসেবে ততই আমাদের ভিত শক্তিশালী হবে। সকল ধরনের গোঁড়ামি আমাদের মধ্য থেকে দূর হবে। সঙ্গীত মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। আমাদের দেশে তো অনেক বড় পুঁজিপতি আছেন। কোথায়, তারা তো এ ধরনের আয়োজন করেন না। সংস্কৃতিচর্চাকে জাগিয়ে দেয়ার জন্য তাদের কোন উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়ে না। এ নিয়ে তারা হয়ত ভাবেনও না। বেঙ্গল ভাবে। সংস্কৃতির প্রতি তাদের ভালবাসা আছে। এই যে এতবড় একটা উৎসব তারা করে আসছে, এজন্য দর্শক হিসেবে আমাকে কোন টাকা-পয়সা খরচ করতে হচ্ছে না। ইন্টারনেটে শুধু রেজিস্ট্রেশন করলেই এত বড় বড় শিল্পীদের গান সরাসরি শুনতে পারছি।

বাঁশরী জান্নাত মনোবিদ

মার্কিন লেখক হেনরি মিলারের একটি কথা আছে- ‘আনন্দকে যারা অবজ্ঞা করতে বলে, তারা হয় বৃদ্ধ অথবা একেবারে অসুস্থ।’ তাই বাঙালীর উৎসব প্রবণতা থেকেই বোঝা যায় এই জাতি চিরকালই সুস্থ তারুণ্যের প্রতীক। আর তাই পাকিস্তানের নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে উদীচী বোমা হামলা, ছায়ানটের বর্ষবরণে বোমা হামলা- কোনকিছুই বাঙালীকে উৎসববিমুখ করতে পারেনি। বাঙালীর সকল উৎসবই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন উৎসবে। আমি মনে করি, সঙ্গীত বাঙালীর উৎসবের একটি প্রধান উপাদান। ভিন্ন ভিন্ন আবেগ নিয়ে, ভিন্ন ভিন্ন কষ্ট নিয়ে, ভিন্ন ভিন্ন আনন্দ নিয়ে গড়ে উঠেছে সঙ্গীতের ভিন্ন ভিন্ন শাখা। এ দেশের ভাষা মাত্র একটা, কিন্তু সঙ্গীতের বৈচিত্র্যের অভাব কখনও ঘটেনি। বাংলাদেশেকে বলা হয় লোকসঙ্গীতের লীলাভূমি, এই কথাটা যেমন সত্য তেমনি একটি গোপন সত্য হলো শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের লালন পালন এই বাংলাতেই হয়েছে। বিশ্বব্যাপী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রচার-প্রসার যারা করেছেন রজনীকান্ত, বিলাত খাঁ, নিখিল ব্যানার্জী, রবিশঙ্কর, উদয়শঙ্কর, আলী আকবর খাঁ, উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ তারা এই বাংলারই সন্তান। কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম কখনই প্রচার পায়নি এবং বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মও এই সঙ্গীতকে খুব একটা আপন করতে পারেনি। তবে ২০১২ সাল থেকে বেঙ্গল আয়োজন করে আসছে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব, যা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উৎসব। বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব যখন শুরু করা হয় তখন অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল এই আয়জনের সাফল্য নিয়ে। কিন্তু সঙ্গীত আর উৎসব যেখানে মিলিত হয়, সেখানে বাঙালীকে কোনভাবেই আটকে রাখা যায় না। বাঙালী মিলিত হবেই যে কোন উৎসবে, যে কোন সময়ে, যে কোন স্থানে। এর কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবেও। সকল বয়সের ও সকল শ্রেণীর মানুষের অংশগ্রহণে সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন হয়েছে এই উৎসব এবং সেই সঙ্গে বাঙালীর উৎসবে যুক্ত হয়েছে আরও একটি নতুন ধারা। আমরা গর্বের সঙ্গেই বলতে পারিÑ যাদের হাত ধরের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশ্ব দরবারে প্রসার ঘটেছে তাদের মাটিতেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উৎসব হচ্ছে। এই উৎসবের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিচয় ঘটছে, তাদের ইতিবাচক শ্রবণ-মানসিকতা তৈরি হচ্ছে এবং এর মাধ্যমেই মনের বিকাশ ঘটছে। তরুণরা যেমন নিজেদের দেশের সঙ্গীত সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছে তেমনই বিশ্ব সঙ্গীতকেও তারা গ্রহণ করছে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতবিমুখ তরুণরা এই উৎসবের মাধ্যমে নিজের সংস্কৃতিকে পেছন ফিরে দেখার জন্য তৃষ্ণা বোধ করছে। বাংলার লোকসঙ্গীত থেকেই রাগসঙ্গীতের সৃষ্টি। এজন্য আমরা অহঙ্কার করতে পারি। শুধু বাংলার তরুণদের কাছেই নয়, এই উৎসবের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে আমাদের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য তুলে ধরা অত্যন্ত সহজ হয়ে উঠেছে। এবারও আর্মি স্টেডিয়ামে চতুর্থবারের মতো আয়োজিত হচ্ছে বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসব। এবারও সঙ্গীতের মাধ্যমে মিলন ঘটেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের। চারদিকে যখন এত অস্থিরতা, এত সন্ত্রাস, এত হত্যা; তখন মানুষের এই মিলন উৎসবই হবে সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ, সবচেয়ে বড় শক্তি।

অমিত আচার্য হিমেল শিক্ষার্থী, সঙ্গীতশিল্পী

একজন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে আমার কাছে এ আয়োজনটি অন্যসব আয়োজন থেকে আলাদা। মূলত উচ্চাঙ্গের যে গান বা সঙ্গীত, তাই হলো উচ্চাঙ্গসঙ্গীত। একে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতও বলা হয়। আমি তো জানি, যে কোন ধরনের গান গাওয়ার জন্য উচ্চাঙ্গ বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চা করা খুবই প্রয়োজন। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গসঙ্গীত উৎসবের আয়োজনটি সত্যিই অসাধারণ। আমি মনে করি, এ উৎসবের মধ্য দিয়ে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শোনা ও চর্চার প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এমনকি যারা কখনই এ ধরনের সঙ্গীত আগে শোনেননি, এ উৎসব তাদেরও এই সঙ্গীতের প্রতি ভাল লাগা এনে দিয়েছে, দিচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, এ উৎসবটি আমাদের দেশের সংস্কৃতির বিকাশে অনন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। পাশাপাশি এ দেশে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের গুরুত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে, ভবিষ্যতেও পাবে আশা করি। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পীরা অংশ নেয়ার ফলে এ আয়োজনটি উপভোগের প্রতি সকলের আগ্রহ থাকে বেশি। রেডিও-টেলিভিশন কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে যে সকল শিল্পীর কণ্ঠ শুনতে পাই আমরা, সেই তাঁদের পারফর্মেন্স সরাসরি উপভোগ করা সত্যিই অনন্য এক অনুভূতি জন্ম দেয় মনে। সত্যি কথা বলতে কী, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আমার কাছে আগে যত না ভাল লাগত, এই উৎসবের ফলে সেই ভাল লাগা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। এছাড়া শাস্ত্রীয় সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের সঙ্গে বসে একসঙ্গে অনুষ্ঠান উপভোগ করা অত্যন্ত আনন্দেরও বটে। সারারাত ধরে চলে এ অনুষ্ঠান। তবু সময় যেন কিভাবে চলে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। মনে হয় যেন আরেকটু শুনতে পারলে ভাল লাগত। আবার এমন অনেক শিল্পীর পারফর্মেন্স উপভোগ করার সুযোগ হয় যাঁদের গান শোনা বা বাদ্য-বাদন কখনও শোনা হয়নি আগে। এতে অভিজ্ঞতা ঋদ্ধ হয়। আমি মনে করি, এই উৎসবের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রচিত হয়, সুদৃঢ় হয়। প্রতি বছরই এই আয়োজন অব্যাহত থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা।