২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তিন পাকিস্তানীসহ চার জেএমবি আটক, স্পাই মোবাইল উদ্ধার

তিন পাকিস্তানীসহ চার জেএমবি আটক, স্পাই মোবাইল উদ্ধার
  • সরকার উৎখাতে (!) এরাই ছিল নাশকতায় তৎপর

স্টাফ রিপোর্টার ॥ এবার স্পাই মোবাইল (গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত বিশেষ মোবাইল ফোন) ফোনসহ তিন পাকিস্তানী ও আটকেপড়া এক পাকিস্তানীসহ ৪ জেএমবি সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত পাঁচটি মোবাইল ফোনের মধ্যে একটি স্পাই মোবাইল। পাকিস্তানী নাগরিক ইদ্রিস তার স্পাই মোবাইলটি দিয়ে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের এক নারী গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখত। ইদ্রিসের মোবাইল ফোনটি প্রযুক্তির মাধ্যমে দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তার মোবাইল ফোনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকত। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলাসহ দেশে মারাত্মক নাশকতা চালিয়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে গ্রেফতারকৃতরা কাজ করছিল।

রবিবার রাতে রাজধানীর বিমানবন্দর থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইদ্রিস শেখ ও মকবুল শরীফকে গ্রেফতার করে। তাদের তথ্যমতে, খিলগাঁও থেকে গ্রেফতার করা হয় মোঃ সালাম ও মোঃ মোস্তফা জামানকে। তাদের কাছ থেকে জঙ্গীবাদ সংক্রান্ত ২৬ বই, তিনটি পাসপোর্ট, চার হাজার পাকিস্তানী রুপী, ভারতীয় পণ্যসামগ্রী, বাহরাইনের ১৩শ’ ডলার, জর্দানের ১৬শ’ ডলার উদ্ধার করা হয়েছে।

সোমবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, ইদ্রিস ও মকবুলের পাকিস্তানী পাসপোর্ট রয়েছে। তারা বাংলাদেশী বংশো™ূ¢ত পাকিস্তানী নাগরিক। তারা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে নিয়মিত যাতায়াত করত। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জেএমবি সদস্য বলে স্বীকার করেছে।

তিনি আরও জানান, জেএমবিকে দেশে পুনরায় সক্রিয় করা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নাশকতা চালিয়ে সরকার পতনের লক্ষ্যে তারা কাজ করছিল। বাংলাদেশকে জঙ্গীরাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে তারা নানা ষড়যন্ত্র করে আসছিল বলে স্বীকার করেছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের হত্যার চক্রান্তও রয়েছে তাদের। গ্রেফতারকৃতদের কাছে পাঁচটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ইদ্রিসের মোবাইলটি ‘স্পাই মোবাইল’ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ইদ্রিসের মোবাইল ফোনটির সঙ্গে বিদেশী একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধির নিয়মিত যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান হতো। এছাড়া ঢাকায় একটি বিদেশী মিশনে কর্মরত এক নারী গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গেও ইদ্রিস নিয়মিত যোগাযোগ রাখত।

মনিরুল ইসলাম জানান, ইদ্রিস ১৯৮৫ সালে ভারত হয়ে পাকিস্তান যায়। সেখানে ১৯৯০ সালে পাকিস্তানী এক নারীকে বিয়ে করে সেখানেই বসবাস শুরু করে। ২০০২ সালে দেশটির ‘পাক-মুসলিম এ্যালায়েন্স’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে একাই ফেরত এসে জেএমবির সঙ্গে যুক্ত হয়। পাসপোর্ট অনুযায়ী ইদ্রিস গত দুই বছরে ৪৮ বার বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যাতায়াত করেছে। মকবুলও ১৯৮৫ সালে পাকিস্তান যায়। নিয়মিত বাংলাদেশ-পাকিস্তান যাতায়াত করত। কাপড়ের ব্যবসার আড়ালে পাকিস্তানে জেএমবির সঙ্গে সক্রিয় মকবুল। জঙ্গী সংগঠনটিকে অর্থায়নও করত। গ্রেফতারকৃত সালামও নিয়মিত পাকিস্তান যাতায়াত করত। এছাড়া গ্রেফতারকৃত মোস্তফা ‘পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (পিআইএ)’ এ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রাফিক ইন্সপেক্টর। চারজনই ভারতীয় ও পাকিস্তানী জাল মুদ্রা পাচারে জড়িত। গ্রেফতারকৃতদের ত্রিশালে আসামি ছিনতাই, সাভারে ব্যাংক ডাকাতি এবং সম্প্রতি হোসেনী দালানে বোমা হামলা ও আশুলিয়ায় পুলিশ হত্যার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি চলছে।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, ইদ্রিস বাংলাদেশে অবস্থান করে জেএমবির হয়ে কাজ করছিল। জঙ্গী সংগঠনটিকে নানাভাবে সহায়তা করে আসছিল। ইদ্রিস জঙ্গী সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখত। ইদ্রিস ও মকবুলকে পাকিস্তানের একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থাই বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। তারা বাংলাদেশে পাকিস্তানী ওই গোয়েন্দা সংস্থাটির হয়ে কাজ করছিল। বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনকে সহায়তা করাই ছিল তাদের প্রধান কাজ। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি, গুপ্তহত্যা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার জন্যই তারা কাজ করছিল।

ইদ্রিসের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা এবং ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের এক নারী গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ইদ্রিস বিভিন্ন সময় বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে যেসব আলাপ-আলোচনা করত, তা রেকর্ডিং হয়ে ভিডিও আকারে চলে যেত দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাছে। স্পাই মোবাইলটি ওই দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তার মোবাইল ফোনের সঙ্গে প্রযুক্তির সাহায্যে সর্বক্ষণিক সংযুক্ত থাকত। ইদ্রিসের মোবাইল ফোন নিয়ে বিস্তর পর্যালোচনার পর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে ডিবি পুলিশ।

২০০৪ সালে পাকিস্তানী পাসপোর্টসহ একবার র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছিল ইদ্রিস। গ্রেফতারকৃতরা জেএমবির কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের জেএমবিতে ভেড়ানো এবং এরপর তাদের ট্রেনিং দিতে পাকিস্তানে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত। তারা বাংলাদেশের বহু রোহিঙ্গাকে পাকিস্তান থেকে জঙ্গী প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। পাকিস্তানে অবস্থানরত আবদুল কুদ্দুস নামে এক রোহিঙ্গার সঙ্গে মকবুলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকার প্রমাণ মিলেছে। অনেক রোহিঙ্গাকে পাকিস্তান থেকে জঙ্গী ট্রেনিং দিয়ে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায়ও পাঠিয়েছে মকবুল। আব্দুল কুদ্দুস নিয়মিত জেএমবি চালানোর জন্য পাকিস্তান থেকে টাকা পাঠিয়ে আসছে।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আব্দুস সালাম আটকেপড়া পাকিস্তানী। তার বসবাস বিহারী ক্যাম্পে। নিয়মিত পাকিস্তানে যাতায়াত করত। মোস্তফা পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের এ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রাফিক ইন্সপেক্টর। গ্রেফতারকৃতরা জালমুদ্রা পাকিস্তানের করাচী থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে পাচার করত।

ইতোপূর্বে ডিবি পুলিশ ৭ পাকিস্তানীকে জেএমবির সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গ্রেফতার করে। তাদের সঙ্গে সদ্য গ্রেফতারকৃত ৪ জনের যোগাযোগ ছিল। ওই সাত জনের সঙ্গে পাকিস্তানসহ আরেকটি শক্তিশালী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ থাকার প্রমাণ মিলেছে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেএমবি এখন তিন গ্রুপে বিভক্ত। আটক চারজন বর্তমানে কারাগারে আটক সাইদুর গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। এরা জেএমবিকে সক্রিয় করে নাশকতামূলক কর্মকা- চালিয়ে সরকারকে বিব্রত করতে চায়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আইএসের সাংগঠনিক ভিত্তির দালিলিক প্রমাণ মেলেনি। তবে বর্তমানে যে কয়টি জঙ্গী সংগঠন বাংলাদেশে সক্রিয় তাদের মধ্যে জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং হরকাতুল জিহাদ অন্যতম। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অধিকাংশ সদস্যই গা ঢাকা দিয়েছে। তবে তারা নিষ্ক্রিয় নয়। গোপনে কাজ করছে। হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দেশে জেএমবি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এর নেপথ্যে অন্যান্যের মধ্যে পাকিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশের কিছু জেএমবির সক্রিয় কর্মীও রয়েছে। মূলত আইএসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তারা বাংলাদেশে নানা ধরনের নাশকতামূলক কর্মকা- চালাচ্ছে।

২০১০ সালে জেএমবির আমির জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মুফতি মাওলানা সাইদুর রহমান জাফর গ্রেফতারের পর জেএমবি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জেএমবিসহ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন বাংলাদেশে আইএসের তৎপরতা থাকার বিষয়ে প্রচার প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। এজন্য তারাই নানা ধরনের নাশকতাও চালিয়ে আসছে।

এর মধ্যে অন্যতম চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি ডিবির হাতে গ্রেফতারকৃত জেএমবির সক্রিয় সদস্য ও আইএসের অনুসারী সাখাওয়াতুল কবির, আনোয়ার হোসেন বাতেন, রবিউল ইসলাম। সাখাওয়াতুল কবির রাজধানীর মহাখালী সরকারী তিতুমীর কলেজে ইংরেজী বিভাগে পড়াকালীন জেএমবি আমির সাইদুর রহমানের জামাই কারগিল ওরফে ইজাজের সঙ্গে পরিচয় হয়। ২০০৬ সালে জেএমবিতে যোগ দেয়। এরপর কবির জেএমবি আমির সাইদুর রহমানের মেয়েকে বিয়ে করেন। তারপর ইজাজের মাধ্যমেই ২০০৯ সালে পাকিস্তান চলে যান। সেখানে আল কায়েদায় যোগ দেন। মত বিরোধের কারণে আল কায়েদা ছেড়ে আইএসে যোগ দেন। আইএসের মতাদর্শ বিধর্মীদের দাওয়াত দেয়া। ইসলামের ছায়াতলে না এলে তাদের হত্যা করা। এমন আদর্শ নিয়েই কবির আইএসের হয়ে বাংলাদেশে কাজ করছিল।

ডিবির সূত্রটি আরও জানায়, চলতি বছরের শুরুতে পাকিস্তানের একটি স্কুলে হামলা চালিয়ে বহু শিশুকে হত্যা করে জঙ্গীরা। এরপর থেকেই পাকিস্তানে জঙ্গীদের ওপর ধারাবাহিক অভিযান চলছে। চলতি বছরের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের ওয়াজিরস্তানে পাকিস্তান পুলিশের অভিযানে বহু আইএস জঙ্গী নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশী জঙ্গীও রয়েছে। এরা হচ্ছেন গ্রেফতারকৃত জেএমবির আমির সাইদুর রহমানের মেয়ের জামাই ও গ্রেফতারকৃত সাখাওয়াতুল কবিরের ভায়রা সাজ্জাত ওরফে ইজাজ ওরফে কারগিল, কবিরের ভাগ্নি জামাই অভি, গ্রেফতারকৃত বাতেনের বোন পাকিস্তানে অবস্থিত ফাতেমার স্বামী সায়েম ও সায়েমের দুলাভাই শামীম। তারা সেখানে জঙ্গী ক্যাম্পে অবস্থান করে বিভিন্ন অপারেশন ও প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছিল। নিহতরা পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গী প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে যুদ্ধও করেছে। এখনও অন্তত শতাধিক বাংলাদেশী বর্তমানে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। যারা বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জেএমবি, হুজি, হিযবুত তাহরীর, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। তবে অধিকাংশই জেএমবি সদস্য। পাকিস্তানে ও আফগানিস্তানে ট্রেনিং নেয়ার আগে তাদের বাংলাদেশের বান্দরবনের থানচির একটি ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানে যারা অবস্থান করছে তারা নিয়মিত অর্থ ও পরামর্শ দিচ্ছে বাংলাদেশের জঙ্গী সংগঠনগুলোকে।

তাদের প্ররোচনায়ই গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টন এলাকা থেকে আইএসে যোগদানের প্রস্তুতি নেয়ার সময় জেএমবি সদস্য মোঃ হিফজুর রহমান (২২), রাজধানীর সেগুনবাগিচা ও রমনা এলাকা থেকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য মোঃ আসিফ আদনান (২৬) ও মোঃ ফজলে এলাহী তানজিল (২৪) ডিবির হাতে গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারকৃত আদনান সুপ্রীমকোর্টের এক সাবেক বিচারকের ছেলে। আর তানজিলের মা ওএসডি থাকা এক যুগ্ম সচিবের ছেলে।