১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রয়োজন কর্মসংস্থান

  • বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ আগামীতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ৮ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরির পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সেই সঙ্গে পাঁচটি ক্ষেত্রে নিজস্ব কায়দায় বাংলাদেশ ব্যাপক উন্নতি করেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এগুলো হচ্ছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগ, দুর্যোগ মোববেলা, শহর ও গ্রামের মধ্যে সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ^ব্যাংকের সিস্টেমেটিক কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সহায়তা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্ট এ্যানেট ডিক্সন এ ঘোষণা দিয়েছেন।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের এ ব্যাপক উন্নতির পিছনে শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, ভাল সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া শিল্প উৎপাদন খাতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি এ অগ্রগতিতে প্র্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদনে বিশ^ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ পাঁচটি খাতে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করার কারণে মোট জাতীয় আয় (জিএনআই) হিসেবে, ১৯৭২ সালে যেখানে মাথাপিছু আয় ১০০ ডলারের নিচে ছিল, সেখানে বর্তমানে ১ হাজার ৩১৪ ডলার। প্রথমত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অসামান্য সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭০ সালে যেখানে প্রতিজন নারী ছয় জন সন্তান জš§ দিত, সেটি কমে দুই জনে নেমে এসেছে। দ্বিতীয়ত কৃষি ক্ষেত্রে বহুমুখী উদ্যোগে আশির দশকে যেখানে ১ কোটি ২০ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হতো, সেটি বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন। তৃতীয়ত দুর্যোগ মোকাবেলায় বেশ ভাল ব্যবস্থাপনার পরিচয় দিয়েছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা, দুর্যোগে ক্ষতি হ্রাস, পূর্বাভাস এবং প্রচুর আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। চতুর্থত, শহর ও গ্রামের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে রাস্তা নির্মাণ করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, অন্যান্য শহর এবং বাজারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগে শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান কমেছে। সর্বশেষ লিঙ্গ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। এ কারণে নারী শিক্ষা, বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) এবং তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকরে প্রতিবেদন বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, বিশ্বব্যাংক যেসব বিষয়ে প্রশংসা করেছে এগুলো দেশের অন্যতম অর্জন। এর জন্য সরকারকে বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। তারই ফল হচ্ছে এসব অগ্রগতি। তাছাড়া ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সেসব বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বিষয়গুলোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরে পরিকল্পনার আওতায় ১ কোটি ২৯ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার মাধ্যমে শ্রমিকদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে নজর দেয়া প্রয়োজন। উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। আবার প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর দিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশক ধরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছয় শতাংশের বৃত্তে বন্দী। এ বৃত্ত ভেঙ্গে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আট শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন ব্যাপক কর্মসংস্থান। পাঁচটি খাতের ওপর নজর দিলেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ছয় শতাংশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভেঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। বিশ^ব্যাংক বলছে, পাঁচটি খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-জ্বালানি, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ অবকাঠামো বাড়ানো, অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংযুক্তি, নগরায়ন এবং ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে কর্মসংস্থানের যে সমস্যা রয়েছে সেটি দূর হবে। কারণ প্রতিবছর তিন দশমিক ১০ শতাংশ হারে শ্রম শক্তি বড় হচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ শ্রম শক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হবে। এদের দ্রুত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হবে বাংলাদেশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর (এমডিজি) মধ্যে অন্যতম সূচক ছিল ১৫ বছরের ওপরে শ্রম শক্তিতে যুক্ত হওয়া শত ভাগ মানুষকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে এর হার ৫৭ শতাংশ। ১৯৯০-৯১ সালে এর পরিমাণ ছিল সাড়ে ৪৮ শতাংশ। নারী শ্রম শক্তিদের অংশগ্রহণের মাত্রাও অনেক কম।

এ বিষয়ের ঢাকায় নিযুক্ত বিশ^ব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যেসব খাতের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নে নীতি প্রণয়ন ও সংস্কার প্রয়োজন। বিদ্যুতে স্বল্পমেয়াদে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন প্রয়োজন। যোগাযোগ অবকাঠামো খারাপ অবস্থায় রয়েছে, সেটি উন্নয়ন প্রয়োজন। গত কয়েক বছর রেল একই জায়গায় স্থবির, নদীপথের নাব্যতা হারিয়েছে এবং সড়কের অবস্থাও ভাল নয়। উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে এমন অবস্থার পরিবর্তন জরুরী। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় সেটি বাস্তবায়নের সময় এসেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন উন্নয়নের অন্তরায়। সেদিকটি বিবেচনায় পরিকল্পিত নগরায়ন প্রয়োজন। এজন্য নগর উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতের মধ্যে বিদ্যুতে গত ছয় বছরে উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর পরেও বিশে^র সবচেয়ে কম বিদ্যুত ব্যবহারকারী দেশ বাংলাদেশ। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় বাধা বিদ্যুত সঙ্কট। দেশে বিদ্যুত বঞ্চিত ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ। এসব মানুষকে সংযোগ দিতে পারলে দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। নগরায়নে অর্থ বরাদ্দ খুব কম দেয়া হয়। এর পরিমাণ জিডিপির এক শতাংশের কম। ১৯৯০ সালেও চীন নগরায়নে জিডিপির’র চার শতাংশ বরাদ্দ দিত। এসব দিক বিবেচনায় রাজধানীর নগরায়নে বিশেষ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

অন্যদিকে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ সফরের শেষ দিন গত ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকরে আঞ্চলিক ভাইস প্রেসিডেন্ট এ্যানেট ডিক্সন বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সর্বাাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশকে মধ্য আয়ে উন্নীত করতে এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। সংস্থাটির ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের দারিদ্র্য নিরসন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তিনি তার সফরে জেনেছেন। তিনি বলেন, মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হতে যেসব খাতে প্রয়োজন হবে সেসব খাতেই বিশ্বব্যাংক সহায়তা দেবে। তবে আগামীর উন্নয়নে ব্যাংলাদেশকে কিছু ক্ষেত্রে টেকসই সংস্কার করতে হবে।