২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঐক্যবদ্ধ বাঙালী অসীম শক্তিধর

  • পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়

কে করছে, কারা করছে এসব নিয়ে কথাবার্তা আর গালগল্প করে যারা মূল্যবান সময় নষ্ট করেন তাদের পাশ কাটিয়ে যাওয়াটাই শ্রেয়। কেন করছে, কী উদ্দেশ্যে করছে এসব নিয়েও সময় নষ্ট করার সময় নেই। বলছি সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যা ঘটেছে এবং ঘটছে সেইসব অঘটন প্রসঙ্গে। বিদেশী নাগরিক হত্যা, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী যাজকদের হত্যার হুমকি দেয়া। শিবগঞ্জের শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে হামলা এবং চারজনকে হতাহত করা, রাজধানীতে তাজিয়া মিছিল ও অন্যান্য স্থানে চোরগোপ্তা হামলায় নিরীহ মানুষ হত্যা ইত্যাদি ঘটনা দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, সত্য। অভিজিত থেকে শুরু করে দীপন হত্যা এবং প্রকাশক টুটুলসহ অন্যদের হত্যাচেষ্টা, টেলিফোনে কিংবা এসএমএসের মাধ্যমে গুণীজনদের হত্যার হুমকি দেয়াতেও দুশ্চিন্তা বাড়ে। কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে হত্যা ও সশস্ত্র আক্রমণ। গোপীবাগের সিক্স মার্ডার, বাড্ডায় প্রকৌশলী খিজির খান হত্যা, আশুলিয়ার ব্যাংকে ডাকাতি চালিয়ে সাতজনকে হত্যা, রংপুরে মাজারের খাদেমকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে মারাÑ এক সঙ্গে এতগুলো নানামুখী সন্ত্রাসের ঘটনায় সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন হবে, সেটা স্বাভাবিক। আমরাও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে পারি, সেটাও স্বাভাবিক।

দুশ্চিন্তা ও উদ্বিগ্নতার পাশাপাশি উজ্জীবিত এবং আশান্বিত হওয়ার ঘটনা তো কম নয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচার এবং সাজা কার্যকর করার মতো শুধু একটি ঘটনাই তো সকল দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, হতাশা ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয়। গত ২২ নবেম্বর কুখ্যাত সাকা চৌ এবং মুজাহিদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে একদিকে সাহসী শেখ হাসিনা যেমন আবারও প্রমাণ করলেন তিনি যা বলেন তাই করেন, অন্যদিকে কোটি কোটি বাঙালী হয়েছে উজ্জীবিত ও শঙ্কামুক্ত সাহসী। কোথায় গেল সাকার কুৎসিত দম্ভোক্তি, কোথায়ইবা মুজাহিদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারী বোলচাল! শেখ হাসিনার সরকার জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই মতো রাতদিন বিশ্রামহীনভাবে কাজও করছে। ধরা পড়ছে হত্যাকারী, হত্যাকারীর মদদদাতা। চিহ্নিত হচ্ছে চোরাগোপ্তা হামলাকারীদের গোপন আস্তানা, উদ্ধার হচ্ছে অস্ত্র, গোলাবারুদ, নকল অর্থ, জঙ্গীবাদের সপক্ষে প্রচারিত বইপত্র, ভিডিও চিত্র ইত্যাদি। পাওয়া যাচ্ছে হত্যার মোটিভ এবং তাদের রাজনীতির আসল উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য একটাই, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত অপশক্তির প্রতিশোধ গ্রহণ, স্বাধীন বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা, বাঙালীর চিরায়ত দর্শনের পিঠে কঠিন আঘাত হানা, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ক্রমাগত উন্নতির ভাবমূর্তি নষ্ট ও সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বাইরের মোড়লদের অনুপ্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করা ইত্যাদি। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দর্শনকে চিরতরে বিনষ্ট এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে সত্যি সত্যি শ্মশান বানানো।

একাত্তরের বিজয় দিবসের পর থেকেই যে এই ষড়যন্ত্রের শুরু, এ কথা বার বার বলেছি। পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টের পর থেকে এটা অনেক বেশি প্রকাশ্য ও নির্লজ্জভাবে করা হয়েছে।

রাষ্ট্র ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধের ভাবমূর্তিকে খাটো করার চেষ্টা হয়েছে। ‘স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতার নাম মুছে ফেলা হয়েছে সবখান থেকে। মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র চিরায়ত বাঙালী সংস্কৃতির পায়ে কুড়াল মারার অপচেষ্টা হয়েছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের প্রকাশ্য আন্দোলনে সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, যে কিনা একাত্তরের ‘মইত্যা রাজাকার’ সদম্ভে বলেছে এসব নাকি মিডিয়ার সৃষ্টি। সবাই একে একে প্রতিহত হয়েছে শেখ হাসিনার সাহসী এবং দৃঢ় মনোভাব ও সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্তের ফলে। বাঙালী জাতীয়তাবাদের হাজার বছরের সংস্কৃতিকে জীবন দর্শন হিসেবে আত্মস্থ করা শেখ হাসিনা জানেন পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পাড় ঘেঁষা জনপদের মানুষের অন্তরের কথা। ধর্মচর্চায় বিশ্বাসী ও সৎ মানুষেরা যে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক নয় সেটা তিনি ভাল করেই জানেন। এসব আপাত নিরীহ সরল মানুষগুলোর সম্মিলিত শক্তির ওপর তার দ্বিধাহীন নির্ভরতা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন বাংলার নরম পলিমাটির মতোই বাঙালীর চরিত্র। কিন্তু চৈত্রের খরতাপে সেই নরম মাটি পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যাও এটা বিশ্বাস করেন। তাই দেশের মানুষের ওপর তার প্রগাঢ় আস্থা। তাই তিনি সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাতে দ্বিধা করেন না। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনার প্রতিরোধে শেখ হাসিনার আহ্বান যথাযথ এবং কার্যকর ভূমিকা রাখবে। মহান একাত্তর আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

শুরুতে যে বলেছিলাম কে করছে, কারা করছে সন্ত্রাসের পৈশাচিক কাজ সেটা এখন আর বুঝতে অসুবিধা হয় না। একের পর এক সন্ত্রাস করে প্রচার করা হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নাম। তাতে লাভ দুই পক্ষেরই। স্থানীয় দুর্বৃত্তের দল তাদের পৈশাচিক কর্মকা-ের দায় আইএসের কাঁধে দিয়ে নিজেরা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার কৌশল নিচ্ছে। অপরদিকে আইএস ভাবছে বেশ তো মজা, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে আমাদের পরিচিতি এবং আধিপত্য মুফতে বিস্তৃত হচ্ছে। আফসোস যে তারা জানে না যে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মান্ধ জঙ্গী নয়। বাংলার মাটি যে দুর্জয় ঘাঁটি এবং সেই মাটির জনপদ যে বজ্রকঠিন ঐক্যে প্রতিহত করতে পারে মানবতার বিরুদ্ধাচারী সন্ত্রাসী ও জঙ্গীদের, এই কথা তাদের জানা নেই। কিন্তু যারা আইএসের নাম ব্যবহার করে নিজেদের অপকীর্তি ধামা দিতে চায় তারা কি একাত্তরের ‘গাবুইরা মাইর’-র কথা ভুলে গেছে!

প্রধানমন্ত্রী, সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা তো স্পষ্ট ও দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন যে দেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই। পুলিশের প্রধান বলেছেন, সকল সন্ত্রাসের শিকড় জামায়াত-শিবির। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামলাকারী ও জামায়াতের আদর্শ এক এবং রাজনৈতিকভাবে বেকায়দার পড়ায় জামায়াত এই রকম অপতৎপরতা করছে। তারা আরও বলেছেন যে, জামায়াতের রাজনৈতিক মৃত্যু হতে চলেছে বলেই এই ধরনের মরণকামড়।

জামায়াত-শিবিরের অনেক বাইপ্রোডাক্ট ছোট ছোট দল দেশ ও সমাজকে অস্থিতিশীল করার জন্য চোরাগোপ্তা হামলায় মানুষ হত্যা করছে, গুণীজনদের জীবননাশের হুমকি দিচ্ছে, কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের ওপর আক্রমণ করছে। দুর্বৃত্তের ছলের অন্ত নেই। আশঙ্কা হয় আরও কত কিনা তারা করে বসে।

বহুবার বলেছি, আবারও বলছি শুধু পুলিশ, র‌্যাব, মিলিটারি দিয়ে নাশকতা-দুর্বৃত্তায়ন ঠেকানো যাবে না। ঠেকাতে হবে প্রগতির রাজনীতি দিয়ে। সেই সঙ্গে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এই মুহূর্তে খুবই জরুরী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন বলেই বার বার সম্মিলিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ সৃষ্টি করার আহ্বান জানাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশজুড়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সকল প্রগতিশীল সামাজিক শক্তি, সাংস্কৃতিক শক্তি, রাজনৈতিক শক্তি, যুব ও ছাত্র শক্তি এবং নারী শক্তিকে কালবিলম্ব না করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুভ কর্মপথে ধরতে হবে নির্ভয়ের গান। জ্ঞানপাপী এবং দেশী-বিদেশী কিছু কুচক্রীর অপপ্রচারে জনমনে সৃষ্ট আতঙ্ক দূর করা এবং একই সঙ্গে প্রতিরোধের বীজমন্ত্র অন্তরে অন্তরে ছড়িয়ে দিয়ে জ্বালাতে হবে ঐক্যবদ্ধ বাঙালীর চেতনার আগুন। ইতিহাস বলে, ঐক্যবদ্ধ বাঙালীর অসীম শক্তির কাছে অসুর শক্তির পৈশাচিক বর্বরতা পরাজিত হয়েছে। এবারেও হবে।

তবে শুধু এই অভয় ভরসা নিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকলে এবং সব দায়িত্ব পুলিশ-র‌্যাবের ওপর ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে রাখলে বোকামি হবে। নিতে হবে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। ইতিহাসের দৃষ্টান্ত থেকেই কাটা যেতে পারে উদ্যোগের ছক। শক্তিশালী গণমাধ্যমের নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সকল কর্মকা-ের খবরাখবর ছড়িয়ে দিতে হবে দেশজুড়ে, তৃণমূল পর্যন্ত। দুর্ভাবনা, দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা, আতঙ্ক সরিয়ে দিয়ে শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে নির্ভাবনা ও স্বস্তির আস্থা তৈরি এই মুহূর্তের অন্যতম প্রধান কাজ। তাই সময় নষ্ট করার সময় আর নেই।

লেখক : নাট্য ব্যক্তিত্ব