১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের সূচনা

(১ ডিসেম্বরের পর)

সংবাদপত্রেই তার গ্রেফতারের খবর পাই। এর বেশি মোমতাজ বেগম সম্বন্ধে আমি কিছুই তখন জানতাম না। এই সভায় আমার বক্তব্য মোমতাজ বেগমের মেয়ে খুকী সংবাদ মাধ্যমে জানার পর সভার উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগপূর্বক আমার পরিচয় ঠিকানা ইত্যাদি সংগ্রহ করে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য টেলিফোন করেন। তার কাছেই আমি মোমতাজ বেগমের সম্বন্ধে বেশ কিছু জানতে পারি। মোমতাজ বেগম জন্মসূত্রে পশ্চিমবঙ্গের এক হিন্দু মেয়ে ছিলেন। তিনি ভালবেসে মুসলমান হন। তিনি কারাবন্দী হলে তার মুসলমান স্বামী তাকে পরিত্যাগ করেন ও তালাক দেন। তিনি প্রায় দুই বছর কারাবন্দী থাকেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার জন্য কোন চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। তার একটি মেয়ে ইতোমধ্যে জন্মেছিল এবং এই মেয়েকে নিয়ে তাকে খুবই কষ্টের জীবনযাপন করতে হয়। মোমতাজের মেয়ের কাছে এখন আমি মামা বলেই পরিচিত।

আমি ২৯ তারিখ ঢাকা ছেড়ে পরদিনই সিলেট পৌঁছলাম। সেখানে দেখি বক্তা হিসেবে আমার কদর বেড়ে গেল। সবাই ঢাকার খবর প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশগ্রহণকারীর কাছে শুনতে চায়। সিলেটের গোবিন্দ পার্কে ১ মার্চ আমি প্রথমবারের মতো সিলেট শহরে রাজনৈতিক বক্তৃতা করি। ৩ মার্চ আমার ডাক পড়ল সিলেটের অনতিদূরে তাজপুরে আর একটি বক্তৃতা করতে। ৫ মার্চ গোবিন্দ পার্কে আর একটি সভা আগেই ডাকা হয়েছিল। তাতে সভাপতিত্ব করেন আমার আব্বা এবং আমি ছিলাম বক্তাদের মধ্যে একজন। আমার আব্বা এবং আম্মা ১৯৪৮ সাল থেকেই ভাষা আন্দোলনে সিলেটে নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন। ৯ মার্চ আমি গেলাম ছাতকে বক্তৃতা করতে। সর্বশেষ ১৫ মার্চ গোবিন্দ পার্কে আর একটি ভাষা আন্দোলনের সভায় আমি বক্তৃতা করি। ইতোমধ্যে পুলিশ ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সকল সদস্যের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করল এবং ৭ মার্চ শান্তিনগরে যখন তারা একটি সভায় সম্মিলিত হন তখন তাদের প্রায় সবাইকে গ্রেফতার করে। অনেকেই ধারণা করেন যে, তাদের এই গ্রেফতার করার সুযোগটি ৭ মার্চে যারা এখানে সম্মিলিত হন তাদের কোন ব্যক্তির সহায়তায় অনুষ্ঠিত হয়। কানাঘুষা অনেক হয়েছে; কিন্তু কোনদিনই এই ব্যক্তিটির নাম প্রকাশিত হয়নি। মওলানা ভাসানী এই সভায় ছিলেন না এবং সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব এই সভায় থাকা সত্ত্বেও ঘরে একটি মাচানে আশ্রয় নিয়েছেন বলে রক্ষা পেয়ে যান। ৭ তারিখের পর আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাওয়ার ফলে অন্য যাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া ছিল তারা প্রায় সকলেই আত্মসমর্পণ করেন। তাই মার্চের মাঝামাঝিতেই ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে। আমরা জানি বাস্তবে ভাষা আন্দোলনটি ২১ ফেব্রুয়ারির দমননীতির কারণেই শক্তি সঞ্চয় করে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারা সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে দেয়। কেন্দ্রীয় গণপরিষদ ভাষা আন্দোলন নিয়ে ১০ এপ্রিল একটি বিতর্কের সুযোগ করে দেয়। এই বিতর্কের বিষয় ছিল চট্টগ্রামের গণপরিষদের সদস্য নূর আহমেদের একটি প্রস্তাব যে, ‘বাংলা ভাষা উর্দু ভাষার সঙ্গে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হবে’। এই আলোচনায় বাংলা ভাষার পক্ষে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বক্তব্য রাখেন কংগ্রেস সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, কামিনীকুমার দত্ত, ভবেশচন্দ্র নন্দী এবং রাজকুমার চক্রবর্তী। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সিন্ধু প্রদেশের শেঠ সুখদেব এবং পাঞ্জাবের শওকত হায়াত খান বাংলার পক্ষে মন্তব্য রাখেন। চলবে...