২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফ্রান্সে চূড়ান্ত হওয়ার পরও জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষর তিন মাস পেছাতে পারে

  • ছয় ভাষায় অনুবাদের পর আইনগত দিক খতিয়ে দেখা হবে

কাওসার রহমান, প্যারিস থেকে ॥ ফ্রান্সে চূড়ান্ত হলেও বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষর তিন মাস পিছিয়ে যেতে পারে। তিন মাস পর আগামী মার্চে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সকল দেশকে নিয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে। এর কারণ হচ্ছেÑ ফ্রান্সে চূড়ান্ত হওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তিটি ছয়টি ভাষায় অনুবাদ করতে হবে। ছয় ভাষায় অনুবাদ করার পর তার আইনগত দিকগুলো খতিয়ে দেখা হবে। আইন বিভাগের ভেটিংয়ের পরই এই চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। এ প্রক্রিয়ার কারণেই জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি তিন মাস পিছিয়ে যেতে পারে। তবে বাংলাদেশ চাইছে, নতুন বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তিতে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত এবং ক্ষয় ও ক্ষতির ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত করতে। এজন্য বাংলাদেশ সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যাতে এ দুটি ইস্যু প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ধারা হিসেবে রাখা হয়।

চুক্তি স্বাক্ষর পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এই চুক্তি কার্যকরের সময় নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। কোন কোন দেশ চাইছে, এই চুক্তি পূর্বনির্ধারিত ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করতে। আবার কোন কোন দেশ চাইছে এই চুক্তি কার্যকরের বিষয়টিও তিন থেকে চার মাস পিছিয়ে নিয়ে যেতে। তারা চাইছে ২০২০ সালের পহেলা মার্চ বা পহেলা এপ্রিল থেকে কার্যকর করতে। তবে বাংলাদেশসহ জলবায়ুর ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো চাইছে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকেই এই চুক্তি কার্যকর করতে। কারণ এ দেশগুলো মনে করছে, চুক্তি কার্যকর যতটা পেছাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর ঝুঁকির মাত্রা তত বৃদ্ধি পাবে।

গত ২৯ নবেম্বর থেকে বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তির ওপর আলোচনা শুরু হয়েছে। জার্মানির বনে চূড়ান্ত হওয়া খসড়া দলিলটি (টেক্সট) প্যারিসে ২১তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টির সভায় চূড়ান্ত আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হয়। গত দুই দিন ধরে গ্রুপে গ্রুপে এর ওপর আলোচনা চলছে। এ আলোচনা আগামী ৫ ডিসেম্বর শেষ হবে। আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে এ চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে। তবে প্যারিস জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের সবচেয়ে নাটকীয় দিক হলোÑ বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তিটিও এখন ¯œায়ুযুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এ চুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির ব্যাপারে এখনও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্বোধনী দিনের শ্রুতিমধুর বক্তব্যের কোথাও কার্বন নির্গমন রোধে আইনগত চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে কোন দিকনির্দেশনা নেই। এ নিয়ে জলবায়ু সম্মেলনে আসা পরিবেশবাদীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, ওবামার বক্তব্য কোপেনহেগেনে দেয়া বক্তব্যেরই অনুরূপ। যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পোন্নত ও জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মতো পরিবেশবাদীরাও সম্মেলন কেন্দ্রের ভেতরে মানববন্ধন ও অবস্থান নিয়ে আইনগত চুক্তি স্বাক্ষরের দাবি জোরদার করছেন।

অপরদিকে রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স সরাসরি জলবায়ু চুক্তির সপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। মূলত জলবায়ু চুক্তিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিপরীতমুখী অবস্থান জলবায়ু আলোচনায় নাটকীয়তার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে হঠাৎ করেই প্যারিসে এসে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তির সপক্ষে অবস্থানকে বিশ্লেষকরা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মনে করছেন। কারণ এই রাশিয়াই ঘোষণা দিয়ে কিয়েটো প্রটোকল থেকে তাদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই প্যারিসে কোন প্রকার আইনগত জলবায়ু চুক্তির বিরোধিতা করে আসছে। দেশটি বলে আসছে, প্যারিসে কোন আইনী চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস তা অনুমোদন করবে না। এ কথা বলেই যুক্তরাষ্ট্র বসে থাকেনি, প্যারিসে যাতে কোন আইনী চুক্তি না হয় সেজন্য দেশটি তার সমমনা বন্ধু দেশের কাছে চিঠি দিয়েছে। সেই চিঠি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় দেশটি অবশ্য কিছুটা বিব্রত অবস্থায় পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এ প্রসঙ্গে জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. মনজুরুল হান্নান খান বলেন, প্যারিসে একটি জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে রাশিয়ার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। জলবায়ু চুক্তির পক্ষে ফ্রান্স, চীনের সঙ্গে রাশিয়ার অবস্থান এটি একটি ইতিবাচক দিকও বটে। তিনি বলেন, বাংলাদেশও সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে জলবায়ু চুক্তির পক্ষে চাপ সৃষ্টি করছে। কারণ এ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের চার কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। ড. হান্নান বলেন, এ বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের দায়ভার বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব হবে না। এ কারণেই বাংলাদেশ জলবায়ু উদ্বাস্তু ইস্যুটি মূলত চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।