১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুন্সীগঞ্জে প্লাস্টিক শিল্প নগরীসহ একনেকে ৭ প্রকল্প অনুমোদন

  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে সমন্বয় কমিটি গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ মুন্সীগঞ্জে দেশের প্রথম প্লাস্টিক শিল্পনগরীসহ ৭ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারী তহবিলের ২ হাজার ১১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ২৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপার্সন শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, পরিকল্পনা সচিব সফিকুল আজম, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব কানিজ ফাতেমা, আইএমইডি সচিব শহীদ উল্ল্যা খন্দকার এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হুমায়ুন খালিদ ও গোলাম ফারুক উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে, রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে সমন্বয় কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, দুই সিটি কর্পোরেশনের জন্য আলাদাভাবে দামি ও স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রয়োজন নেই। সেক্ষেত্রে একটি যন্ত্র কিনে এক স্থান থেকে যাতে বর্জ্য ব্যবস্থা সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে করা যায় সেজন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেনকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করতে হবে। একনেক বৈঠকে এ নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। একনেক সভায় প্রধান মন্ত্রী বলেন, যেকোন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় দরদাতারা যাতে কম দাম দেখিয়ে কাজ নিয়ে পরবর্তীতে কাজ না করে প্রকল্প সংশোধনের পাঁয়তারা করেন সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য সরকারী ক্রয় আইন ও বিধিমালা সংশোধন দ্রুত করতে তাগিদ দিয়েছেন তিনি। তাছাড়া সরকারী পুকুর উদ্ধারে জেলা প্রশাসকদের দায়িত্ব দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, উদ্ধারের পর এসব পুকুরে মাছ চাষ করা যাবে না, কেননা এতে করে পানি নষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিকভাবেই যেসব মাছ হবে সেগুলোই সবাই খেতে পারবে। অন্যদিকে যন্ত্রতন্ত্র মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন না করার নির্দেশও দিয়েছেন এ বৈঠকে। এক্ষেত্রে নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জনসংখ্যা, ছাত্র, রোগী ও ডাক্তারের অনুপাত হিসাব করে মেডিক্যাল কলেজ তৈরির স্থান নির্বাচন করতে হবে। যেখানে সরকারী মেডিক্যাল কলেজ থাকবে সেখানে বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ করা যাবে না। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিল্প নগরীতে ৩৭০টি শিল্প প্লট স্থাপিত হবে। এর মধ্যে ১০ শতাংশ মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। ৩৭০টি প্লটে কমবেশি ৩৬০টি শিল্প ইউনিট স্থাপিত হবে। এসব শিল্প ইউনিটসমূহে ১৮ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে, যা দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হচ্ছে, পল্লী অঞ্চলে পানি সরবরাহ প্রকল্প, এর ব্যয় ৭৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সেবা দ্রুতকরণ প্রকল্প, এর ব্যয় ৮৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এসবি/সিআইডি ভবনের ৭ম থেকে ১১তম তলা পর্যন্ত উর্ধমুখী সম্প্রসারণ প্রকল্প, এর ব্যয় ৪৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। মানিকগঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্প, এর ব্যয় ৬১৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (২য় সংশোধিত) প্রকল্প, এর ব্যয় ২৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব রিসোর্স ফর প্রর্ভাটি এ্যালিভিয়েশন থ্রো কমপ্রিহেনসিভ টেকনোলজি প্রকল্প, এর ব্যয় ৬২ কোটি ২০ লাখ টাকা। বিসিক প্লাস্টিক শিল্পনগরী প্রকল্প, এর ব্যয় ১৩৩ কোটি টাকা।

প্র্রকল্পের বিস্তারিত হচ্ছে, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) ধলেশ্বরী নদীর কাছে ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কের পাশে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে প্লাস্টিক শিল্পনগরী তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ শিল্প নগরীটি গড়ে উঠলে পুরান ঢাকার আশপাশে অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবশে গড়ে ওঠা প্লাস্টিক শিল্প-কারাখানাগুলোকে পরিবেশসম্মত উপযোগী স্থানে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে মানসম্মত প্লাস্টিক দ্রব্য উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি এবং জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান বাড়াবে এবং কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হব বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি তৈরিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩৩ কোটি টাকা।

শিল্পমন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্লাস্টিক শিল্প দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত হওয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এ শিল্পের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ঘটেনি। পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশে যেতে হলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের অবদান বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ হাজার ৩০টি প্লাস্টিক শিল্প-কারখানা রয়েছে। যার অধিকাংশই বেসরকারী মালিকানাধীন। এর মধ্যে ৫০টি বড়, ১ হাজার ৪৮০টি মাঝারি এবং প্রায় ৩ হাজার ৩০টি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে ৮০ শতাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক এবং ক্ষুদ্র কারখানার ৯০ শতাংশই পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত। প্লাস্টিক শিল্পগুলো মূলত বেসরকারী উদ্যোগে বেশিরভাগই অপরিকল্পিত, অপরিসর এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গড়ে উঠেছে। এতে পরিবেশগত ভারসাম্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। এ কারণে এসব শিল্পকে ঢাকা শহরের নিকটবর্তী কোন পরিবেশসম্মত স্থানে স্থানান্তরের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিসিক ও প্লাস্টিক শিল্প সমিতির সমন্বয়ে শিল্পনগরী স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরবর্তীতে সম্ভাব্যতা যাচাই এরপর ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জে চরগুলগুলিয়া নামক স্থানে শিল্প নগরীটি স্থাপনের জন্য বিসিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে এবং ২০০৮ সালের ২৪ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হয়। ওই সভায় ৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণের যৌক্তিকতা ও এত অধিক জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে পুনর্পরীক্ষার প্রয়োজন আছে বলে নির্দেশ দেয়া হয়। এ বিষয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশ এবং মন্ত্রণালয়ের এডিপি সভায় নির্দেশনা অনুযায়ী প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য ২৫ একর জমির প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে প্লাস্টিক শিল্প মালিকরা ১০০ একর জমির ওপর শিল্প নগরীটি স্থাপনের দাবি জানান। এ পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পমন্ত্রী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। এরপর ড্যাপ-এর কারণে ইতোপূর্বে কেরানীগঞ্জের চিহ্নিত স্থানটি স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়। এ পর্যায়ে বিসিক নতুনভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করে মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার অন্তর্গত বড়বর্তা এলাকায় নতুনভাবে স্থান নির্বাচন করে। সম্ভাব্যতা কমিটি প্রকল্পের আয়তন ৫০ একর করার সুপারিশ করে। কমিটির সুপারিশ ও শিল্পমন্ত্রীর নির্দেনশনায় প্রকল্পটির আকার ৫০ একর ধরে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। গত ২৫ মে প্রকল্পটির ওপর পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হলে এটির প্রক্রিয়াকরণ সমাপ্ত করা হয়েছে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম হচ্ছে, ৫০ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ৯ লাখ ২৫ হাজার ১০৩ ঘনমিটার ভূমি উন্নয়ন, ৩৭৫ বর্গমিটার প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ (তৃতীয় তলা পর্যন্ত), ২ হাজার গ্যালন ভূ-গর্ভস্থ পানি সংরক্ষণ, ২ হাজার গ্যালন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ৯৩ বর্গমিটার পাম্প ড্রাইভার, ৩৫ হাজার ৬৩৩ বর্গমিটার সড়ক নির্মাণ, ৩ হাজার ৫০৮ মিটার মেইন ড্রেন নির্মাণ, ৫ হাজার ৬০৬ মিটার সাব-ড্রেন নির্মাণ, ৭০০ মিটার আউটলেট ড্রেন, ৫৩টি কালভাট তৈরি, ৫ হাজার ২৪৪ মিটার পানি সরবরাহের পাইপ লাইন তৈরি, ৫ হাজার ১৭৩ মিটার গ্যাস সরবরাহ লাইন, ২৯ দশমিক ৫ মিলোমিটার দুটি বৈদ্যুতিক লাইন ও সাব-স্টেশন স্থাপন এবং ২ হাজার ১৪৯ মিটার শিল্পনগরীর সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হবে।