১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি এসো স্বদেশ ব্রতের মহা দীক্ষা লভি...

স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি এসো স্বদেশ ব্রতের মহা দীক্ষা লভি...
  • দৃপ্ত শপথের মাস ডিসেম্বর

মোরসালিন মিজান ॥ পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে/রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল/জোয়ার এসেছে জন-সমুদ্রে/রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল...। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম শেষে রক্ত লাল সূর্যের দেখা পেয়েছিল বাঙালী। প্রাণপণ লড়ে স্বজাতির জন্য নতুন ভোর এনেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। বহু ত্যাগ আর এক নদী রক্তে পাওয়া বাংলাদেশ। গীতিকবির ভাষায়- রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি বাংলাদেশের নাম। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে অর্জিত হয়েছিল চূড়ান্ত বিজয়। বছর ঘুরে আবারও এসেছে সেই গৌরবের মাস। এই মাস আনন্দের। উৎসবের। এবং শপথের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন করে নিজেকে রাঙায় বাঙালী। ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা গ্রহণ করে।

ইতিহাসটি সকলের জানা। পশ্চিম পাকিস্তানীদের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়েছিল বাঙালী। মুক্ত স্বাধীন দেশ চেয়েছিল। এ জন্য যার যা আছে তাই নিয়ে লড়তে হয়েছিল। প্রাণপণ লড়ে যে বিজয়, সেটি অর্জিত হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ডিসেম্বর তাই খুব আবেগঘন মাস। কত কত স্মৃতি মনে উকি দিয়ে যায়! অনেক বেদনার ইতিহাস মাসটির সঙ্গে জুড়ে আছে। ত্রিশ লাখ প্রাণ বলি দিতে হয়েছিল। নির্বিচারে হত্যা করেছে পাকিস্তান বাহিনী। মায়েদের, মেয়েদের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। ঘড়-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে সারা বাংলা পেয়েছিল শশ্মানের চেহারা। বাঙালী তবু মাথা নোয়াবার নয়। বিজয়ী হয়ে তবেই ফিরেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ডিসেম্বর এলে সেইসব স্মৃতি সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রিয়জন হারানোর শোক নতুন করে বুক বিদীর্ণ করে বটে। ততধিক সত্য হয়ে ধরা দেয় বিজয়ের আনন্দ।

এবারও নানা আয়োজনে উদ্যাপন করা হবে বিজয় দিবস। সারাদেশেই চলছে উৎসব অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। রাজধানী ঢাকার সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিজয় দিবসের উৎসব আয়োজনে ব্যস্ত এখন। আছে রাষ্ট্রীয় নানা কর্মসূচী। সব মঞ্চ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের কথা। এখন কথায় গানে কবিতায় সর্বত্র উচ্চারিত হচ্ছে বাঙালীর আত্মদানের ইতিহাস। পূর্ব পুরুষের বীরত্বগাঁথা নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করছে।

মুক্তিযুদ্ধাদের বীরত্বে পাওয়া জাতীয় পতাকাটিও এ সময় যেন নতুন প্রাণ পায়। লাল সবুজের পতাকা বহন করে একেবারে সাধারণ রিক্সা চালকও। বাচ্চারাও পতাকার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। লম্বা বাঁশে বিভিন্ন আকারের পতাকা উড়িয়ে দিয়ে হেঁটে চলে বিক্রেতা। দেখে মনে পড়ে যায় সেই গানÑ বিজয় নিশান উড়ছে ঐ/খুশির হাওয়ায় ঐ উড়ছে/ বাংলার ঘরে ঘরে/ মুক্তির আলো ঐ ঝরছে...। সত্যি অপরূপ সে দৃশ্য! এই পতাকা বাঙালীর বিজয়ের ইতিহাসকে ধারণ করে আছে। বিশেষ করে এই ডিসেম্বরে বিশেষ দুলছে যেন জাতীয় পতাকা। কারণটি কারও অজানা নয়। হ্যাঁ, মাত্র কয়েকদিন আগে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। বহুকাল ধরে বাংলার বুকে বিষকাঁটা হয়ে বিঁধেছিল সাকা মুজাহিদ। এই কাঁটাদের ওপরে ফেলা ছিল সময়ের দাবি। কবির ভাষায়Ñ আমার এন্তেকালের ভয় নেই, আখেরাতের লোভ নেই,/ মন্দার বা অমৃত আমাকে আকৃষ্ট করে না,/ শুধু এই ঝোপড়ার জন্য- এই জন্মভূমির জন্য আমার রোযা-আমার উপবাস/ অষ্টপ্রহর প্রার্থনা-পাঁচওয়াক্ত নামাজ,/ মাননীয় বিচারক,/রহম্ করুন, আমার মাতৃভূমি আমায় ফিরিয়ে দিন...। সেই বাংলাদেশ ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ এগিয়ে চলেছে। এরই মাঝে বড় বড় হুঙ্কার, দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র, টাকার খেলা সব ব্যর্থ হয়েছে। জয়ী হয়েছে মানবতা। একের পর এক ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হয়েছে, এই দেশ পেছনে পড়ে থাকবার নয়। সামনে এগিয়ে যাবে কেবল। এরপরও সতর্ক থাকতে হবে। সকল ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ার শপথ নিতে হবে। কবির ভাষায় বললেÑ স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি এসো স্বদেশ ব্রতের মহা দীক্ষা লভি ...।