১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বগুড়ার শিয়া মসজিদে হামলার তদন্তে কোন অগ্রগতি নেই

  • সন্দেহের তীর জেএমবির দিকে;###;আহত ইমামকে ঢাকায় স্থানান্তর

সমুদ্র হক/মাহমুদুল আলম নয়ন, বগুড়া অফিস ॥ বগুড়ার গ্রামে শিয়া অনুসারীদের মসজিদে বন্দুকধারী দুর্বৃত্তদের হামলার ঘটনায় পুলিশের সন্দেহের তীর এখনও শিয়া বিদ্বেষী জঙ্গী ও কথিত জেএমবির দিকে। এর বাইরে নেপথ্যে আর কিছু থাকতে পারে কিনা তা এখনও খোলাসা করে বলতে পারছে না পুলিশ। যাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তারাও মুখ খুলছে না, এমন ভাষ্য পুলিশের। র‌্যাব বলছে অপরাধী আটক অভিযান চলমান। ছায়া তদন্তে থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে খবর নেই। ডিবি সিআইডি ডিএসবি ঢাকা থেকে আসা স্পেশাল ব্রাঞ্চ একই পথে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ফলাফল জিরো। এদিকে গুলিবিদ্ধ গুরুতর আহত মসজিদের ইমাম শাহীনূরের (২৬) কোমরে বিঁধে থাকা বুলেট বের করতে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে দুই দফা অপারেশনে ব্যর্থ হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে তোলপাড় করা বগুড়ার শিবগঞ্জের শিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে মুসল্লিদের ওপর বন্দুকধারী দুর্বৃত্তদের হামলায় হতাহতের ঘটনার মোটিভ বা উদ্দেশ্য কি এ নিয়ে এখন সাধারণের মধ্যে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়েছে। কৌতূহলী (!) সুধীজনও এখন নানাভাবে তা বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। বলাবলি হচ্ছে বগুড়ার শিবগঞ্জের নিভৃতে গ্রাম চককানু ও হরিপুরে যে শিয়া অনুসারীদের বাস এবং তাদের মসজিদও আছে তা এতকাল অনেকেরই জানা ছিল না। এমনকি ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও জানতেন না মসজিদটি শিয়া সম্প্রদারের। না জানার কারণ শিয়া ও সুন্নিদের সম্প্রীতির সঙ্গে বাস। সুন্নি পরিবার থেকে অনেকে শিয়া অনুসারী হওয়ায় একই পরিবারে দুই অনুসারী আছে। হামলাকারীরা যে সূক্ষ্ম কৌশলে এবং সুপরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ ‘ইল মোটিভে’ বাংলাদেশের দিকে বহির্বিশ্বের দৃষ্টি আনতে এই কাজটি করেছে তাও পরিষ্কার হয়ে যায়। গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভিন্ন মতাবলম্বী এবং প্রগতিশীল ভাবনার মানুষদের ওপর হামলা, হত্যার হুমকি প্রমাণ করে বগুড়ার শিয়া মসজিদে হামলা একই সূত্রে গাঁথা। এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হামলাকারী কে, কারা ও কোন গোষ্ঠী! কেন এই হামলা!

প্রতিবারই হামলার এক ঘণ্টার মধ্যেই দায় স্বীকার করছে কথিত আইএস। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন দেশে আইএস নেই। তাহলে কোথায় থেকে কথিত দায় স্বীকারের বিষয়টি আসছে! বগুড়ায় পুলিশ যে তিনজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তাদের একজন জেএমবির ক্যাডার ও এহসার সদস্য। বগুড়া অঞ্চলে জেএমবির উত্থান বছর দশেক আগে ২ হাজার ৫ সালে। জেএমবি প্রধান সিদ্দিকুল ইসলামের (বাংলা ভাই নামে পরিচিত) বাড়ি বগুড়ার গাবতলি। জেএমবির সাংগঠনিক প্রধান শায়খ আব্দুর রহমানের বাড়ি জামালপুরে। বিচারে মৃত্যুদ-াদেশ প্রাপ্ত বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমানসহ ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২ হাজার ৭ সালের মার্চে। বর্তমানে ধারণা করা হচ্ছে জেএমবিসহ নানা জঙ্গী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটছে। তার আলামতও পরিষ্কার হচ্ছে দিন দিন। গেল ৮ নবেম্বর বগুড়ায় উগ্র মৌলবাদী আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের জেলা কমান্ডার মেহেদী হাসান জিহাদ ও ডেপুটি কমান্ডার মুদাছছির তানজিমকে অস্ত্র ও জিহাদী পুস্তকসহ গ্রেফতার করা হয়। এরা দুইজনই আগে জেএমবিতে ছিল। বগুড়ায় মাঝেমধ্যেই উগ্র গোষ্ঠীর সদস্যদের আটক করা হচ্ছে। ২ হাজার ১৩ সালের ২২ আগস্ট বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়ায় একটি ছাত্রাবাসে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে লাইট মেশিন গান (এলএমজি) সাব মেশিনগান (এসএমজি) পিস্তল রিভলবারসহ বিপুল গুলি ও জিহাদী পুস্তক উদ্ধার ও তিন তরুণকে গ্রেফতার করে। বাকিরা পালিয়ে যায়। তারা বিইএম নামের একটি জঙ্গী সংগঠনের সদস্য বলে পরিচয় দেয়। পরে খোঁজ করে জানা যায় এই নামের সংগঠনটি প্রকৃত অর্থে জেএমবির।

বর্তমানে জেএমবির ছদ্মাবরাণে ভিন্ন নামে উগ্র জঙ্গী গোষ্ঠী মাঠে নেমেছে কি না এবং তারা কাদের হয়ে কাজ করছে এ বিষয়টিও ভেবে দেখার সময় এসেছে, এমন মন্তব্য একজন কলেজ শিক্ষকের। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের বগুড়ার সভাপতি মাছুদুর রহমান হেলালের কথা বগুড়া ও আশপাশের এলাকাগুলোতে যে উগ্র মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠীর বিচরণ ছিল তার প্রমাণ তো হাতের কাছেই আছে। ২ হাজার ৩ সালের ১৪ আগস্ট জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের উত্তর মহেষপুরে জঙ্গীদের সঙ্গে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধ হয়। একই বছরের ২০ জানুয়ারি ক্ষেতলাল থেকে অল্প দূরে কালাইয়ের বেগুন গ্রামে মসজিদের খাদেমসহ ৫ জনকে জবাই করা হয়। ২ হাজার ৫ সালের ১৭ আগস্ট জেএমবি দেশজুড়ে এক যোগে বোমা ফাটিয়ে জানান দেয়। এরপর বাংলাভাই শায়েখ আব্দুর রহমান জেএমবিকে নিয়ে এক অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করে।

বগুড়ার গ্রামে শিয়া মসজিদে মুসল্লিদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলা কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই সূত্রে গাঁথা।