১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পার্বত্য চুক্তির বর্ষপূর্তি আজ- বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষোভ জনসংহতির

পার্বত্য চুক্তির বর্ষপূর্তি আজ- বাস্তবায়ন নিয়ে ক্ষোভ জনসংহতির

নিখিল মানখিন ॥ পার্বত চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে চলছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। সরকার বলছে, সরকারী উদ্যোগগুলোর মধ্যে পৃথক মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন কমিটি, কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠন, আইন প্রণয়ন, কিছুসংখ্যক সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, ভারত প্রত্যাগত পরিবার এবং শান্তিবাহিনীর সদস্যদের পুনর্বাসন এবং চলমান আলোচনা উল্লেখযোগ্য। জেএসএস বলছে, দীর্ঘ সময় গতিহীন থাকায় সরকারী উদ্যোগগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে পাহাড়ীরা। বর্তমান সরকারের আমলে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন মৌলিক অগ্রগতি হয়নি। চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়টি বর্তমান সরকারের আমলে কেবল একের পর এক প্রতিশ্রুতি প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নে আর কালক্ষেপণ মেনে নেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছে জেএসএস। এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৮তম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন হচ্ছে আজ বুধবার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিরাজমান পরিস্থিতি নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতির কয়েক দফা সংলাপের পর সরকার গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি ৪ খ-ে বিভক্ত। ক খ-ে ৪, খ খ-ে ৩৫, গ খ-ে ১৪ এবং ঘ খ-ে ১৯টি সর্বমোট ৭২টি ধারা রয়েছে।

৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি পুরোপুরি বাস্তবায়িত- সরকার ॥ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ক খ-ের ধারা, ১, ২, ৩ ও ৪, ‘খ’ খ-ের ১, ২, ৩, ৫, ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ২০,২১, ২২, ২৩, ২৫, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ও ৩৩; ‘গ’ খ-ের ১, ৭, ৮, ৯, ১০, ১২, ১৪, এবং ‘ঘ’ খ-ের ১, ৫, ৮, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬ ও ১৯ ধারা মোট ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। আর ‘খ’ খ-ের ৪(ঘ), ৯, ১৯, ২৪, ২৭, ৩৪, ‘গ’ খ-ের ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ‘ঘ’ খ-ের ৪, ৬, ১৭, ১৮ নম্বর মোট ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ‘খ’ খ-ের ২৬, ২৯, ৩৫; ‘গ’ খ-ের ১১, ১৩ ‘ঘ’ খ-ের ২, ৩, ৭, ৯, নম্বর ধারা মোট ৯টি ধারা বাস্তবান চলমান রয়েছে।

শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে সরকার। সরকার পক্ষ বলছে, শান্তি চুক্তির অধিকাংশ ধারাই ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। চুক্তির বাকি ধারা বাস্তবায়ন করতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলের লোক সরকারী চাকরি পেতে পারে, এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য বিভিন্ন নীতি ও আইন শিথিল করা হয়েছে। ইউএনডিপি, ইউনিসেফ, এডিবি, ড্যানিডা, ইইউ, সিডা ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সহায়তায় পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন মেয়াদী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। রাঙামাটিতে একটি বিজ্ঞান ও আইসিটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময় পার্বত্য অঞ্চলে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের মধ্য দিয়ে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শান্তি ও উন্নয়নের পথ কখনই মসৃণ নয়। সব প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

গত রবিবার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা প্রফেসর ড. গওহর রিজভী বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি এটা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। তবে চুক্তির ধারা বাস্তবায়নের সংখ্যা হিসাব না করে বস্তুনিষ্ঠভাবে চুক্তিটি বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সেটাই মূল বিষয়। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচী ভিত্তিক রোডম্যাপ ঘোষণার কোন বিকল্প নেই। এ নিয়ে আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করব।

দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনও অবাস্তবায়িত- জনসংহতি সমিতি ॥ তবে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পার্বত্য জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দ। তারা অভিযোগ করেন, সময়সূচী ভিত্তিক পরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণার মধ্য দিয়ে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে বর্তমান সরকারের কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আদিবাসী ফোরামের সভাপতি সন্তু লারমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুবিধ প্রশাসন ও কর্তৃত্ব চলছে যেটাকে এক কথায় অরাজকতা বলা যেতে পারে। সেখানে কোন শৃঙ্খলা নেই। সেখানকার কোন মানুষের নিরাপত্তা নেই। আমি নিজেই নিরাপদ নই। পার্বত্য চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো কিছুটা বাস্তবায়িত হলে হয়তো আমরা কিছুটা শান্তিতে থাকতাম। কিন্তু কবে এমন পরিস্থিতি আসবে তা জানি না।

জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি ধারা ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সরকার দাবি করলেও সত্যিকার অর্থে চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনও অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। চুক্তির অবাস্তবায়িত মৌলিক বিষয়সমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এ জন্য আইনী ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা; পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আওতাধীন বিষয় ও কার্যাবলী হস্তান্তর ও কার্যকরকরণ এবং এসব পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিতকরণ; এক্ষেত্রে নির্বাচন বিধিমালা ও ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়ন করা; ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা; তজ্জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন করা; সেনা শাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’সহ সব অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা; পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক প্রণীত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চরিক পরিষদ আইন ১৯৯৮ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ (১৯৯৮ সালে সংশোধিত) ইত্যাদি আইনগুলোকে কার্যকর আইন হিসেবে সংবিধানের প্রথম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা; সেটেলার বাঙালীদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনকভাবে পুনর্বাসন ইত্যাদি।

চাকমা সার্কেল চীফ রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী মানুষের প্রতি হিংসামূলক বা বৈষম্যমূলক আচরণ বজায় আছে। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যত কোন কাজ করছে না চুক্তি অনুযায়ী যে টাস্কফোর্স হয়েছে তাতে ভারত প্রত্যাগতদের কিছুটা পুনর্বাসন করা হলেও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কোন উদ্যোগই হয়নি। তাদের একটু পরিমাণ জলও দেয়া হয়নি। তিনিও পার্বত্য চুক্তির মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করার দাবি জানান এবং পাহাড়ের অনাকাক্সিক্ষত যে কোন ঘটনা এড়ানোর জন্য মিশ্র পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার আহ্বান জানান।