২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পৌর নির্বাচনের সুযোগে নাশকতার শঙ্কা

  • শুরু হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান

শংকর কুমার দে ॥ চলতি ডিসেম্বরের ২৩৬ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠান উপলক্ষে শুরু হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান। যেসব পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেই সব পৌরসভায় ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, তালিকাভুক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তদের গ্রেফতার ও জঙ্গীবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। আগামী ৩০ ডিসেম্বরে ২৩৬টি পৌরসভা নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ অভিযান পরিচালনা করবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নির্বাচন উপলক্ষে সহিংস সন্ত্রাস, নাশকতা ও নৈরাজ্য চালানোর আশঙ্কা করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। এজন্য বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন ও অভিযান পরিচালনা করা হবে। নির্বাচন কমিশন থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), বিজিবি, র‌্যাব, আনসারে মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

সূত্র জানান, ২০১৩ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন সম্পর্কিত একটি রুলের রায়ে এ সংগঠনের নিবন্ধন অবৈধ এবং একে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করে। এ কারণে নির্বাচন কমিশন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীকে পৌরসভা নির্র্বাচনে প্রার্থী দিতে বা নির্বাচনে অংশ নিতে দিতে পারছে না। এ দলটি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিশ দলীয় জোটে থাকায় বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচার, ভোট প্রদান, অংশ নেয়ার সুযোগ নিয়ে নাশকতা ও নৈরাজ্য চালাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। জামায়াতে ইসলামী দলের যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করার ঘটনায় বর্তমান সরকারের ওপর দারুণ ক্ষুব্ধ থাকার কারণে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা প্রকাশ্যে তৎপরতা চালানোর সুযোগ নিয়ে নাশকতা ও নৈরাজ্য চালাতে পারে।

সূত্র জানান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর, নতুন সরকার জামায়াতকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং জামায়েতের নেতারা পাকিস্তানে নির্বাসনে চলে যান। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে প্রথম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যাকা-ের পর এবং কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর ১৯৭৭ সালে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৭৯ সালের মে মাসে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা আব্বাস আলী খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ করে দেয় তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে। জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমসহ বিএনপি-জামায়াতের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে ফাঁসির রায় প্রদান করার পর তাদের ৫ জনের মৃত্যুদ-াদেশ কার্যকর করা হয়। যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও রায়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক সহিংস সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালানোর ঘটনা এবং এখন আবার পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণার প্রতিশোধ নেয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা।

সূত্র জানান, বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিশ দলীয় জোট গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও এবারের পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে বিএনপিসহ তাদের জোট নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টিতে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে গোয়েন্দা সংস্থা।

বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রতিহত করার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোট দেশব্যাপী সহিংস সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালিয়েছে। বিএনপির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পৌরসভায় অংশগ্রহণ এবং জামায়াত-শিবিরের সহযোগিতা কামনা করে মাঠে নামার বিষয়টিকে সন্দেহজনক ও রহস্যজনক মনে করছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ইতোমধ্যেই মাঠে পৌরসভা নির্বাচনী মাঠে নেমে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকায় সহিংস সন্ত্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে পেশাদার সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত, চাঁদাবাজ, মাস্তান, রাজনৈতিক দলের ক্যাডার, জঙ্গীগোষ্ঠী প্রকাশ্যে তৎপরতা চালানোর মাধ্যমে সহিংস সন্ত্রাস চালাতে পারে। পৌরসভা নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানের জন্য ভাড়ায় এসব সন্ত্রাসীদের নিয়োগ দেয়ার আশঙ্কা করছে গোয়েন্দা সংস্থা।

সূত্র জানান, আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২৩৬টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে একযোগে। এজন্য গত ২৪ নবেম্বর এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। তফসিল অনুযায়ী, মনোয়নপত্র দাখিলে শেষ দিন ৩ ডিসেম্বর, যাচাই-বাছাই ৫ ও ৬ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৩ ডিসেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর পরই সহিংস সন্ত্রাসের ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে বেশি। এজন্য নির্বাচন কমিশন থেকে পৌরসভা নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বেআইনী অস্ত্র উদ্ধার, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, মাস্তান ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), বিজিবি, র‌্যাব, আনসারে মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাবর পাঠানো চিঠিতে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ করেছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের দেয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয় যে, পৌরসভার ভোটকেন্দ্র এবং ভোটকক্ষের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাসহ সকল বেআইনী অস্ত্র উদ্ধার পরিচালনা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রণয়ন করে চাঁদাবাজ, মাস্তান ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে ব্যবস্থা করতে হবে। চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাদের সমর্থকরা যাতে নির্বাচনী আচরণ মেনে চলেন এবং কোন তিক্ত, উস্কানিমূলক ও ধর্মানুভূতিতে আঘাত করে, এমন কার্যকলাপ বা বক্তব্য প্রদান হতে বিরত থাকেন সেই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পেশীশক্তি অথবা স্থানীয় ক্ষমতা দ্বারা কেউ নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে না পারেন এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সুসম্পর্ক বজায় রাখায় হয় তার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল মহলের সহযোগিতা কামনা করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। এছাড়াও সকল স্তরের ভোটারদের নির্ভয়ে ও নির্বিঘেœ ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করন, সকল শ্রেণীর ভোটার, বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোটাররা যেন নির্ভয়ে ও নির্বিঘেœ ভোটদান করতে পারেন সে ব্যবস্থা করার জন্য চিঠিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে। পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন উপলক্ষে জামায়াত-শিবির, জঙ্গীগোষ্ঠী, পেশাদার সন্ত্রাসী, অপরাধী, দুর্বৃত্ত, মাস্তান, চাঁদাবাজরা রাজনৈতিক দলের ব্যানারে এসে প্রকাশ্যে আসার সুযোগ নিয়ে সহিংস সন্ত্রাস চালাতে পারে।