২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানুষ মানুষের জন্য

নারগিস পারভীন সোমা

জীবন সংগ্রামে নিরন্তর চেষ্টা। ক্লান্ত, শ্রান্ত ও বিষণœœ মুখ। কোন আনন্দ ওদের টানে না। অথচ ওরাও মানুষ। এদের বেশিরভাগের আশ্রয় হয়ে ওঠে সড়কের পাশের খুপরিতে, পার্ক, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস, মাঠের কোনায়, রেল স্টেশন আর বাসস্ট্যান্ডে। ভাসমান মানুষের কথা বলছি। ক্রমেই বাড়ছে এসব সর্বহারা মানুষের সংখ্যা। নিঃস্ব এসব মানুষকেই আমরা বলে থাকি ভাসমান বা ছিন্নমূল। অথচ মানুষ হিসেবে তাদের আছে সব ধরনের অধিকার।

রোদ, ঝড়, বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে এরা পার করে দিন-রাত। গ্রামে মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকা কিংবা বিভিন্ন কারণে বিতাড়িত হয়ে এসব মানুষ আশ্রয় খোঁজে শহরে। কেউ খোঁজে সামান্য কাজ। কেউ ভিক্ষাসহ বিভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করে। দিনের আলো মিলিয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেই নেমে আসে নিস্তব্ধতা। ঝলমল নগরীতে কমে যায় কোলাহল। ব্যস্ততা ঘুমিয়ে পড়ে আর ওরা ফুটপাথে জেগে থাকে। বেদনার ভারে কোন আনন্দ ওদের ছুঁতে পারে না।

জীবনের কঠিন যুদ্ধে ওরা অসহায়। দেশে এসব মানুষের সংখ্যা নেহাতই কম নয়। নিয়তিই করেছে তাদের যেন অধিকার বঞ্চিত। গ্রীষ্ম বর্ষা ওরা কোন রকমে পাড়ি দিলেও শীত আসে তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে। একটুকরো কাপড়, কখনও কখনও চট গায়ে খবরের কাগজের ওপর শুয়ে কাটাতে হয় রাত। অথচ তাদের এমন হওয়ার কথা ছিল না।

এক সময় সব থাকা এসব মানুষের জীবনের গতিধারা পাল্টে দেয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নদীর ভাঙন। নদীর স্রোতের মতো মিলে যায় ওদের জীবনের সব। হয়ে যায় নিঃস্ব। সব হারিয়ে ওরা হয় ভাসমান। গৃহ হারিয়ে হয়ে যায় ছিন্নমূল। স্থায়ীভাবে কোন জায়গা হয় না তাদের। একটা ঘরের আশায় তারা প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়ায়। এ ছোটার যেন শেষ নেই।

ভাসমান ভেলার উপর যেমন সারাটি জীবন পার করে দেয়া যায় না, তেমনি ভাসমান মানুষদের নিয়ে সুস্থ সমাজ কাঠামো তৈরি করা যায় না। একটি সুন্দর সমাজ কল্পনা করতে গেলে আগে দরকার এসব ভাসমান মানুষের বাসস্থান। একটি পরিবার যখন নদীর গ্রাসে তার ঘরটি হারায় তখন সে শুধু তার ঘরটিকেই হারায় না, হারায় তার স্বপ্নগুলো। সন্তানদের ভবিষ্যত হারিয়ে যায় অন্ধকারে। হয়ে পড়ে সম্বলহীন। তখন বড় হয়ে দাঁড়ায় সমাজের কোন এক কোনায় টিকে থাকার লড়াই।

দায়বদ্ধতা থেকে আমরা যদি হাত বাড়িয়ে দিই, আমরা প্রত্যেকে দু’জন মানুষকে যদি সাথে নিই, তারা আরও দুজন হবে, তাহলে তৈরি হবে একটি বৃত্ত যার ভিতরে থাকবে সবাই একে অপরের পরিপূরক হয়ে। তাদের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে শিক্ষার, খাদ্যের, চিকিৎসার। তাদের ভিতরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব আমাদের এ সমাজেরই। এসব ছিন্নমূল মানুষের ভেতরে জাগিয়ে তুলবে হবে সমাজ সচেতনতার বোধ। দেশের সর্বস্তরের মানুষের সমন্বয়েই আমরা অর্জন করতে পেরেছি আমাদের স্বাধীনতা। দেশে যারা বিত্তবান তারা যদি প্রত্যেকে এ ছিন্নমূল ভাসমান মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ায় তবে তারাও হয়ে উঠতে পারে আমাদেরই অংশ। এখন শীতের মৌসুম। তাদের কষ্টের সীমাহারা বেদনায় দরকার পাশে দাঁড়ানো। আসুন, ওদের মানুষ হিসেবে গণ্য করেই পাশে দাঁড়াই।

রাজশাহী চারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে

নির্বাচিত সংবাদ