২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জেলা বাজেটের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না

  • স্থানীয় জনগণের চাহিদা থাকছে উপেক্ষিত

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ অধরাই থেকে যাচ্ছে জেলা বাজেটের স্বপ্ন। তৃণমূল মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলনে জেলা বাজেট কার্যকর করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। পরপর দুটি অর্থবছরে পরীক্ষামূলকভাবে সাতটি জেলার জন্য এ বাজেট ঘোষণা করা হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি আলোর মুখ দেখেনি। এ বাস্তবতায় জেলা বাজেট থাকবে কি থাকবে না এ নিয়ে যখন বিতর্ক চলছিল তখন এটি কার্যকর করতে চলতি অর্থবছরের (২০১৫-১৬) বাজেটে প্রত্যেক জেলার জন্য শুধু থোক বরাদ্দ দেয়া হয়। কাঠামো সংস্কারের বিষয়ে গাইড তৈরির কথা বলা হলেও এখনও সেটি হয়নি। আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে জেলা বাজেট হবে কিনা তা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। এ পরিপ্রেক্ষিতে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে জনমতামতের ভিত্তিতে প্রণীত জেলা বাজেটের মাধ্যমে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের প্রকৃত ক্ষমতায়নের দাবি জানিয়েছে এ বিষয়ে কাজ করে আসা বেসরকারী সংস্থা সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্র।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য হচ্ছে, এর আগে যেভাবে জেলা বাজেট দেয়া হয়েছে, তা মূলত, ওই জেলার ব্যয়ের একটা খতিয়ানই বলা চলে। কারণ ওই বাজেটে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। যেমনটি আমাদের জাতীয় বাজেটে হয়ে থাকে। তাছাড়া জেলা বাজেট নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের সঙ্গে আলোচনা হতেও দেখা যায় না। এজন্য এটাকে বায়বীয় বলেই মনে হয়। তবে জেলা বাজেট ঘোষণার আগে জেলা পরিষদকে কার্যকর করা প্রয়োজন।

সূত্র জানায়, গত ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের বাজেট পেশ করার সময় টাঙ্গাইল জেলার জন্য প্রথম পরীক্ষামূলক বাজেটের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। পরীক্ষামূলক ওই বাজেটে টাঙ্গাইল জেলার জন্য মোট ১ হাজার ৬৭৩ কোটি ৪৫ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে অনুন্নয়ন ব্যয় দেখানো হয় ১ হাজার ১১৮ কোটি ৫৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় দেখানো হয় ৫৫৪ কোটি ৯০ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে টাঙ্গাইলসহ আরও ছয়টি জেলার জন্য জেলা বাজেটের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। এগুলো হচ্ছে- চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও সিলেট জেলা। এগুলো বিভাগীয় সদর জেলা। কিন্তু চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কোন জেলা বাজেট রাখা হয়নি। তার পরিবর্তে স্থানীয় সরকারকে পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়ার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় একটি থোক বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এ বরাদ্দ কিভাবে ব্যবহার করা হবে সে বিষয়ে গাইডলাইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। অন্যদিকে, একটি জেলা এক বছরে কোন কোন উৎস থেকে কত টাকা আয় করবে এবং কোন কোন খাতে তা ব্যয় করবে, তার একটি চিত্র থাকে জেলা বাজেটে। কোন জেলা প্রয়োজনের তুলনায় অর্থ ঘাটতিতে থাকলে কেন্দ্রীয় সরকার ওই জেলাকে কত টাকা দেবে, তারও হিসাব থাকে। তবে এর আগের জেলাগুলোর ক্ষেত্রে এসব কিছু নেই। অর্থাৎ পুরো অর্থই বরাদ্দ হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। ফলে ওই জেলা বাজেটগুলো কার্যকর হয়নি।

বেসরকারী সংস্থা সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) এ প্রসঙ্গে মনে করে, বাজেট কাঠামোতে প্রক্রিয়াগত সংস্কারের মাধ্যমে জেলা বাজেট প্রণয়ন হওয়া উচিত। কাঠামোগত সংস্কার ছাড়াই প্রণীত নতুন জেলা বাজেটে শুধু একটি জেলার ব্যয়ের খতিয়ান পাওয়া যায়। তৃণমূল মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন তাতে দেখা যায় না। জাতীয় বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্যই অংশগ্রহণমূলক জেলা বাজেট প্রণয়ন করা দরকার বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারী এ সংস্থাটি। সংগঠনটি বেশ কয়েক বছর ধরেই জেলা বাজেট প্রণয়নের জন্য নানা পর্যায়ে আলোচনা ও দাবি জানিয়ে আসছে। সংস্থাটি বলেছে, সব পর্যায়ের জন্য অংশগ্রহণ ও জন-চাহিদার বিষয়টি নিশ্চিত করেই এ বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। এ বিষয়ে সুপ্র’র সুপারিশগুলো হচ্ছে, জেলা বাজেট আইন নামে সমগ্র রুপরেখা উল্লেখ করে আইন প্রণয়ন করা। মনোনীত প্রশাসক নয়, জনগণের সরাসরি ভোটে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যাণ নির্বাচিত করতে হবে ও জেলা পরিষদ কার্যকর ও তাদের মাধ্যমে জেলা বাজেট প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির নেতৃত্বে সকল রাজনৈতিক এবং নাগরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে জেলা, উপজেলা, পৌর/ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বাজেট কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

তৃণমূল মানুষের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে চাহিদাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। বাজেট চক্রের সকল ক্ষেত্রে বাজেট কমিটি মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। জেলা বাজেটের সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। প্রতিটি জেলা তার উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারকে প্রদান করবে, ঘাটতির ক্ষেত্রে সরকার ঘাটতি পূরণে বরাদ্দ প্রদান করবে।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, আঞ্চলিক সমতা নিশ্চিত করতে জেলা বাজেট সহায়ক হবে বলে তার বিশ্বাস। আর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে নতুন মাত্রা পাবে এ জেলা বাজেট। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আমি সেদিনের স্বপ্ন দেখি, যখন জাতীয় বাজেট শুধু কেন্দ্রীয়ভাবেই প্রণীত বাজেটই-ই হবে না বরং এটি হবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চাহিদার প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিফলন। তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় সরকারকে দুর্বল রেখে জেলা বাজেটের বাস্তবায়ন অসম্ভব। এজন্য সর্বাগ্রে জেলাগুলোতে নির্বাচিত জেলা প্রশাসকের প্রয়োজন।

জানা গেছে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় তিন স্তর, তথা জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব বাজেট খুবই কম। এগুলোর আয়ের উৎস সীমিত। তাছাড়া চলতি অর্থবছরের জেলা বাজেট প্রকাশনায় এর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলা হয়েছে, প্রকৃত অর্থে জেলা বাজেট বলতে যা বোঝায়, তা প্রণয়ন করতে বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার দরকার।