২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকিস্তান একাত্তরে হেরেছিল সশস্ত্র যুদ্ধে, এবার হারল নৈতিক যুদ্ধে

নাজনীন আখতার ॥ একাত্তরে সশস্ত্র যুদ্ধে পরাজয়ের পর এবার বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তান নৈতিকভাবে পরাজিত হলো যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বিচার করা হলেও প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নিলর্জ্জ ও মরিয়া অবস্থান অনেক হিসাব-নিকাশকেই সামনে নিয়ে আসছে। একাত্তরের প্রতিশোধ নিতে বাংলাদেশের ভেতরে অবস্থান করে দেশের বিরুদ্ধপক্ষ তৈরির নীল নক্সা বাস্তবায়ন তুমুলভাবে বাধাগ্রস্ত হওয়াতেই কী পাকিস্তান হঠাৎ এতো মরিয়া-এ প্রশ্ন উঠে আসছে বিভিন্ন মহলে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করে রাখতে পাকিস্তান তাদের সহযোগীদের মদদ দিয়েছে এতোদিন এটা এখন অনেকটাই স্পষ্ট। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ‘মাস্টার মাইন্ড’দের বিচার হওয়াতে তাই অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে উঠছে পাকিস্তান। তাদের রাজনীতিকদের বিভিন্ন মন্তব্যে মনে হচ্ছে না বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম কোন রাষ্ট্র। মনে হচ্ছে যেন বা তাদেরই কোন প্রদেশ। পার্লামেন্টে বা মাঠে ময়দানে শুধু মন্তব্য করে থেমে নেই, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে চালাচ্ছে নেতিবাচক প্রচার। এ অবস্থায় পাকিস্তানকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কড়া সতর্ক বার্তা দিয়েছেন মৌখিকভাবে। কূটনৈতিকভাবেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া জবাব দেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাত্তরে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুট, বাড়ি-ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার মতো ঘটনায় যে মাস্টার মাইন্ডরা অভিযুক্ত তার পক্ষে হাজার হাজার তথ্যচিত্র প্রমাণ রয়েছে। ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য আর্ন্তজাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর বছরের পর বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাক্ষ্য প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপরও অনেকটা গায়ের জোরেই এ বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলে আসছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক লবিস্ট নিয়োগও করা হয়েছে। খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কিছুদিন পরপর এ বিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিচার কার্যকরের পরই ওই সব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিরোধী দলের নেতা ও ইসলামী চিন্তাবিদ বলে পরিচয় দেয়া হয়। অথচ এ ধরনের রাষ্ট্রদ্রোহী নিজ দেশে গণহত্যা চালানো অপরাধীদের নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত কেন দল গঠন করেছে সে প্রশ্নটা উঠে আসে না সেইসব প্রতিবেদনে। সময়ে সময়ে সেসব প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। তবে গত ২১ নবেম্বর কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তান কূটনৈতিক শিষ্টাচার পুরোপুরি লঙ্ঘন করেছে। ওই দুই অভিযুক্ত ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক নয়। তারা বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশে সংঘঠিত অপরাধে তাদের বিচার হয়েছে। তবে কেন পাকিস্তান তাদের বিচারে এতোটাই ক্ষুব্ধ হলো যে সেদেশে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করতে হলো? একটি স্বাধীন দেশের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তারা কী প্রশ্ন তুলতে পারে? এমন কী তাদের ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলিতে একজন এমএনএ শেখ আফতাব আহমেদ এ রায়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে বিচার দেয়ার দাবি তুলেছেন। এর স্বপক্ষে তাদের যুক্তি কী? এসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে কূটনৈতিক মহলে।

এছাড়া ১৯৭৪ সালের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়েছিল তার মূল লক্ষ্য ছিল বন্দী সেনা ও আটকে পড়া জনসাধারণকে ফিরিয়ে নেয়া। এর ব্যাখ্যা দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অবস্থান নেয়ার ভিত্তি নেই। এ চুক্তি এতোটাই স্বচ্ছ যে এটাকে অজুহাত দেখানোরও কোন সুযোগ নেই পাকিস্তানের। শান্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু যে কন্ডিশনাল ক্লেমেন্সির কথা বলেছিলেন তা কোন অবস্থাতেই এ্যামনেস্টির সমার্থক নয়। পাকিস্তান মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে যেসব অফিসারদের বিচার করবে বলে অঙ্গীকার করেছিল তা পালন না করায় জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর বেশ বিরক্তই ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

একই মত প্রকাশ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, পাকিস্তান ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে। এখন পাকিস্তান ১৯৭১ সালের বাস্তবতা অস্বীকার করছে। অথচ পাকিস্তানী সামরিক কর্মকর্তাদের লেখা বইপত্রে এবং হামিদুজ্জামান কমিশনের রিপোর্টে বাংলাদেশে সংঘটিত পাকিস্তানের গণহত্যার স্বীকৃতি আছে। তিনি বলেন, পাকিস্তান একাত্তরের বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারে না। যা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় তাতেও হস্তক্ষেপ করতে পারে না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া এবং এদেশের মানুষের অনুভূতির সম্মানকে নিশ্চিত করা।

ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই চুক্তিতে যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়নি। বরং ১৯৭১-এ সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১৯৫ জনের বেশি পাকিস্তানী সামরিক অফিসার এবং অন্য সদস্যদের বিচার করার অঙ্গীকার করেছিল পাকিস্তান। অথচ তারা তাদের অঙ্গীকার রাখেনি।

স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে পাকিস্তানের বিচার হওয়া উচিত উল্লেখ করে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির আহবায়ক ডাঃ এমএ হাসান বলেছেন, লাখো প্রাণের মর্যাদা, অগণিত আত্মার দীপাবলি এবং সামগ্রিক শান্তিকে যে পৈশাচিক দানব নিষ্পেষিত করেছিল ১৯৭১-এ, সেই অপশক্তি ঘটনার ৪৪ বছর পর আবার তাদের দানবতুল্য মুখচ্ছবি প্রদর্শন করছে। এ দানবটি আর কেউ নয়, এ চিরচেনা পাকিস্তান, তাদের অনুচর ও দোসর। এরাই আজ তাদের পোষ্য অনুচর তথা ঘাতককুলের বিচারে মর্মাহত হয়ে আমাদের দেশের মর্যাদার ওপর আঘাত হানছে। সীমাহীন স্পর্ধায় সব শিষ্টাচার তথা নানা ‘ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন’ সমর্থিত আন্তর্জাতিক আইন ও বাধ্যবাধকতা অমান্য করে একটি স্বাধীন দেশের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে ওই পাকিস্তান ও তাদের সমর্থকরা। এটি নিজেই একটি বিচারযোগ্য অপরাধ। মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা গণহত্যার বিচার যা কিনা প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যবাধকতা এবং ‘অবলিগেশন’, সে কাজটি নিজে না করে এমন কাজে বাধা দিয়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক কনভেনশনকেই চ্যালেঞ্জ করছে। এই দুটি কারণে পাকিস্তানের বিচার হতে পারে হেগের আরবিটারি আদালতে এবং আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে। আমাদের রাষ্ট্র কি পারে না এমন উদ্যোগটি নিতে!

উল্লেখ্য, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর পরই পাকিস্তান গত ২২ নবেম্বর প্রতিক্রিয়া জানায়। একদিন পর ২৩ নবেম্বর বাংলাদেশ ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তানকে হস্তক্ষেপ না করতে সতর্ক করে। এরপরও পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মৌসুমী রহমানকে গত সোমবার তলব করে পাকিস্তান সরকার। তাকে তলব করে একাত্তরে পাকিস্তান গণহত্যার বিষয়ে অস্বীকার করে এবং এভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে। কড়া প্রতিবাদ জানানোর পরও ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব এবং ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিকৃত উপস্থাপনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম বলেছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন মন্তব্য করার নৈতিক অধিকার পাকিস্তানের নেই। এছাড়া ১৯৭১ সালে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের কোন দায় নেই এটাও পুরোপরি অসত্য। এ বিষয়ে কূটনৈতিক পরিসরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সোহরাব হোসেইন এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন। মঙ্গলবার তার সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বৈঠক হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।