২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ধ্রুপদী সঙ্গীতের মায়াডোর

রাত যত গভীর হয় সুর বোধকরি তত বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ সুরের রস আস্বাদন করতে হলে যে বাইরের জগত থেকে নিজেকে আলাদা করা প্রয়োজন। বেশিরভাগ শ্রোতাই দল বেঁধে চলে এসেছেন প্রতিদিন বিকেল থেকেই। উৎসবে তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এবারের উৎসবের নতুন সংযোজন সরস্বতী বীণা। শনিবার রাতে এটি পরিবেশন করেন জয়ন্তী কুমারেশ। তিনি এই সময়ের একজন খ্যাতনামা বীণা শিল্পী। চেন্নাই মিউজিক একাডেমির ৫ বারের সেরা বীণা শিল্পীর পুরস্কার জিতেছেন তিনি। এই দিন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের শিল্পীরা খেয়াল পরিবেশন করেন। এছাড়াও প-িত উদয় ভাওয়ালকার পরিবেশন করেন ধ্রুপদ। এবারের উৎসবের আরেক আকর্ষণ ছিলেন প-িত অজয় চক্রবর্তী। খেয়াল পরিবেশনে যিনি অদ্বিতীয়। এইবার নিয়ে তাঁর টানা চারবার উৎসবে অংশ নেয়া। উৎসবের দ্বিতীয় দিন তাঁর খেয়ালের মোহজালে শেষ হয় দ্বিতীয় দিনের উৎসব। তবে এবারের উৎসব নানা কারণেই বিশেষ। উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছে শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরীকে। যিনি গতবার উৎসবের মঞ্চে নিজের বক্তব্য বলার সময় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবারের উৎসবে সন্তুর বাজিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করেছেন ওস্তাদ রাহুল শর্মা, জয়াপ্রদা রামমূর্তি, প-িত কুশল দাস এবং কৌশিকী চক্রবর্তীসহ উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক ঝাঁক শিল্পী। এবারের উৎসবে তবলা বাজিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন ওস্তাদ জাকির হোসেন। তিনি একক তবলাবাদন পরিবেশন করেন। প্রথমবারের মতো এই উৎসবে এসেছিলেন খ্যাতিমান কর্নাটকী কণ্ঠশিল্পী পদ্মবিভূষণ ড. বালমুরালী কৃষ। তবে শুধু সঙ্গীতই নয়, ছিল নৃত্যের নয়নাভিরাম আয়োজন। উৎসবে কুচপুড়ি নৃত্য পরিবেশন করেছেন নৃত্যশিল্পী দম্পতি রাজা ও রাধা রেড্ডি। দেশের ভেতরের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগ এর প্রযোজনা মুগ্ধ করে শ্রোতাদের।

এই উৎসবে সবচেয়ে বেশি শ্রোতা সমাগম লক্ষ্য করা গেছে ছুটির দিনগুলোতে। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে মানুষ দলে দলে ছুটেছে সুরের রস আস্বাদন করতে। উৎসবের দ্বিতীয় দিন প্রথমেই ধ্রুপদ পরিবেশন করেন বেঙ্গল পরম্পরা সঙ্গীতালয়ের অভিজিৎ কু-ু। ‘রাগ ভূপালি’ দিয়ে শুরু করেন। একই সঙ্গীতালয়ের শিক্ষার্থী সুস্মিতা দেবনাথের খেয়াল ও শ্রোতাদের আনন্দ দিয়েছে। এরপর প-িত রনু মজুমদার বাঁশির সুরে সবাইকে মুগ্ধ করেন। তিনি মূলত মাইহার ঘরানার একজন শিল্পী। ৫ হাজার ৩৭৮ জন বংশী বাদকের সঙ্গে ‘আর্ট অব লিভিং’-এর ‘বেণুনাদ’ বাজিয়ে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড এ রেকর্ড করেছিলেন তিনি।

বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উৎসবের তৃতীয় দিনে রবিবার রাতের সূচনা হয়েছিল নৃত্যের ছন্দে। নৃত্যশিল্পী ওয়ার্দা রিহাব ও তার দল মণিপুরী নৃত্যের মুদ্রায় চোখ ধাঁধিয়ে দেন দর্শকদের। তারা কত্থক, বসন্ত, চাবা, জয় জয় দেবা পরিবেশন করেন। নূপুরের তালে তালে উঠে এসেছে রাধা কৃষ্ণের কথা। পারফর্ম করেছেন বদরুল আলম চৌধুরী, দিল আফরোজ জাহান, ফুলেশ্বরী পারমিতা, রাকা পাল, রুবাইয়াত সাইয়াদা প্রমুখ। এরপর শুরু হয় ধ্রুপদ ঘরানার বিখ্যাত শিল্পী ওয়াসিফ ডাগরের পরিবেশনা। মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম সরোদ বাদক ইউসুফ খান। তার সরোদের ঐকতানে সম্মোহিত ছিলেন শ্রোতারা। বাবা ওস্তাদ ফুলঝুরি খানের কাছে শিষ্যত্ব নেয়া ইউসুফ খান দেখিয়ে দিয়েছেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বাংলাদেশের শিল্পীরাও কম যান না। এদিন আরও ছিল ‘সিংগিং ভায়োলিন’ হিসেবে স্বীকৃত ভারতের বিখ্যাত শিল্পী ড. এস রাজমের অনবদ্য বেহালা বাদন। একই রাতে মঞ্চে আসেন বিদূষী শ্রুতি সাদোলিকর। খেয়াল পরিবেশন করেন তিনি। একের পর এক আসতে থাকে ঠুমরি, টপ্পা, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নানা ধারা। তৃতীয় রাতে আরেক আকর্ষণ ছিলেন গুরু কড়াইকুড়ি মানি। তিনি মৃদঙ্গ পরিবেশন করেন। তাঁর মৃদঙ্গ বাদন উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি করে। শেষ রাতের দিকে মঞ্চে আসেন বিদূষী শুভা মুডগাল। ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কার জয়ী এই শিল্পী তাঁর স্বভাবসুলভ পরিবেশনা দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখেন অনেকক্ষণ।

সোমবার রাতে উৎসব শুরু হয় প্রয়াত চিত্রশিল্পী কাইয়ূম চৌধুরীর স্মরণে আট মিনিটের ‘নিসর্গের আঁকিয়ে’ শীর্ষক তথ্যচিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ওস্তাদ জাকির হোসেন। শ্রোতারা যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়ই ছিলেন তাঁর তবলার ঝড় শোনার জন্য। ঘণ্টাখানেকের মতো সময় তন্ময় হয়ে শোনে এই গ্রেট তবলাবাদকের তবলা বাদন। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকে তিনি তবলা বাজানো শুরু করেন। তিনিই একমাত্র তালবাদ্য শিল্পী যিনি সবচেয়ে কম বয়সে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মাননায় ভূষিত হন। ‘গ্লোবাল ড্রাম প্রজেক্ট’-এর জন্য তিনি গ্রামি এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। প-িত শিবকুমার শর্মা যখন মঞ্চে এসে সন্তুর বাজানো শুরু করেন সেই সময়টার জন্যই যেন প্রতীক্ষা করছিলেন শ্রোতারা। ‘পদ্মশ্রী’ এবং পদ্মবিভূষণ’ সম্মাননায় ভূষিত এই শিল্পী মুগ্ধ করেছেন উপস্থিত সবাইকে। এরপর একে একে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন প-িত উলহাস কশলকর। তিনি খেয়াল পরিবেশন করেন।

উৎসবের সমাপনী দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটায়। অনিমেষ বিজয় চৌধুরীর পরিচালনায় সিলেটের শিল্পীদের নিয়ে পরিবেশিত হয় ধামার। এইদিন ভরতনাট্যম পরিবেশন করেন বিদূষী আলারমেল ভালি। বেলায়েত খার পুত্র ওস্তাদ সুজাত খান পরিবেশন করেন সেতার। তবে সবশেষ প্রযোজনা হিসেবে মঞ্চে আসে প-িত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাঁশি বাদন। শেষ রাতে তাঁর বাঁশি যেন ইন্দ্রজাল তৈরি করে শ্রোতাদের মধ্যে। আগামী বছরের উৎসবে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আয়োজকরা শেষ করেন এই সুরের মূর্ছনা। বিদায় হে সুরের উৎসব।