২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

দূর করুন মনের ময়লা

প্রতিবেশী ভারতে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সে দেশের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর বক্তব্যটি সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। মঙ্গলবার আহমেদাবাদের সবরমতি আশ্রমে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে আসলে নোংরা রাস্তায় নেই, রয়েছে আমাদের মনে।’ ওয়াকিবহাল ও পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, বর্তমানে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’ বা পথঘাট পরিষ্কার রাখার লোক দেখানো অনুষ্ঠান শুরু করেছেন, রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায় তার প্রতি তীক্ষè খোঁচা রয়েছে।

এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক, উত্তর প্রদেশে মাসদুয়েক আগে গো-মাংস খাওয়ানোর মিথ্যা অভিযোগে এক মুসলিমকে পিটিয়ে হত্যার পর থেকে সমগ্র ভারত কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিজেপি, আরএসএস, হিন্দু মহাসভাসহ কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলো ক্রমাগত ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও বিদ্বেষ ছড়াতে থাকে। যার প্রতিবাদে বহু নামী-দামী ঐতিহাসিক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী তাদের রাষ্ট্রীয় সনদ ও সম্মাননা ফিরিয়ে দেন। ভারতে সংসদে এই মুহূর্তে যে শীতকালীন অধিবেশন চলছে, সেখানেও অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে শাসক জোট ও বিরোধীদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলবার সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় জাত ধর্মের উর্ধে উঠে সংবিধানের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের কথা শোনালেও নিম্নকক্ষ লোকসভায় সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি দোষারোপ চলছে। একপর্যায়ে বিজেপির ‘একদর্শী নীতি ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির’ বিরোধিতা করে ওয়াক আউট করে বিরোধীরা। অনেকটা এই প্রেক্ষাপটেই ভারতের রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘প্রতিদিন চোখের সামনে অভূতপূর্ব হিংসা ঘটতে দেখছি। আর এই হিংসার মূলে আছে অন্ধকার, ভয় আর অবিশ্বাস। এই ক্রমবর্ধমান হিংসার মোকাবেলা করতে আমাদের নতুন নতুন পথ যেমন বের করতে হবে, তেমনি অহিংসা, সংলাপ ও যুক্তির ক্ষমতাকে ভুলে গেলে চলবে না। উল্লেখ্য, এর আগেও রাষ্ট্রপতি একাধিকবার ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।

ভুলে গেলে চলবে না, ভারত গৌতম বুদ্ধ, সম্রাট অশোক, সম্রাট আকবর, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের দেশ। এই দেশের রয়েছে হাজার হাজার বছরের সুমহান ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য-ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি। বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্ট, জৈন, পারসিক, শিখ ইত্যাদি সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষের আত্মত্যাগ ও অবদানের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে ভারত তথা এই উপমহাদেশ। মূলত এই বিশাল সমৃদ্ধ ভূখ-ের মূলমন্ত্র হলো- শক, হুন দল পাঠান-মোগলের ‘মেলাবে- মিলিবের’ সংস্কৃতি। হিংসা নয়, অহিংসা, বিদ্বেষ নয়, ভালবাসা, বিভেদ নয়, ঐক্য, সর্বোপরি যুদ্ধ নয়, শান্তির বাণী উপমহাদেশের জ্ঞানী-গুণী, মুণি-ঋষি ও সুফী সাধকরা যুগে যুগে ছড়িয়ে গেছেন বিশ্বব্যাপী। ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বস্তুতপক্ষে সেই চিরন্তন মর্মবাণীরই অনুরণন করেছেন তার বক্তব্যে।

বিশ্বের ১২০ কোটি ক্যাথলিক খ্রীস্টানের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস প্রথমবারের মতো আফ্রিকার তিনটি দেশ সফরে গিয়ে এক বক্তব্যে বলেন, ‘সব ধর্মের ক্ষেত্রে মৌলবাদ হচ্ছে ব্যাধি। এটি কোন ধর্ম নয়।’ মানুষে মানুষে সাম্য ও মৈত্রী, সৌভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি সর্বোপরি হিংসা-বিদ্বেষের পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে হলে যে কোন মূল্যে রুখতে হবে মৌলবাদ।

নির্বাচিত সংবাদ