২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশে গণহত্যা ॥ সরকার অস্বীকার করলেও পাকিস্তানীরা ক্ষমা চাইলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে

বাংলাদেশে গণহত্যা ॥ সরকার অস্বীকার করলেও পাকিস্তানীরা ক্ষমা চাইলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে
  • ইসলামাবাদের আলিশবা নাঈম মন্তব্য করেছেন- প্রত্যেক পাকিস্তানীকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত;###;করাচীর আমিমা সাঈদ লিখেছেন- একাত্তরের প্রতিটি পাশবিক ঘটনার জন্য আমি লজ্জিত

নাজনীন আখতার ॥ রাষ্ট্র পর্যায়ে পাকিস্তান যখন একাত্তরের নির্মমতাকে নির্লজ্জভাবে অস্বীকার করে ঘৃণা কুড়াচ্ছে তখন দেশটির সাধারণ মানুষদের পক্ষ থেকে উঠে এসেছে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার এক ব্যতিক্রম আয়োজন। ‘চেঞ্জ ডট অর্গ’ এ এক পাকিস্তানী বাংলাদেশের কাছে একাত্তরের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে পিটিশন পেজ খুলেছেন। ৪ শয়েরও বেশি পাকিস্তানী সেখানে তাদের সহমত প্রকাশ করে ভার্চুয়াল স্বাক্ষর করেছেন। ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে মন্তব্য করেছেন। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে এ পিটিশনের লিংকও শেয়ার হচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশীরা এ লিংক শেয়ার করছেন। দেশে ফেসবুক এখন বন্ধ থাকলেও বিকল্প ব্রাউজারে ফেসবুক ব্যবহারকারীরাও তা শেয়ার করছেন।

দেখা গেছে, চেঞ্জ ডট অর্গে এ ‘পিটিশনিং অল পাকিস্তানীস : উই পাকিস্তানীস এপলোজাইস টু বাংলাদেশীস’ শিরোনামে এ পিটিশন পেজটি খুলেছেন রুয়ান্ডার কিগালি থেকে ইমাউদ্দিন আহমেদ নামক এক ব্যক্তি। বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এতে সমর্থকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৪ জন। এতে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, ‘১৯৭০-৭১ সালে আমাদের নামে বাংলাদেশে যে পাশবিকতা চালানো হয়েছে তার জন্য আমরা নিম্ন স্বাক্ষরকারী পাকিস্তানীরা গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি’। দুই মাস আগে এ পেজটি খোলা হলেও গত ২১ নবেম্বর কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের বেপরোয়া অবস্থানের পর এ পিটিশনে স্বাক্ষরকারী ও সমর্থনের সংখ্যা বেড়ে যায়। গত একদিনে এতে সমর্থন জানায় ২৫০ পাকিস্তানী।

পাকিস্তানের করাচী থেকে আমিমা সাঈদ এ পিটিশনে স্বাক্ষর করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে মঙ্গলবার লিখেছেন, ‘কারণ আমি বাংলাদেশী ও পাকিস্তানী অনেকের সঙ্গে মিশেছি যাদের ওই সময়ে সেনাবাহিনী ও জামায়াতে ইসলামীর ভয়াবহ আঘাত হানার ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে। কারণ আমি মনে করি, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তাদের একটি সরকার গঠন করার অধিকার ছিল। অথচ পশ্চিম পাকিস্তান অন্যায়ভাবে তা করতে দেয়নি। কারণ আমি দেখেছি, জাদুঘরে রাখা ১৯৭১ সালে প্রচ- আক্রমণের শিকার হওয়াদের গণকবর, হাড় ও খুলির অসংখ্য তথ্য প্রমাণ। কারণ আমি লজ্জিত, প্রতিটি পাশবিক ঘটনায় এবং এ বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র কার্যালয়ের নির্লজ্জ মিথ্যাচারে। আমি বলছি না, মুক্তিবাহিনী ও ভারত বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থান থেকে যে ভূমিকা রেখেছিল তা থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়া হোক। কারণ এ চাওয়া পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী পূর্বপাকিস্তান বর্তমানে যা বাংলাদেশ সেখানে যেভাবে গণহত্যা চালিয়েছিল ও যুদ্ধাপরাধ করেছিল তা থেকে তাদের অপরাধ থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না। আমি এই পিটিশনে স্বাক্ষর করেছি, কারণ আমি সব বাংলাদেশী নাগরিকের কাছে ক্ষমা চাইছি পাকিস্তানী নাগরিকদের নামে তাদের সঙ্গে যে চরম অপরাধ করা হয়েছে সে কারণে। আমি শুধু এটুকুই করতে পারি।’ পাকিস্তানের নাগরিক আমীমা সাঈদের এ বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৫৬ জন।

পাকিস্তানের ইসলামাবাদ থেকে সাদিয়া বোখারি নামে অপর এক পাকিস্তানী পিটিশনে স্বাক্ষর করে লিখেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধের ধ্বংসাত্বক ও ভয়াবহতার শিকার সকল তরুণী ও শিশুদের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। এ যুদ্ধের কারণে যে মা তার সন্তান হারিয়েছেন, যে নারী স্বামী হারিয়ে বিধবা হয়েছেন আমি তাদের কাছেও ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ তার এ মন্তব্যে সর্মথন দিয়েছেন ৪২ জন।

ইসলামাবাদ থেকে আলিশবা নাঈম নামে আরেকজন মন্তব্য করেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক পাকিস্তানীকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে এ ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে তা নতুন করে সেতুবন্ধনের কাজ করবে।’

লাহোরের বাসিন্দা রাবিয়া আহমেদ লিখেছেন, ‘১৯৭১ এ যা ঘটেছিল তা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ভয়াবহ। একাত্তরের ট্রাজেডিতে পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে আমি লজ্জিত।’

ক্যালিফোর্নিয়া থেকে জয়নাব খান নামে এক প্রবাসী পাকিস্তানী পিটিশনে স্বাক্ষর করে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশীদের আমি যতটুকু দেখেছি তারা অত্যন্ত নম্র ও বিশ্বস্ত। তারা যখন ১৯৭১ এর কথা বলে, যখন বলে যে, কীভাবে তাদের পরিবারগুলো পালিয়ে বেড়াচ্ছিল, তখন আমি সত্যি খুবই লজ্জিত হই। ভাবি যে, পূর্ব পাকিস্তানের লোকেরা যারা দেশকে ভালবাসতো, দেশকে সেবা করতো, দেশের উন্নয়নে কাজ করতো তাদের সঙ্গে আমাদের বড়রা কীভাবে এরকম আচরণ করতে পারলো। আমি এই বিশ্বাসঘাতকতা ও পাশবিকতার জন্য ক্ষমা চাই। পূর্বপাকিস্তান আমাদের জন্য কত বড় সম্পদ ছিল এবং হতে পারতো সে স্বীকৃতি তাদের না দেয়ার জন্যও আমি ক্ষমা চাই। আগামীতে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক ও ভালবাসা প্রত্যাশা করছি।’

ইসলামাবাদ থেকে উসামা খিলজি লিখেছেন, ‘১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশে পাকিস্তানের ভয়াবহ কর্মকা-ের ঘটনায় অনেক পাকিস্তানী এক ধরনের অপরাধবোধে ভোগে। এটা খুবই দুভার্গ্যজনক যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ওই সময়ে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং গণহত্যার মতো ভয়াবহতা চালালেও বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সব পাকিস্তানী নাগরিকের পক্ষ থেকে আমি ওই ঘটনায় গভীরভাবে সমবেদনা প্রকাশ করছি ও ক্ষমা চাইছি। আমরা খুব লজ্জিত এবং আমরা তোমাদের ভালবাসি।’

পিটিশনে স্বাক্ষরকারী কেউ কেউ গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে বাংলা শব্দে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তেমনই একজন ইসলামবাদ থেকে হাফিজ চাচার লিখেছেন, ‘আমার প্রিয় ভাই বাংলা, আমি ক্ষমার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি।’

দুবাইয়ে বসবাসরত এক পাকিস্তানী নাগরিক আলী সাঈদ পিটিশনে স্বাক্ষর করে মন্তব্য করেছেন, ‘এ ধরনের ঘটনা যেন আগামীতে আর কখনই না ঘটে তার জন্য প্রথম ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হচ্ছে- গ্রহন ও ক্ষমা প্রার্থনা।’

উল্লেখ্য, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর পরই পাকিস্তান গত ২২ নবেম্বর এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। একদিন পর ২৩ নবেম্বর বাংলাদেশ ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তানকে হস্তক্ষেপ না করতে সতর্ক করে। এরপরও পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মৌসুমী রহমানকে গত সোমবার তলব করে পাকিস্তান সরকার। তাকে তলব করে একাত্তরে পাকিস্তান গণহত্যার বিষয়ে অস্বীকার করে এবং এভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির পরিপন্থী বলে উল্লেখ করে। কড়া প্রতিবাদ জানানোর পরও ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব এবং ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিকৃত উপস্থাপনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পাকিস্তানের এ আচরণে স্বাধীনতার চেতনায় বিশ্বাসী জনসাধারণও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন।