২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উপকূলের ৪ কোটি মানুষ বাঁচাতে চাই সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা

  • প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলনে ওইসিডি’র সেমিনারে বাংলাদেশ

কাওসার রহমান, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে ॥ জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব মোকাবেলায় আগামী ১৫ বছরে বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ কোটি টাকা। এ বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান করা না গেলে বাংলাদেশের উপকূলের চার কোটি মানুষকে রক্ষা করা যাবে না। হুমকির মুখে পড়বে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনযাত্রা। বিলুপ্ত হয়ে পড়বে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন।

প্যারিসের লে বুর্জ কনফারেন্স সেন্টারে চলমান জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে ওইসিডি আয়োজিত এস সেমিনারে বাংলাদেশ এ তথ্য তুলে ধরেছে। সেমিনারে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নিজ উদ্যোগে কার্বন কমানোর (আইএনডিসি) পরিকল্পনা তুলে ধরেন পরিবেশ সচিব ড. কামালউদ্দিন আহমেদ। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অর্থাৎ অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার এবং প্রশমন কার্যক্রম তথা গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য প্রয়োজন আরও দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলার।

পরিবেশ সচিব বলেন, ‘গত ৩০ বছরের ড্যাটা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর দশমিক ৬ সেন্টিমিটার থেকে ২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে। তবে বাংলাদেশ একদিকে যেমন জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর কাজ করছে, তেমিন কম কার্বন নির্গমন করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।’

ড. কামাল উদ্দিন জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নিজ উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সীমিত সম্পদের মাঝেও বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করে সেখানে এ পর্যন্ত ৪০ কোটি ডলার অর্থ বরাদ্ধ করেছে। এই অর্থ দিয়ে এ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য ২৩৬টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১টি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ সুফল পাচ্ছে। গত তিন দশকে বাংলাদেশ জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় প্রায় এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে বলে জানান তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ এ পর্যন্ত যে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে তার মধ্যে রয়েছে, নতুন বাঁধ নির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত, সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল খনন ও পুনর্খনন, পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুইস গেট নির্মাণ, পানি ব্যবস্থাপনা ও ড্রেন নির্মাণ, বন্যা ও খরা সহায়ক শস্য বীজ উদ্ভাবন, বনায়ন এবং সোলার প্যানেল স্থাপন।

জলবায়ুু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য। বৈশ্বিক গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান মাত্র দশমিক ৩৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে প্রতিবছর বাংলাদেশের জিডিপির দুই শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। ২১০০ সাল নাগাদ এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৯.৪ শতাংশ।

জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান সামান্য হলেও বাংলাদেশ নিজ উদ্যোগে গ্রীন হাউস গ্যাস কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যুত, পরিবহন ও শিল্প খাতই হচ্ছে বাংলাদেশের গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমনের বড় উৎস। এই তিনটি উৎস থেকে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমন প্রায় ১১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। তাই এ তিনটি খাত থেকে বাংলাদেশ স্বেচ্ছায় ২০৩০ সাল নাগাদ ৫ শতাংশ গ্রীন হাউস গ্যাস কমানোর অঙ্গীকার করছে। তবে শর্ত সাপেক্ষে এ তিন খাত থেকে বাংলাদেশ আরও ১৫ শতাংশ গ্রীন হাউস গ্যাস কমাবে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গ্রীন হাউস গ্যাস কমানোর ব্যাপারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গীকার রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আমাদের গ্রীন হাউস গ্যাস নির্গমন কখনও উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় নির্গমন অতিক্রম করবে না। বাংলাদেশ চায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রী বা দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে নামিয়ে আনতে। সেটাকে বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশ তার উন্নয়ন পথনক্সা গ্রহণ করেছে।’

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে পেরুর রাজধানী লিমায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সকল দেশকে গ্রীন হাউস গ্যাস কমানোর ব্যাপারে স্বেচ্ছায় অঙ্গীকার করতে হবে। যাকে ইনটেনডেন্ট নেশনালি ডিটারমাইন্ড কনট্রিবিউশন (আইএনডিসি) বলা হয়। সে অনুযায়ী, ২০১৫ সালের অক্টোবর নাগাদ সকল দেশকে জাতিসংঘের কাছে নিজ উদ্যোগে কার্বন কমানোর পরিকল্পনা জমা দেয়ার কথা। ইতোমধ্যে বিশ্বের ১৫৭টি দেশ তাদের কার্বন কমানোর পরিকল্পনা জাতিসংঘে জমা দিয়েছে। বাংলাদেশ গত অক্টোবরেই এ পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। যাতে নিজ উদ্যোগে স্বেচ্ছায় ৫ শতাংশ এবং শর্ত সাপেক্ষে আরও ১৫ শতাংশ কার্বন কমানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে।

জলবায়ুু পরিবর্তনের কারণে একটি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হয়েও নিজ উদ্যোগে গ্রীন হাউস গ্যাস কমানোর বাংলাদেশের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানান ওইসিডির পরিচালক ক্রিস ডডওয়েল। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। অথচ এ দেশটি নিজ উদ্যোগ গ্রীন হাউস গ্যাসে কমানোর যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তা অত্যন্ত উৎসাহজনক।’

তবে এ আইএনডিসি পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জিং মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে অর্থায়ন। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হবে।

এ প্রসঙ্গে ইউএনডিপির জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ইয়নিল বনডোকি বেসরকারী খাতের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আইএনডিসি বাস্তবায়নে মূল চ্যালেঞ্জ হবে অর্থায়ন। এক্ষেত্রে বেসরকারী খাতের অংশগ্রহণ ছাড়া এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে।