২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লোকজ ঐতিহ্যে রঙতুলির জাদুকর

  • আক্তারুজ্জামান সিনবাদ

বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় প্রথিতযশা শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় নাম কাইয়ুম চৌধুরী। এদেশে রুচিশীল মুদ্রণ সংশ্লিষ্ট শিল্পের পথিকৃৎ, কবি, ছড়াকার, সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র সর্বদা সম্মুখসারির যোদ্ধা, সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে লোক ঐতিহ্য, গ্রাম্যজীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রকৃতিগত রূপ নির্মাণ করে আধুনিকতার সঙ্গে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করেছেন তিনি। জ্যামিতিক রূপবন্ধে দেশজ মোটিফের ব্যবহারে গড়ে তুলেছিলেন সমকালীন চিত্রজগতে নিজস্ব পরিচয়। তাঁর মূল পরিচয় ছিল মুদ্রণকলায়। পুস্তকের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণে এদেশের রুচি নির্মাণের অগ্রপথিক তিনি। তাঁর চিত্রকর জীবনের প্রায় সূচনালগ্ন থেকেই তিনি মুদ্রণকলার সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। প্রচ্ছদ শিল্পী হিসেবে রয়েছে তাঁর বিপুল খ্যাতি। লোকজ ধারাকে-তাঁর অলঙ্করণে আহরণ করে তিনি গেঁথে দেন নিজস্ব অনুভূতি। তাঁর প্রচ্ছদ শিল্পের ক্ষেত্রেও লোককলা একটি প্রধান আকর্ষণ এবং লোকশিল্পের নানা মোটিফকে জ্যামিতিক সরলতায় জারিত করে তিনি গড়ে নিয়েছিলেন তাঁর প্রচ্ছদ রূপের মূল আঙ্গিক, লিপি যেখানে অনুষঙ্গ মাত্র। তিনি শুধু ছবিই আঁকতেন না, ছবির মধ্যেই বাস করতেন। বইয়ের প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জার পাশাপাশি তেলরং, জলরং, কালি-কলম, মোমরং, রেশম ছাপে আবহমান বাংলা ও বাংলার লোকজ উপাদানগুলোকে চিত্রে আধুনিক ফর্মে ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি স্মরণীয়। শিক্ষকতা, পত্রিকার অলঙ্করণ, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মকা-ে অংশগ্রহণ ইত্যাদির পরও চিত্রকর্মই ছিল তার প্রধান আরাধ্য। তিনি রেখার আদলে রঙের ভাব ও ভাষা নির্মাণ করতেন। বাংলাদেশের শিল্পকলা চর্চায় তিনি যে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন যা চিরকালীন শ্রদ্ধায় স্মরণীয়। বাংলার বধূর হাতের নকশী কাঁথা, নৌকা, মাটির পুতুল, শীতল পাটির বুনট, হাতপাখা এর রৈখিক পুষ্পলতার আকারে অলঙ্করণের জ্যামিতির নক্সা সবই তাঁর ছবিতে আলঙ্কারিক ভাষায় ফুটে উঠেছে।

সৃষ্টির সঙ্গে জীব ও জীবের সব কর্মকা-। প্রকৃতি ও প্রকৃতির সব রূপ বিন্যাসের সম্পর্ককে নির্ধারিত হতে হয় শিল্পীর দৃষ্টি এবং চিন্তার মাধ্যমে। দৃষ্টির গভীরতার মধ্য দিয়েই সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। আর চিত্রের স্পেস বিষয়গত রচনার প্রেক্ষাপট নির্মাণের ধারণায় বিকশিত হয়। কাইয়ুম চৌধুরী চিত্রের স্পেসকে গল্পকথার মতো করেই বিন্যস্ত করেছেন। তাঁর ছবিতে কাব্যময় অথচ ছন্দিত রেখার প্রাধান্য সবচাইতে বেশি। তাঁর ছবি নক্সাপ্রধান। বর্ণিল পটভূমিতে মোটা দাগের নক্সা তাঁর প্রধানতম অঙ্কনশৈলী। রেখা আর রঙের রীতিবদ্ধ গুণের ভেতর পশ্চিমী কিউবিক রীতির আভাসও মেলে। এই দিক থেকে অঁরি মাতিসের সঙ্গে তাঁর সমিলতা লক্ষণীয়। রেখার মাধ্যমে বস্তুর আকারকে রক্ষা করে রং কখনও হালকা, কখনও গাঢ় করে সম্পূর্ণ ছবিতে গতির সঞ্চার করেছেন তিনি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাংলার চিরকালের কৃষক, কিষানি, প্রান্তিক নারী, ষড়ঋতু, পাখি, ফুল, প্রকৃতি এসবই ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। আকাশ, পানি, গাছ, লতা-পাতার আদলের সঙ্গে মানুষ এবং পাখির নানা ভঙ্গিমায় উপস্থাপনায় চিত্রে গল্পকথা প্রাণ পেয়েছে। কখনও মূল চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে শিল্পী ধারাবাহিক বক্তব্য প্রদানের চেষ্টা করেছেন। শুধু কল্পনার কাব্যধর্মিতা নির্মাণের প্রাণান্ত আবেদন এবং অনুবাদ তিনি নির্মাণ করেছেন। চিত্রের ক্ষেত্রজুড়ে বিষয়ভিক্তিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ করা শিল্পীর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রেখার বিভিন্ন মাত্রায় ব্যবহার যেন ভাষার আবহ নির্মিত হয়। শিল্পী যেমন করে রঙকে হৃদয় বেগের সঙ্গে একত্রিত করে প্রকৃতির ছন্দকে আকার দান করেছেন, যেভাবে তিনি রঙকে কাঠামোবদ্ধ রূপের মধ্যে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছেন আবার ছড়িয়ে দিয়েছেন আলোর সঙ্গে সত্যিই এ এক অনন্য সাধারণ দক্ষতা। কাইয়ুম চৌধুরী জীবন এবং প্রাঞ্জলতাকে অতি উজ্জ্বলতার সাপেক্ষে নির্মাণ করেছেন। রঙে রাঙানোই শিল্পীর কাজ। রঙকে রাঙিয়েছেন, আবার রঙকে ভালবেসেছেন। রং নিয়ে মেতে উঠতেন কাগজে, ক্যানভাসে চিত্তের আকুলতায়, দেখে মনে হয় যেন কত ব্যাকুলতা আঁকড়ে রয়েছে। রং দিয়ে জমিন তৈরি করে আবার অপেক্ষাকৃত গাঢ় রঙের মাধ্যমেই চিত্রের মূল বিষয়কে উপভোগ্য করে তুলেছেন। তিনি অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল রঙকেই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন তাঁর শিল্পকর্মে। চড়া বা উজ্জ্বল রং বিশেষ করে লাল, নীল ও সবুজের ব্যবহারে শিল্পী কাঙরা বা বাশুলি চিত্র হতে অনুপ্রাণিত হলেও পশ্চিমী ইম্প্রেশনিস্ট ধারাতে তিনি যে আকৃষ্ট ছিলেন, এ সত্য উপলব্ধি করবার মতো। সময়ের অবস্থান বা পরিবেশ বোঝাতে সম্পূর্ণ ছবিতে একটি বিশেষ রঙের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তা কখনও নীল, লাল বা সবুজ আবার কখনও হলুদ। এই বর্ণভঙ্গি তাঁর চিত্ররীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর বুদ্ধি ও অন্তরানুভূতি দিয়ে লোক উপাদান পরম্পরা আর পশ্চিমী রঙের মাধুর্য একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে নিজস্ব শৈলী রচনায় প্রবৃত্ত হয়েছেন। তাঁর রং কাব্যিক ও কোমল। তাঁর ছবির সমতল ভূমিতে খুব সামান্যই টেক্সারের প্রয়োগ, জল অথবা অল্প কিছু অংশে প্রয়োজন মতো বস্তুরূপের চারিত্র্যিক গঠন সৃষ্টিতে ব্যবহার করেছেন। রঙের গভীরত্বের কারণে তাঁর ছবিতে একটি বিশেষ কেন্দ্রবিন্দু সৃষ্টি হয়। ফুল, পাতা, জলের গতি আধাবিমূর্ত রূপবন্ধনে প্রকাশিত হয়।

ফর্ম নির্ণয় এবং নির্মাণ করা চিত্রশিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। শিল্পী জ্যামিতিক ফর্মের বিভিন্নমুখী ব্যবহারে প্রকৃতির ভেতরকার আকারকে অবলোকিত করেছেন। তিনি অসংখ্য নতুন জ্যামিতিক ফর্ম সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতিগত এই ফর্মের রূপকারই ছিলেন তিনি। ফর্মকে তিনি সব সময়ই রং রেখার আয়ত্তে রাখতেন এবং একটি ফর্ম কখনই আরেকটি ফর্মের সঙ্গে মেশাতেন না বরং স্বতন্ত্র ভঙ্গিতে সব ফর্মের প্রকাশ ছিল বেশ স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ। অনেক শক্তিশালী কাঠামোর মধ্য দিয়েই শিল্পী তাঁর চিত্রের ভিত্তি রচনা করতেন। অনেক বেশি সাবলীল এবং নিষ্কণ্টক জমিন তিনি তৈরি করতেন। তাঁর ক্যানভাসের আয়তন প্রায়শ বর্গাকার। জীবনভর প্রকৃতির রূপবন্ধন নির্মাণ করেছেন কাইয়ুম চৌধুরী। কিছু মোটা সমতল লাইন পরস্পর অধিক্রমণের ফলে নিসর্গ হয়েছে আরও প্রশস্তু ও উন্মুক্ত। বাংলার ষড়ঋতুর রূপ তিনি নিসর্গচিত্রে কাব্যিক ঢংয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। রঙের দিক থেকে কখনও কখনও মনে হয় সুপ্রতিষ্ঠিত পশ্চিমী বিমূর্তধারায় অনুপ্রাণিত শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার বিমূর্তধর্মী ছবির রঙের ব্যবহার তাকে অনুপ্রাণিত করেছে বা প্রভাবিত করেছে। যৌবনের গান, সাহসিকতা, দুঃসাহসিকতা, চঞ্চলতা, গ্রামীণ বালিকার ছুটে চলা, কৃষকের অগ্রগণ্য অবদান থেকে শুরু করে জেলেদের পানিবন্দী সব কিছুই এঁকেছেন।

তাঁর জীবন, তাঁর চিত্রকলা সবকিছুর মধ্যে দেশের প্রতি মমতাই প্রবলভাবে বিরাজ করে। তাঁর চিত্রমালায় সর্বদাই প্রকাশিত হয় দেশমাতৃকার যে বিস্তৃত রূপ, তাতে বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট, বন-বাদাড়, নদী-নৌকা, পাহাড় ও সমুদ্র উজ্জ্বলরূপে পরিস্ফুট হয় এবং এসব নির্বাক নয় বরং সবাক। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে প্রত্যেক সাবজেক্ট নিয়ে তিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনে ভিন্ন ভিন্ন ফর্ম সৃষ্টি করেছেন। গাছ, পাখি, নৌকা, নারী, পুরুষ, জবাফুল থেকে শুরু করে মাছ, চাঁদ, সূর্যসহ প্রকৃতিগত সব উপাদানের ফর্ম তিনি সৃষ্টি করেছেন এবং চিত্রে তা উপস্থাপন করেছেন। সারিবদ্ধ নৌকার গলুই ও চোখের ব্যবহার তাঁর ছবিতে উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যায়। ফর্ম-নির্ভর চিত্রের নমুনা করলেও জীবন বিধৌত সজীব প্রাণের উপস্থিতি কখনই তাঁর চিত্রে অনুপস্থিত ছিল না। এক অসাধারণ প্রেম বা প্রতিবাদী ধারণা বার বার চিত্রে এসে ধরা পড়েছে। দেখে মনে হয় আছড়ে পড়েছে শিল্পপ্রেমের সব মানবতাবাদী চিন্তাধারার আবাহন। বৃক্ষ ও পাতার গড়নের মধ্যে ডিজাইনের যে উদ্ভাসন তিনি দেখতে পান তা ছবিতে ফর্ম হিসেবে বিন্যস্ত করেছেন। ডিজাইনে লৌকিক প্রভাব তাঁর নিসর্গকে একটি স্থানিক মাত্রা যুগিয়েছে। সূর্য যেমন শক্তির প্রতীক তাঁর চিত্রে ফুলও তেমনি অনেকটা শক্তিময়তার রূপ নেয়। শিল্পীর চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়ালে গ্রামবাংলার ভাবাবেগের দ্বারা আপ্লুত হতে হয়। অচেনা, অজানা চিত্র রচনার গ্রাফিক ধরনগুলো দেখে মনে হয় যেন আমাদের আল বাঁধা জমিনগুলো সাজানো। আর আল বাঁধা জমিনের মধ্যে মানুষ, ফল, বীজ, শস্যমালা দিয়ে গ্রামকেই তুলে ধরার প্রাণান্ত চেষ্টা চলেছে কাইয়ুম চৌধুরীর ক্যানভাসে। রেখাগুলোও যেন জমির আলের মতোই স্পষ্ট, বলিষ্ঠ এবং সাবলীল মনে হয় জমির খণ্ডকে নিরাপত্তা প্রদান করছে প্রতি মুহূর্ত। শিল্পীর কাজে রেখা স্বচ্ছতা, সাবলীলতা এবং শক্তিমানতার প্রকাশ এতটাই প্রবল যে, গ্রাম্য সংস্কৃতির ধারাই প্রতীয়মান হয়েছে বার বার।

কাইয়ুম চৌধুরী তাঁর চিত্রকর্মে সর্বোপরি বাংলাদেশকে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের রূপ, রস, গন্ধ, ঐতিহ্য তিনি মমতাভরে এঁকেছেন। তিনি গ্রামবাংলার শিল্পী। দেশ বলতে শুধু সবুজ ধানক্ষেত কিংবা হলুদ সরষেক্ষেত নয়, শুধু নৌকা আর নৌকা নয়, নীল সমুদ্র কিংবা সবুজ পাহাড় নয়, দেশ বলতে ফসল উৎপাদক নিয়ত প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামশীল চাষী, উজান বেয়ে চলা নৌকার বলিষ্ঠ মাঝি, রাজপথে গণতন্ত্রকামী প্রতিবাদী ছাত্র-যুবক, কল-কারখানার ন্যায্য মজুরির দাবিতে লাল পতাকা হাতে আন্দোলনরত মজুর এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সতেজ স্বপ্রাণ নারীকুলকেও তিনি উপলব্ধি করেন ঐকাত্ম্যচেতনায়। তাঁর ছবিতে তাই এসব বিভিন্ন শ্রেণীস্তরের মানুষও চিত্রিত হয়। সজীব প্রাণবন্ত ও সংগ্রামমুখর রূপ নিয়েই তারা তাদের বলিষ্ঠতাকে, শক্তিময়তাকে প্রকাশ করে। অর্থাৎ শিল্পীর কাছে শেষ পর্যন্ত আরাধ্য হয় মানুষ। তাঁর পেইন্টিংয়ে কখনও কখনও রঙকে এমনভাবে ছোট ছোট রেখাকে সন্নিবেশিত করেছেন যেন মনে হয় নকশী কাঁথার এক একটি ফোঁড়ন।

মুক্তিযুদ্ধ তাঁর আবেগকে সমকালীনদের তুলনায় বিশেষভাবে তাড়িত করেছিল। এ নিয়ে তাঁর চিত্রের সংখ্যাও কম নয়। একটি মৃদু ও কোমল কণ্ঠের প্রকৃতি প্রেমিক চিত্রকর থেকে ক্রমেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন পল্লী­বাংলার আবহমান জীবনের এক অক্লান্ত রূপকার আর চলমান ঘটনা প্রবাহের একই সঙ্গে ভাষ্যকার ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। আকৃতির কিছুটা সরলায়িত জ্যামিতিক রূপের যে আদলটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন, সে নারী, মুক্তিযোদ্ধা, পাখি, বৃক্ষ, নৌকা বা গ্রামীণ বাড়িঘর যেটিই হোক, বাংলাদেশের সেসব বস্তু একটি নির্বিশেষ প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বিশেষভাবে বলতে হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গ্রামীণ কিশোর মুক্তিযোদ্ধার যে রূপটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন তা আমরা জানি। মাথায় লাল গামছা বাঁধা মুক্তিযোদ্ধা কাইয়ুম চৌধুরীর ক্যানভাসেই প্রথম দেখতে পাই। মুক্তিযুদ্ধের কাল নিয়ে তিনি যেসব ছবি এঁকেছেন, তাতে পাকিস্তানী বাহিনীর ধ্বংস যজ্ঞের চিত্র থাকলেও অধিকাংশই মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বব্যঞ্জকতায় পরিপূর্ণ। তিনি তাঁর চিত্রকর্মে মূর্ত এবং বিমূর্তের এক বিরাট সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। তাঁর ছবিতে কোন কিছুই যেন শেষ পর্যন্ত অপ্রকাশিত থাকেনি। যেন জীবন, সময় এবং বাস্তবতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয় কেবলই সুন্দর, প্রকৃতি আর রূপ-রসের প্রামাণ্যচিত্র তিনি নির্মাণ করেছেন। গতিশীলতা, কাব্যধর্মিতা প্রাণসঞ্চারণী ধারায় তিনি সব সময় উজ্জীবিত থাকতেন। গাছ, লতা, পাতার সন্নিবেশিত রূপের মাঝে তিনি স্বপ্নকে বার বার আলিঙ্গন করেছেন। শিল্পী গ্রামীণ এবং প্রকৃতিগত জীবনকর্মের স্বপ্ন ও দৃশ্যমান সুন্দরের সজীবতাকে নির্মাণ করেছেন আজীবন। কল্যাণকামী শুভবোধসম্পন্ন প্রগতির পথযাত্রী মানুষকে যেমন তিনি নিজ চিত্রে অক্সকন করেছেন, তেমনি তাদের সঙ্গও গভীরভাবে উপভোগ করেছেন। অন্তরের অন্তস্থল থেকে উচ্চারণ করেছেন এক অমোঘ বাণীÑ সবচাইতে ভালোবাসি মানুষের সঙ্গ। বাংলার শিল্প আন্দোলনে শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী প্রকৃতির মতোই চিরসজীব প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকবেন ইতিহাসের পাতায়।