২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানবতাবাদী নাট্যকার আর্থার মিলার

১৯১৫ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি নিউইর্য়কে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন ব্যবসায়ী আর মায়ের ছিল পোশাক তৈরির কারখানা। মোটামুটি সচ্ছল জীবনই চলছিল তাদের। কিন্তু এরই মধ্যে হানা ১৯৩০ সালের ‘দ্য গ্রেট রিসেইশন’। অন্য অনেক মার্কিন পরিবারের মতো মিলারের পরিবারও সম্মুখীন হয় নিদারুণ অর্থকষ্টের। কারও হাতেই সেই সময়ে টাকা পয়সা ছিল না। তাই ঘুরে-ফিরেই মিলারের নাটকে উঠে এসেছে পারিবারিক গল্প। হতাশাগ্রস্ত সময় এবং অভাব মিলারের নাটকের এক বড় অনুষঙ্গ। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে অভাব অনটন কাটিয়ে উঠতে তিনি কাজ নেন একটি গুদামে। সেখানে কিছুদিন কাজ করে টাকা জমান। এরপর ভর্তি হন মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই মূলত তাঁর নাটক লেখার পাদপীঠ। এরপর এল ১৯৪৪ সাল। সময়টা বেশ পয়মন্ত ছিল মিলারের জন্য। তাঁর প্রথম নাটক ‘দ্য ম্যান হু হ্যাড অল দ্য লাক’ মঞ্চস্থ হয় ব্রডওয়েতে। তবে সেটা নিদারুণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় অচিরেই। মাত্র ৪ সপ্তাহ চলার পর মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেয়া তাঁর নাটক। ভীষণ মুষড়ে পড়েন তিনি। লেখালেখির প্রতি আগ্রহই হারিয়ে ফেলেন।

এরপর কেটে যায় তিনটি বছর। এই তিনটি বছর ছিল তাঁর নিজেকে আবার নতুন করে তৈরি করার সময়। আবার লিখতে শুরু করেন তিনি। এবার লিখে ফেলেন ‘অল মাই সন্স’। ১৯৪৭ সালে নিউইয়র্ক ড্রামা ক্রিটিকস সার্কেল এ্যাওয়ার্ডের সেরা নাটকের পুরস্কার পায় নাটকটি। নাটকের আখ্যান গড়ে উঠেছে একটি যুদ্ধাস্ত্র কারখানাকে কেন্দ্র করে। যেখানে ত্রুটিপূর্ণ অস্ত্র তৈরি করা হয়।

১৯৪৯ সাল আর্থার মিলারের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় সময়। এ বছর মঞ্চে আসে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত নাটক ‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’। চারিদিকে দারুণ সাড়া ফেলে নাটকটি। মিলারের নাটকে একটি বৈশিষ্ট্য সব সময়ই বিদ্যমান, সেটি হচ্ছে পারিবারিক আবহ এবং বাবা ছেলের মধ্যকার সম্পর্ক। এজন্য তাঁর নাটকে ‘থিমেটিক ট্রিলজি’ অনেক বেশি লক্ষ্যণীয়। ‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’ নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র এবং টিভি সিরিজ। ১৯৫৩ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর অন্যতম রাজনৈতিক নাটক ‘ক্রুসিবল’। নাটকের প্রেক্ষাপট ১৯৫০ দশকের কমিউনিস্টবিরোধী আমেরিকার প্রেক্ষাপট। ‘দ্য ক্রুসিবল’ সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেতা ড্যানিয়েল ডে লুইস এবং উইনোনা রাইডার। এটি নিয়ে নির্মিত সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মিলার। সেবার এ চিত্রনাট্যের জন্য অস্কার পুরস্কারের নমিনেশন পেয়েছিলেন তিনি।

অবশ্য এ নাটকটি নিয়ে বেশ জল ঘোলা হয় এবং ১৯৫৬ সালে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। তিনি আদালতে আপীল করেন। একই বছর হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোকে বিয়ে করেন তিনি। ৬ বছর পর ১৯৬১ সালে বিচ্ছেদ ঘটে তাদের মধ্যে। একই বছর আর্থারের লেখা চিত্রনাট্যে নিজের শেষ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন মনরো। ১৯৬২ সালে নিজের ফ্ল্যাট থেকে মনরোর মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

আর্থার মিলারের জীবনবোধ, চিন্তা-চেতনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে তাঁর নাটকগুলোতে। নাটককে তিনি শুধু বিনোদনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে চাননি। সমাজের প্রতি তাঁর এ দায়বদ্ধতা তাঁকে অনন্য করেছে। এজন্য অবশ্য তাঁকে ভুগতেও হয়েছে। জীবদ্দশায় কমিউনিস্ট ঘেঁষা এবং আমেরিকাবিরোধী করার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁর ক্রুসিবল নাটকটি প্রকাশের পর বিরোধীরা এটিকে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের ঢাল হিসেবে বেছে নেয়। ‘ক্রুসিবল’ নাটকের গল্প গড়ে উঠেছে ১৯৬২ সালের ম্যাসাচুসেটস-এর সালেম শহরকে কেন্দ্র করে। কয়েকটি মেয়ে একটি বনে নাচছিল বালিকাসুলভ চপলতায়। তা ছিল সেই সময়ের ধর্ম ব্যাখাকারীদের চোখে একটি পাপ। মূলত নাটকের প্লটের মধ্য দিয়ে অন্ধ আবেগ এবং গোঁড়ামির বিষয়টি তুলে এনেছেন মিলার। বলতে গেলে এ নাটকটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ধর্মান্ধতা, ব্যক্তি সম্পর্কেও টানাপোড়েন, নিজের সত্যিকারের স্বরূপ আবিষ্কারের সাহসী চেষ্টা। সব মিলিয়ে মিলার সমকালীন আমেরিকান জীবনের দার্শনিক অনুভূতিকেই ধরতে চেষ্টা করেছেন তাঁর লেখনীর মাধ্যমে।

মিলার তাঁর স্ত্রী যৌন আবেদনময়ী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর মন ভালো রাখার জন্য ‘দ্য মিসফিট’ নামে একটি সিনেমার চিত্রনাট্য লেখেন। মিলার বলেছেন, ‘আমি অভিনেত্রী হিসেবে নিজের প্রতি তাঁর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সিনেমাটা শেষ হতে প্রায় তিন বছর লাগলো এবং আমরা আর সেই নারী পুরুষ রইলাম না। সিনেমাটা হলো কিন্তু বিয়ে টিকলো না আমাদের।’ ১৯৬২ সালে মিলার বিয়ে করেন অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত ফটোগ্রাফার ইগনে মোরাথ। তাদের দুই সন্তান। রেবেকা এবং ড্যানিয়েল। তাঁর কন্যা রেবেকাকে পরে বিয়ে করেন বিখ্যাত অভিনেতা ড্যানিয়েল ডে লুইস। মিলার তার নাটকের মধ্য দিয়ে ‘আমেরিকান সাইকি’ বোঝার চেষ্টা করেছেন। ১৯৮০ সালে তিনি ‘প্লেইং ফর টাইম’ নামে টিভির জন্য একটি চিত্রনাট্য লেখেন। এটি ছিল ফানিয়া ফেনেলনের আত্মজীবনীকে কেন্দ্র করে।

মিলারের নাটকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কালজয়ী হচ্ছে ‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’। দুই ছেলে আর এক নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবার গল্প নিয়ে গড়ে উঠেছে এই নাটকের আখ্যান। বাবা উইলি লোম্যান একজন বৃদ্ধ দোকানদার। যিনি রাস্তায় ভ্যান নিয়ে ঘুরে ঘুরে পণ্য বিক্রি করেন। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিক্রি খুবই কম। এক কলামে নিউইয়র্ক টাইমসের নাট্য সমালোচক এ্যাটকিনসন বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘১৯৬০ দশকের শুরুতে তিনি জানতেন কিভাবে ব্যবসাটা করতে হয়। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। তাঁর অবস্থা শোচনীয়। তাঁর জীবন তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। মিলার দারুণভাবে এর চরিত্রের ভেতরের হতাশাকে তুলে এনেছেন।’ ছেলেরা বুঝতে পারে বাবা আসলে নিদারুণ কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেশীর ছেলেটা দারুণ একটা চাকরি পেয়েছে। কিন্তু তারা দুই ভাই অনেক চেষ্টা করেও কিছুই করতে পারছে না। অবশেষে তাদের বাবা একদিন সিদ্ধান্ত নেয় যে তিনি ছেলেদের জন্য কিছু করবেন। একদিন তারা আবিষ্কার করেন যে, তাদের বাবা দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। তারা আরও জানতে পারেন যে তার বাবার ইন্স্যুরেন্স করা ছিল। প্রচুর টাকা তাদের হস্তগত হয়। দুই ভাইয়ের বুঝতে বাকি থাকে না যে বাবা তাদের সুখের জন্য এক রকমের আত্মহত্যাই করলেন। সেই কারণে ‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’ নামটি নাটকটির মূলভাব বুঝতে আমাদের সাহায্য করে।

তাঁর জীবনটাই যেন একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য। মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে তিনি বিখ্যাত নাট্যকার কেনেথ রভির কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে এই বিখ্যাত নাট্যকারের কাছ থেকেই নাটক লেখার অনেক বিষয় আয়ত্ত করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তারা দু’জন ছিলেন দু’জনের খুব ভাল বন্ধু। মিলার নিজে রক্সবুরিতে একটি স্টুডিও নির্মাণ করেন। সেখানে বসেই মূলত তিনি লিখতেন তাঁর নাটকগুলো। তিনিই বোধহয় একমাত্র নাট্যকার যিনি একাধারে মঞ্চ, রেডিও, সিনেমার জন্য নাটক এবং চিত্রনাট্য লিখেছেন অবিরাম। তাঁর বেশকিছু ছোট গল্পও রয়েছে। বেশ কিছুদিন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তিনি বেশকিছু যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। নিজের রাজনৈতিক চেতনার কারণে তিনি তাঁর সমকালীনে বেশ সমালোচিতই ছিলেন। বিশেষ করে বেশিরভাগ মার্কিনীর ‘আমেরিকান ড্রিম’ ধারণার সঙ্গে তিনি একমত ছিলেন না। সে কারণে তাঁর সম্পর্কে বলা হতো যে তিনি প্রো কমিউনিস্ট। অবশ্য মিলার নিজে কখনও কমিউনিজমকে আমেরিকার জন্য হুমকি মনে করেননি।

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার নাটকগুলো আসলে আমার আত্মজীবনী। আমি সেই নাটক লিখতে পারিনি যেখানে আমি নেই। আমার প্রতিটি নাটকে আমি আছি। এছাড়া কিভাবে লিখতে হয় আমি জানিই না।’ স্কুলজীবনে ফুটবল খেলার সময় চোট পাওয়ার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সৈন্য বাহিনী থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

১৯৪৯ সালে ‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’ নাটকের জন্য জিতে নেন পুলিৎজার পুরস্কার। ২০০২ সাল, মিলারের তৃতীয় স্ত্রী মোরাথ মৃত্যুবরণ করেছেন। এর পরই এই বিখ্যাত নাট্যকার অনুরক্ত হয়ে পড়েন ৩৪ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী এ্যাগনেস বার্লের সঙ্গে। ২০০৫ সাল ১০ ফেব্রুয়ারি ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

নশ্বর পৃথিবী থেকে তাঁর দেহের বিদায় ঘটলেও তাঁর লিখিত নাটক আর তাঁর ভেতরের অসংখ্য কালজয়ী চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন চিরকাল। মিলারের মৃত্যুর পর তাঁর মূল্যায়ন করতে গিয়ে ক্রিস্টোফার বিগস্বি বলেছিলেন, ‘হারিয়ে যাওয়া থিয়েটারের সামাজিক স্বীকৃতির ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি জীবন বাজি রেখেছিলেন। সেই থিয়েটার যেখানে আমেরিকাবাসী বুঝতে পারবে তাদের সমস্ত ব্যক্তিগত উদ্বেগ, রাজনৈতিক আর সামাজিক কনসার্নের উত্তর তারা একমাত্র সেখান থেকেই পেতে পারে।’