২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নান্দনিক সৌন্দর্যের হিরণয় পাঠ

  • শিউল মনজুর

কবি সাব্রী সাবেরিনের ৪৮টি কবিতার সঙ্কলন দ্বিধা ও দীর্ঘশ^াস ২০১৫ সালের বাংলা একাডেমির বইমেলায় প্রকাশিত হয়। দেশের খ্যাতিমান প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষের নান্দনিক শিল্পকারুকার্যে মোড়ানো দ্বিধা ও দীর্ঘশ^াস বইটি বের করেছে সিলেটের প্রকাশনী সংস্থা চৈতন্য।

সাব্রী সাবেরিন আশি দশকের কবি। পৈত্রিক নিবাস হাওড় বাঁওড়ের জেলা সিলেটের সুনামগঞ্জে। পুরোনাম আবু সুলতান মোঃ একে সাব্রী। রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনকারী এই কবি বর্তমানে বাংলাদেশ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদফতরের উপ-পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারী অফিসের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কবিতা লেখায় ছেদ পড়েছে বার বার। তবে কবিতার ভুবন থেকে দূরে সরে যাননি। মনের ক্যানভাসে লিখেছেন, প্রতিনিয়ত নানা রঙের কবিতা। দ্বিধা ও দীর্ঘশ^াসে যদিও কবি তাঁর তারুণ্য সময়ের লেখা কবিতাগুলোকেই অন্তর্ভুক্ত করেছেন তথাপি কবিতাগুলোর বিষয়গত যে আবেদন এবং যে অনুভূতির নির্যাসে কবিতার কুসুম শরীর নির্মাণ করা হয়েছে তা সব শ্রেণীর পাঠককেই নাড়া দেয় বা আন্দোলিত করে। এটাও সত্যি যে, বইটি প্রকাশের পর লক্ষ্য করা গেছে পাঠকরা আগ্রহ চিত্তেই কবির গ্রন্থকে গ্রহণ করেছে। বিষয়টি অনস্বীকার্য যে, বইটিতে বেশকিছু মুগ্ধ করার মতো কবিতা রয়েছে;

সুরমা নদীর তীরে (পৃষ্ঠা-৫৪), সময়ের ভেলা (পৃষ্ঠা-৫০), ব্যথিত পাথর (পৃষ্ঠা-৪৬), অসুস্থতার কাব্য (পৃষ্ঠা-৪২), স্মৃতি বন্ধ্যা নারী (পৃষ্ঠা-৪০), নির্বাসিত কবির বিষাদ (৩৬), রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় (পৃষ্ঠা-৩০), সমাজের চাকা (পৃষ্ঠা-২৮), আমার আনন্দ বহে প্রবাহে (২৯), আমার আম্মাকে (পৃষ্ঠা-২৪), সুরের রোদন (পৃষ্ঠা-২০), অসুখি অর্কিড (পৃষ্ঠা-১৭), অনার্স পরীক্ষা (পৃষ্ঠা-১৮), আসুন শানিত হই (পৃষ্ঠা-৫২), শুধুই প্রশ্নবোধক (পৃষ্ঠা-৫৫), সৃষ্টি সুখের উল্লাসে (পৃষ্ঠা-২২) প্রভৃতি কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হবে কবিতাগুলো যেন নতুন চরের মতো অথবা পড়তে পড়তে মনে হবে কবিতাগুলো হৃদয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে নতুন গোলাপের সুঘ্রাণ। কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে ছড়িয়ে আছে শব্দের দ্যুতি, উপমা ও অলঙ্কারের নানা বর্ণিল আভা যা পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে। কয়েকটি কবিতার কারুকাজ এখানে উপস্থাপন করা হলো;

ক. আকাশের বুকে স্তনের মতন গোলগাল ভীরু চাঁদ

আলোর প্লাবন নিয়েছে ভাসিয়ে সব নিষেধের বাঁধ

(শিরোনাম, চন্দ্রগ্রহণ, পৃষ্ঠা-১৫)

খ. ব্যাকুল বাসনা বক্ষে আদিগন্ত পড়ে আছে মৃতপ্রায় চরাচর

বিস্তৃত দূরত্বে তুমি, মধ্যমাঠে ব্যবধান কুটিল কবর

(শিরোনাম; তরুণ ধীবর, পৃষ্ঠা-১৪)

গ. আম যে তোমার বক্ষলগ্ন থাকে

আর পুরুষের প্রত্যঙ্গে থাকে ফণা তোলা অজগর

(শিরোনাম; সহপাঠ, পৃষ্ঠা-১৬)

ঘ. সাবেরীন কি নন্দিত কোন নদী

নির্জন একাকী দ্বীপ

কারো রাঙা কপালের শৈল্পিক কালো টিপ

(শিরোনাম; শুধুই প্রশ্নবোধক, পৃষ্ঠা-৫৫)

এমন নান্দনিক কারুকার্যময় কবিতার পঙ্ক্তি পাঠক মাত্রই ভাবিত করে, কবিতার গভীরে নদীর স্রোতের মতো টেনে নিয়ে যায়। বোধ করি পাঠককে দীর্ঘক্ষণ মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। তাই এই গ্রন্থের ৪৮টি কবিতার রূপকার কবি সাবেরীনের কাব্যশক্তি যে অত্যন্ত উর্বর তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

কেননা ৪৮টি কবিতা পাঠের পর কবির মেধাশক্তি নিয়ে আমাদের মনে কোন সংশয় বা দ্বিধা থাকে না। সাবেরিন যদিও তাঁর গ্রন্থের নামকরণ দিয়েছেন দ্বিধা ও দীর্ঘশ^াস, হয়তো তাঁর মনের ভেতর একধরনের দ্বিধা ছিল যে পাঠক তাঁর কবিতা গ্রহণ করবে কি না, আমার মনে হয় কবির সেই উৎকণ্ঠা দূর হয়েছে এবং দীর্ঘশ^াসের দীর্ঘপরিধি সঙ্কোচিত হয়েছে। কেননা কবিতাগুলো পাঠক সানন্দেই গ্রহণ করেছে এবং আমরা আশা করি দ্বিধা ও দীর্ঘশ^াসের পর কবি নতুন মাত্রা নিয়ে নতুন কবিতার বই আমাদের উপহার দেবেন, সেই প্রত্যাশা এখান থেকেই করা যায়।