২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমেরিকাকে কার্বনমুক্ত করার নীলনক্সা

  • এনামূল হক

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পৃথিবীর উষ্ণতা গড়ে ১.৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট বেড়েছে। উষ্ণতা বৃদ্ধিও বেশিরভাগই ঘটেছে ১৯৬০ সাল থেকে। তবে এই উষ্ণায়ন বড়ই অসমভাবে ঘটেছে। সে কারণে দেখা যায় সুমেরু অঞ্চলের কোন কোন স্থানে উষ্ণতা ১৫ ডিগ্রী পর্যন্তও বেড়েছে। পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গত ৫০ বছরে শিল্পায়িত বিশ্ব থেকে কার্বন নির্গমনও ব্যাপক পরিসরে বেড়েছে। সন্দেহ নেই যে, কার্বন নির্গমন বৃদ্ধির কারণেই পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে গেছে।

পূর্ববর্তী শতাব্দীতে আমরা যে পরিমাণ কার্বন বায়ুম-লে যোগ করেছি প্রায় সেই পরিমাণ কার্বনই ছেড়েছি গত সিকি শতাব্দীতে। পরিণতি দাঁড়িয়েছে এই তাপমাত্রা রেকর্ড রাখার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে গত বছর এবং বিগত দশকটি ছিল যথাক্রমে উষ্ণতম বছর ও উষ্ণতম দশক। এর পরিণতি সে কি ভয়াবহ কল্পনাই করা যায় না। তাপপ্রবাহের আগের রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। এই প্রবাহ আরও ৫ গুণ হতে পারে। পশ্চিম এন্টার্কটিকার বরফের আস্তরণের এক বিরাট অংশ বিলীন হতে চলেছে। এর প্রভাবে আগামীতে সাগরের জলস্তর কমপক্ষে ৪ ফুট বাড়বে। তলিয়ে যাবে অনেক এলাকা।

এত নিরানন্দ চিত্রের মধ্যেও দিগন্তে আশার আলো উঁকি দিচ্ছে। বিশ্বের সর্বাধিক কার্বন উদ্গীরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন কার্বন নির্গমন হ্রাসের একটা চুক্তি করেছে। আরও কিছু দেশও আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০১৪ সালে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল পোড়ানোর কারণে কার্বন নির্গমন বাড়েনি। তার একটা কারণ চলতি শতাব্দীতে এই প্রথম চীন আগের বছরের তুলনায় কয়লা পুড়িয়েছে কম। পাশাপাশি চীন ও অন্যান্য দেশে সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য এনার্জির উৎপাদন বেড়েছে ও বাড়ছে। জার্মানি তো রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে। সবকিছু মিলে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা ও তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী এক ব্যাপক জাগরণ দৃষ্টি হয়েছে এবং সেই লক্ষ্যে কর্মোদ্যোগও চলছে। চলতি বছর হতে পারে সেদিক দিয়ে এক যুগান্তকারী বছর।

শুধু সদিচ্ছাটুকু থাকলেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে কার্বনমুক্ত করতে পারে মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে। এ ব্যাপারে একটা রোডম্যাপ দিয়েছেন স্ট্যানফোর্ডের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক মার্ক জ্যাকবসন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে যুক্তরাষ্ট্র জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর শতভাগ নির্ভর করতে পারে। জ্যাকবসন দেখিয়েছেন তার রোডম্যাপ অনুসরণ করলে ২০৫০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন নেটওয়ার্ক গাড়ি, জাহাজ, বিমান বিদ্যুত থেকে উৎপাদিত হাইড্রোজেন বা ব্যাটারিতে চলবে। তার মতে, সব অঙ্গরাজ্যেই সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব।

আজ যুক্তরাষ্ট্রের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের মাত্র ১৩ শতাংশ আসছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। আর জ্যাকবসনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এপোলো কর্মসূচী, আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক নেটওয়ার্ক, পরমাণু বোমা এবং দ্বিতীয় বিশুযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ভা-ার তৈরির পিছনে যে পরিমাণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল একই সঙ্গে সমষ্টিগতভাবে সেই উদ্যোগ নিতে হবে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার বা মাথাপিছু আমেরিকানের জন্য ৪৭ হাজার ডলার। আর সেই ব্যয়টা হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শক্তি উৎপাদন ও মজুদ করার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য।

সেই ব্যবস্থাটা কি রকম হবে? ৭ কোটি ৮০ লাখ বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসাতে হবে, প্রায় ৪৯ হাজার বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে, ১ লাখ ৫৬ হাজার উপকূলীয় বায়ুটার্বাইন এবং সেইসঙ্গে তরঙ্গ এনার্জি ও জিও-মার্শাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থলভিত্তিক বায়ুকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজন হবে ৩ লাখ ২৮ হাজার টার্বাইনের, যার প্রতিটি ব্লেড হবে একটা ফুটবল মাঠের চেয়েও লম্বা। এর জন্য যে পরিমাণ জমি লাগবে তা উত্তর ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যের সমান। তবে জ্যাকবসনের মতে আমেরিকান তেল, গ্যাস আহরণের জন্য কূপ খননে যে পরিমাণ জমি লেগেছে হিসাব করলে দেখা যাবে সেটা নিউজার্সির চেয়েও বেশি।

জ্যাকবসন বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে গতিবেগ সঞ্চারিত হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে ভর্তুকি, ব্যাপকহারে উৎপাদনের কাল খরচ হ্রাস এসব কারণে একটা জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে এই খাতে। ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল এই ১০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে সৌর ও বায়ুবিদ্যুত উৎপাদন ১৫ গুণ বেড়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে এগুলোর জন্য কোন জ্বালানি লাগে না। কাজেই কালক্রমে এগুলোর পরিচালন ব্যয় কমে যায়। ২০১৩ সালে প্রচলিত জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদনের খরচ কিলোওয়াট প্রতি ১১ দশমিক ১১ সেন্ট। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের কিলোওয়াট প্রতি খরচ ছিল ১০ দশমিক ৮৫ সেন্ট। ২০৫০ সালে প্রচলিত জ্বালানির দ্বারা উৎপাদন খরচ পড়বে ১০ দশমিক ৫৫ সেন্ট এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্বারা ৯.৭৮ সেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রে ৫০টি অঙ্গরাজ্য। সব অঙ্গরাজ্যে সূর্যের তেজ ও বায়ুর গতি এক নয়। কাজেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস ব্যবহারে সব রাজ্যের অবস্থা এক হবে না। জ্যাকবসন ২০৫০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে জ্বালানিমুক্ত করতে ৬টি রাজ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র হাজির করেছেন। যেমন : ক্যালিফোর্নিয়া। সেখানে বিশুদ্ধ জ্বালানির অনেক উৎস আছে। এখানে ২০৫০ সালে ৪ লাখ ১৭ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। এর ৫ শতাংশ জিওথার্মাল, শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ জোয়ার, শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ তরঙ্গ, ৪.৫ শতাংশ জলবিদ্যুত, ১৫ শতাংশ ছাদের ওপর ফটোভোল্টাইক সেল, ২৬.৫ শতাংশ ইউটিলিটি ফটোভোল্টাইক, ১৫ শতাংশ কনসেন্ট্রেটেড সৌরশক্তি কেন্দ্র, ১০ শতাংশ উপকূলবর্তী বায়ু ও ২৫ শতাংশ উপকূল এলাকার বায়ু থেকে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০৫০ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ দাঁড়াবে প্রতি কিলোওয়াট ৯.৭ সেন্ট।

লুইজিয়ানা রাজ্যটি উপসাগরের তীরে। সেখানে বায়ুপ্রবাহ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুত উৎপাদনের সম্ভাবনা অতি প্রবল। ২০৫০ সালে সেখানে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৬৯ মেগাওয়াট। জ্যাকবসনের রোডম্যাপ অনুসরণ করলে এই বিদ্যুতের ৬০ শতাংশ উপকূলীয় বায়ু থেকে, শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ স্থলবায়ু থেকে, ৩১.৩ শতাংশ ইউটিলিটি ফটোভোল্টাইক থেকে, ৫ শতাংশ সিএসপি প্ল্যান্ট থেকে, ২.৫ শতাংশ ছাদের ওপর সৌরপ্যানেল থেকে, শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ তরঙ্গ এবং শূন্য দশমিক ১ শতাংশ জলবিদ্যুত থেকে মিলতে পারে।

বায়ুতাড়িত সমভূমি অঞ্চল উত্তর ডাকোটায় ২০৫০ সালে লাগবে ৩৪০৯৭ মেগাওয়াট বিদ্যুত। এর ৬৫ শতাংশ আসবে স্থলভাগের বায়ু থেকে। ৩৫ শতাংশ ইউটিলিটি পিভি, ২ শতাংশ ছাদের সৌরপ্যানেল, ৫ শতাংশ সিএসপি কেন্দ্র ও ৩ শতাংশ জলবিদ্যুত থেকে। ইতোমধ্যে এখানকার বায়ুশক্তি থেকে রাজ্যের ১৭.৫ শতাংশ বিদ্যুত আহরিত হচ্ছে।

সৌর মরূদ্যান বলে পরিচিত এ্যারিজোনা রাজ্যটি ইউটিলিটি পরিসরে সৌরবিদ্যুত উৎপাদনে ক্যালিফোর্নিয়ার পর দ্বিতীয় স্থানে। রাজ্যটি সূর্যালোক থেকে ৭০ শতাংশের বেশি বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারে। সেখানে সৌর ব্যাটারির ধারণ প্রযুক্তি উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। ২০৫০ সালে সেখানে বিদ্যুতের চাহিদা হবে ৭০ হাজার ৪১৮ মেগাওয়াট। এর ৩২ শতাংশ ইউটিলিটি ফটোভোল্টাইক থেকে, ৩০ শতাংশ ঘনীভূত সৌরবিদ্যুত কেন্দ্র থেকে, প্রায় ১১ শতাংশ উপকূলীয় বায়ু, ২ শতাংশ জিওথার্মাল, ৬.৫ জলবিদ্যুত এবং ১০.৬ শতাংশ ছাদের ফটোভোল্টাইক সেল থেকে পাওয়া যেতে পারে।

কয়লার রাজ্য কেনটাকি। প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুতের পিছনে কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গমনের দিক দিয়ে কেনটাকি আমেরিকার রাজ্যগুলোর মধ্যে শীর্ষে। ২০৫০ সালে রাজ্যের বিদ্যুত চাহিদা হবে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮৩১ মেগাওয়াট। এর ৭৯.৭ শতাংশ ইউটিলিটি পিভি, ৫.৩ শতাংশ ছাদের পিভি, ৫ শতাংশ সিএসপি প্ল্যান্ট, দেড় শতাংশ জলবিদ্যুত এবং সাড়ে ৬ শতাংশ স্থলবায়ু থেকে আসতে পারে।

কয়লাচালিত বিদ্যুত কেন্দ্র ও তেল শোধনাগার থাকায় টেক্সাস বেশিরভাগ রাজ্যের তুলনায় অধিক কার্বন নির্গমন করে। ক্যালিফোর্নিয়ার চেয়ে করে প্রায় দ্বিগুণ। অথচ এখানে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ হলেই বৈশ্বিক কার্বন নির্গমন প্রায় ২ শতাংশ কমে যাবে। বায়ুশক্তির দিক দিয়ে টেক্সাস আমেরিকার অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে শীর্ষে। রাজ্যটি তার বিদ্যুতের ১০ ভাগ বায়ুশক্তি থেকে পায়। ২০৫০ সালে টেক্সাসে ৬ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। এর ৫০ ভাগ স্থলবায়ু, ১৪ ভাগ উপকূলীয় বায়ু, ১৪ শতাংশ সিএসপি কেন্দ্র, ১৫.৮ শতাংশ ইউটিলিটি পিভি, সাড়ে ৬ শতাংশ ছাদের পিভি, শূন্য দশমিক ২ শতাংশ জলবিদ্যুত, শূন্য দশমিক ১ শতাংশ তরঙ্গ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ জিওথার্মাল থেকে আনা যেতে পারে।

সৌরশক্তি থেকে বিদ্যুত আহরণের নতুন নতুন প্রযুক্তিও উদ্ভাবিত হচ্ছে। এমন এক নতুন প্রযুক্তি চালু হয়েছে এ বছর লাস ভেগাসের উত্তর-পশ্চিম ক্রিসেন্ট ড্রিডন সোলার প্ল্যান্টে। সেখানে ১০ হাজার আয়নার সাহায্যে সূর্যালোক ঘনীভূত ও তরল লবণ উত্তপ্ত করে রাতদিন বিদ্যুত উৎপাদন করা হয়।

সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অবলম্বনে