২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

ঢাকায় ছাত্রজীবনের সূচনা

(৪ ডিসেম্বরের পর)

মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠার সময় থেকে আমি বেগম রহিমের সহকারী হিসেবে কাজ করতে শুরু করি। তার চিঠিপত্র লেখা, বক্তব্যের কপি করা এসব কাজে তিনি আমাকে ব্যবহার করতেন। বস্তুতপক্ষে আমি তার একজন ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হই। আমি তাই আমার কৈশোর ও যৌবনে প্রায়ই দম্ভভরে তার ছেলেমেয়েদের বলতাম যে, তাদের মাকে আমি ওদের চেয়ে বেশি চিনি এবং তার সম্বন্ধে আমার মতো কেউ তাকে চিনেন না।

তিনি অসহযোগ আন্দোলনের সময় (১৯৩১-৩৩) সম্ভবত প্রথমবারের মতো শহর প্রদক্ষিণে মহিলাদের বিক্ষোভ শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন। তিনি এক সময় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যও ছিলেন। তার বড় ছেলে মোয়াজ্জেম আহমদ চৌধুরী (১৯২২-২০০২) কলকাতা ও পূর্ব পাকিস্তানে রাজনীতিবিদ হিসেবে তার স্বাক্ষর রেখে যান। কলকাতায় তিনি ১৯৪৬ সালে হন সিটি মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক এবং তখন থেকে বঙ্গবন্ধুর খুব ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হন। বঙ্গবন্ধুর একটি রহহবৎ পরৎপষব প্রতিষ্ঠা পায় পাকিস্তানের জন্মলগ্নে যারা প্রথম থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। মোয়াজ্জেম ভাই সেই বলয়ের অন্যতম সদস্য ছিলেন। এই তথ্যটি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর তিনি নিজে আমাকে জানান এবং তৎকালীন চিন্তাধারা ও কার্যক্রমের ওপর একটি প্রতিবেদনও আমাকে দেন। তারা কখনও ভারতের সহায়তায় স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার চিন্তা করেননি, বরং লন্ডনে প্রবাসী বাঙালীদের সংগঠিত করে স্বাধীন বাংলা আন্দোলন এগিয়ে নিতে চান। পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হবার পর এক সময় ১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু আগরতলা যান লন্ডনে পার পাওয়ার জন্য। কিন্তু সে যাত্রায় ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনেক কষ্ট করে তাকে পদব্রজে ও ট্রেনে ঢাকায় ফিরে আসতে হয়। পাকিস্তান সরকার ১৯৬৮ সালে তার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে একটি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়। অপদার্থ সামরিক গোয়েন্দা বাহিনী সেখানে দাবি করে যে, তিনি ১৯৬৭ সালে আগরতলায় ভারতীয়দের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করতে যান। হতভাগারা ভুলে যায় ১৯৬৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান কারাগার ও সামরিক কাস্টডিতে গ্রেফতার ছিলেন। ধান ভানতে এতক্ষণ শিবের গীত গাইলাম। এবারে কবীরে প্রত্যাবর্তন দরকার। আমরা যখন অনার্স ক্লাসে তৃতীয় পর্বের ছাত্র তখন একদিন এক বন্ধু এসে বলল যে, কবীর ও মাহমুদ নিচতলায় মাহমুদের কামরায় পাগলামি করছে। আমরা দৌড়ে সেখানে গেলাম ও তাদের বদ্ধ পাগলামি দেখলাম। তারা কামরায় প্রচুর পানি ফেলেছে এবং ভান করছে যে, তারা মাতাল হয়ে গেছে, হয়তো মদ্যপান করেছে। আমরা আসলেই খুব চিন্তিত হয়ে তাদের হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করতে থাকলাম। আমাদের প্রস্তুতি যখন শেষ পর্যায়ে হলের ডাক্তার সাহেবের ঘোড়ার গাড়ি যখন তাদের নিতে আসবে তখন জানা গেল যে, সারাটি উপাখ্যানই ভাওতাবাজি। বাস্তব জীবনে তারা দু’জন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং বন্ধু। মাহমুদের বোন তুলির বিয়ে হয় কবীরের সঙ্গে। তাদের একটি মেয়ে তার স্বামীসহ এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে। তাদের ছেলে ইহতেশাম কবীর সমি। বর্তমানে ঢাকায় একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এবং সে অত্যন্ত যতœসহকারে তার পিতার বাগানটি পরিচর্যা করে। তাছাড়া সে একজন শৌখিন আলোকচিত্র শিল্পী। সুন্দরবন এবং সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপরে তার দু’টি বই ইংরেজীতে প্রকাশিত হয়েছে। মাহমুদ কবীরের খালাতো বোন নিলুফার চৌধুরীকে বিয়ে করে এবং তাদের এক ছেলে আছে আমেরিকায় আর অন্যটি লন্ডনে। একটি মেয়ে তার নিজের সংসার নিয়ে আছে ঢাকায় । মাহমুদ বাংলাদেশের প্রথম প্রাইভেট টিভি স্টেশন একুশের কর্তা ছিল এবং একুশের কারণেই সে খালেদা জিয়ার রোষানলে পতিত হয়। খালেদা জিয়া একুশে টেলিভিশন বন্ধ করে দেন এবং মাহমুদ তখন লন্ডনে পালিয়ে গিয়ে জীবন বাঁচায়। দুর্ভাগ্যবশত লন্ডনে সে ২০ জানুয়ারি ২০০৪ সালে ইন্তেকাল করে এবং খালেদা জিয়ার বাংলাদেশে আসবে না বলে লন্ডনেই অন্তিম শয্যায় শায়িত আছে।

ঢাকায় ছাত্রজীবনের আরও কথা

১৯৫৩ সালের শুরুটি আমাদের খুব ভালই ছিল বলে মনে হয়। ফেব্রুয়ারি মাসেই হলের ইউনিয়ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হলের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি কিন্তু তেমন লম্বা ছিল না। সারাদেশেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ফলে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার খুবই অজনপ্রিয় হয়ে যায় এবং বিশেষ করে ছাত্রমহল নুরুল আমিন সরকারের পতন ছাড়া আর কিছুতেই আগ্রহশীল ছিল না। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে এই আক্রোশ ছাত্রদের মধ্যে নিজেদের দলাদলি ব্যাপকভাবে নিরসন করে। ছাত্রদের প্রধান দুটি দল তখন ছিল ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (ইপিএমএসএল) এবং ছাত্র ইউনিয়ন।

আমরা জানি যে, মুসলিম লীগের সমর্থক অল ইস্ট পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এইপিএমএসএলের মোটেই কোন ছাত্র অনুসারী ছিল না। বিরোধী দুটি ছাত্রদল ঠিক করল যে, তারা যৌথভাবে হলের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট গঠন করবে, যাতে মুসলিম লীগ সমর্থকদের কোন সুযোগ না হতে পারে। ২ ফেব্রুয়ারি হলের একটি ছাত্র সভায় দুই গোষ্ঠী মিলে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নামে একটি নির্বাচনী দল গঠন করল। নির্বাচনের তারিখ ছিল ১১ ফেব্রুয়ারি। সুতরাং তড়িঘড়ি করে প্রার্থী মনোনীত করা হলো। প্রার্থী মনোনয়নে তেমন কোন তর্ক-বিতর্ক হলো না বা সময়ও লাগল না। ছাত্র ইউনিয়নের তেমন কোন বড় নেতা সলিমুল্লাহ হলে ছিলেন না। সুতরাং সহ-সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক দুটি প্রধান পদে ছাত্রলীগের দু’জন নেতা মনোনীত হলেন। সহ-সভাপতি পদে মনোনয়ন পেলেন এমএ পাস আইনের ছাত্র শামসুল হক (যিনি পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন)। সাধারণ সম্পাদকের মনোনয়ন পেলেন মোঃ বদরুজ্জামান নামক একজন সজ্জন ছাত্র। তিনি সম্ভবত এমএ এবং আইনের ছাত্র ছিলেন ও পরবর্তী জীবনে জুডিশিয়াল সার্ভিসের সদস্য হন। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদ যুগ্ম-সম্পাদকের জন্য ছাত্র ইউনিয়নের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আমি মনোনয়ন পেলাম। বলে রাখা ভাল যে, আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলাম না। তবে আমাকে ছাত্র ইউনিয়নের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তাতে আমি খুব বেশি আপত্তিও করতাম না। আমি ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন দু’দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিলাম। আরও নানা পদে তখন ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয় প্রার্থীরা আমাদের প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমাদের ক্রীড়া সম্পাদক ভাল ক্রিকেট খেলোয়াড় এবং মৃৎশিল্পের ভাল ছাত্র ছিলেন সিরাজ হোসেন খান, যিনি পরবর্তী জীবনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের একজন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আমাদের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন সে বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র কালীনারায়ণ বৃত্তিপ্রাপ্ত সংখ্যাতত্ত্বের ছাত্র ড. গোলাম রব্বানী। তিনি কর্মজীবনে সিএসপি কর্মকর্তা ছিলেন এবং বাংলাদেশের পরিসংখ্যান সচিব হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এতই দুর্বল ছিল যে, তাদের সঙ্গে আমাদের ভোটের তফাৎ বোধ হয় সবচেয়ে কম ছিল ২০০ (যারা ভোট দেয় তাদের সংখ্যা ছিল হয়ত ৫০০)। প্রতিদ্বন্দ্বীদের নাম এখন আর আমার মনে নেই।

১৯৫৩ সালে পূর্ব বাংলায় মুখ্যসচিব ছিলেন একজন আইসিএস কর্মকর্তা হাফেজ মোঃ ইসহাক। তার পূর্বসূরি আজিজ আহমেদ পূর্ববাংলায় উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তার জনসংযোগের প্রয়োজন আছে বলে মনে করতেন না। তিনি সদম্ভে সচিবালয়ে রাজত্ব করতেন এবং তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। তিনি ১৯৩০ সালের একজন আইসিএস কর্মকর্তা ছিলেন এবং মাত্র ১৭ বছরের জ্যেষ্ঠতা নিয়ে পূর্ববাংলার মুখ্যসচিব হন। কেন্দ্রীয় সরকারে পূর্ববাংলার সর্ববিষয়ে তাকেই সবজান্তা বলে বিবেচনা করা হতো। তিনি যে প্রদেশে সর্বোচ্চ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন সেই প্রদেশের সমস্যা নিয়ে তেমন বিচলিত হতেন না। চলবে...