২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জলবায়ু পরিবর্তনে বিপর্যয়

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ের আশঙ্কা বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে ফিবছর এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়ে থাকে। এ বছরও প্যারিসের লা বুর্জ কনফারেন্স সেন্টারে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে। যদিও গত ক’দিনে সর্বজনীন জলবায়ু চুক্তির আইনী কাঠামো তৈরির অগ্রগতি খুবই সামান্য।

বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর গ্যাস নির্গমন আর প্রচুর পরিমাণ ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ নিষ্কাশনের ফলে দিন দিন পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুম-ল এবং জলবায়ুর অবস্থা। যার ফলস্বরূপ সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিমজ্জিত হচ্ছে বাংলাদেশের মতো নিচু দেশগুলো। জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিকভাবে বাংলাদেশকে একটি বিপন্ন অবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি উপকূলীয় জনগণের জীবনধারায় মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

আশার কথা, বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে সবচেয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্য বরাবর উন্নত বিশ্ব তথা শিল্পোন্নত দেশগুলোকে দায়ী করে তাদের নিজ নিজ দেশে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে এনে প্রতিশ্রুত তহবিলের অর্থ দ্রুত ছাড় দেয়ার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

জলবায়ুবিষয়ক বিজ্ঞানীরা আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছিলেন, এ বছর ‘এল নিনো’র দাপট এতটাই বেশি যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি চরম মাত্রার দিকে ধাবিত হবে।

একইসঙ্গে প্রকৃতি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত আচরণও করতে পারে। তারই প্রমাণ দেখা গেল অতিসম্প্রতি ভারতের চেন্নাইসহ অন্যান্য স্থানে ভয়াবহ বন্যা হওয়ায়। গত ১০০ বছরের মধ্যে সেখানে সর্বাধিক বৃষ্টিপাতই ওই বন্যার কারণ। গবেষকদের ধারণা, আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। দেশের দক্ষিণে সমুদ্রের স্তর যদি এক মিটার বৃদ্ধি পায়, তাহলে আইপিসিসির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৭ হতে ২০ শতাংশ জমি সমুদ্রে বিলীন হবে। এর ফলে দেশের সামাজিক শৃঙ্খলাই ভেঙ্গে পড়তে পারে। পরিসংখ্যানগত দিক দিয়ে এটাও স্পষ্ট যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খাদ্যের পাশাপাশি সুপেয় পানির নিরাপত্তায় বিরাট চাপ আসবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই পরিবর্তিত হচ্ছে পানির চক্রসমূহ। সমস্যাটি শুধু আমাদের একার নয়, সারাবিশ্বের। আমাদের প্রতিবেশী ভারত-মিয়ানমারও আমাদের মতো একই ধরনের সমস্যায় পড়বে। অর্থাৎ গোটা উপমহাদেশেই নতুন ও ভয়াবহ এক সামাজিক অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) সতর্কবার্তা দিয়েছে আগেই। তারা বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক প্রভাব এড়াতে হলে কয়লা, তেল বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার দ্রুত বন্ধ করতে হবে। এটা ঠিক যে বিশ্বকে এখন কয়লাভিত্তিক জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতেই হবে। সেজন্য তহবিল দিতেও প্রস্তুত বিল গেটসসহ বিশ্বের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা। কথা হচ্ছে সে লক্ষ্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিতে হবে। প্যারিসে সব দেশ মিলে একটি সর্বজনীন জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে ঐকমত্য হলেও তা বাস্তবায়নে আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকবে কি-না তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়াটা দুঃখজনক। বিশ্ববাসীর প্রত্যাশাÑআর প্রতিশ্রুতি নয়, এবার জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে ধরিত্রী রক্ষায় সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেয়া হোক। জলবায়ু শরণার্থীর মিছিল থামাতেই হবে। এ ক্ষেত্রে আইনী চুক্তির কোন বিকল্প নেই।