২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিশ্চিহ্ন হচ্ছে বধ্যভূমি

  • চিহ্নিত ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর আল শামসরা দেশের এমন কোন জায়গা নেই যেখানে গণহত্যা ও নারী নির্যাতন, নারকীয় তা-ব চালায়নি। পুরো দেশটাই পরিণত হয় গণকবর আর বধ্যভূমিতে। কোথাও দিনের পর দিন মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের বুলেট বিদ্ধ ও বেয়োনেটে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার পর মরদেহ পড়ে থেকেছে। স্বাধীনতা ও বিজয় অর্জনের পর এইসব কঙ্কাল যেখানে পাওয়া গেছে সেখানে স্থানীয় লোকজন গণকবরের ব্যবস্থা করেছে। কোথাও তাও হয়নি। প্রকৃতি থেকে মাটি চাপায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সেইসব দেহ। তবে মানুষ মনে রেখেছে সেই জায়গাগুলো যেখানে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবহিনী ও রাজাকাররা নারী-পরুষ ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছে। নারীদের রেপ করার পর হত্যা করেছে। বিজয়ের বহু বছর পরও প্রবীণরা সেই জায়গাগুলো দেখে প্রজন্মকে জানিয়ে দেয় এ দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর কথা। প্রজন্মরা জানতে পারে তাদের পূর্বসূরিরা কিভাবে স্বাধীনতা এনেছে।

বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর বধ্যভূমি সংরক্ষণের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো চিহ্নিত করে স্মৃতি চিহ্ন (স্তম্ভ) বানিয়ে বর্ণনা লিখে প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগিয়ে তোলা। প্রকল্পের নাম দেয়া হয়, বধ্যভূমি সংরক্ষণ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ। দেশজুড়ে খোঁজ খবর এবং তথ্যানুসন্ধান করে প্রকল্প তৈরি করা হয়। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে যেন কোন ত্রুটি না থাকে এ জন্য কয়েক দফা যাচাই বাছাই করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও গণপূর্ত অধিদফতর দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বধ্যভূমি চিহ্নিতকরণের কাজ শুরু করার পর তা পুনরায় বাছাই করা হয়। তারপর বধ্যভূমি সংরক্ষণ সংক্রান্ত প্রস্তাবিত প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। কমিশন কয়েকটি বিষয় জানতে চেয়ে তা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। জানতে চাওয়া বিষয়গুলো পরিস্কার করে ফের তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। তারপর অনেকটা সময় চলে গেছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের আর কোন উদ্যোগ নেই। প্রকল্পটি এক পর্যায়ে পৌঁছে থেমে গেছে। আর এগোতে পারছে না।

সূত্রে জানা যায় প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রথম দফায় দেশের একশ’৭৬টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ করে সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কথা বলা হয়। এই বধ্যভূমিগুলো ফের দেখে যেগুলোতে তথ্যের ঘাটতি দেখা যায় তা সাময়িক বাদ রেখে এক শ’ ২৯টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। প্রথমে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৭১ দশমিক ৪১ কোটি টাকা। পরে সংখ্যা কমে গেলে ব্যয় রিসিডিউল করা হয় ৫২ কোটি টাকা। গণপূর্ত অধিদফতর যে বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভের সুপারিশ করে তার মধ্যে রয়েছে ঢাকায় আটটি রাজবাড়িতে তিনটি, ফরিদপুরে চারটি, নরসিংদীতে চারটি, মুন্সিগঞ্জে পাঁচটি, টাঙ্গাইলে ২টি, কিশোরগঞ্জে ১১টি, ময়মনসিংহে ৯টি, জয়পুরহাটে পাঁচটি, নওগাঁয় ৭টি, রাজশাহীতে ৩টি, নাটোরে ৬টি, বগুড়ায় ৪টি, রংপুরে ২টি, গাইবান্ধায় ৯টি, পঞ্চগড়ে চারটি, ঠাকুরগাঁয়ে চারটি, নীলফামারীতে ৬টি, চট্টগ্রামে ১১টি, সুনামগঞ্জে ২টি, যশোরে তিনটি, ঝিনাইদহে ২টি, খুলনায় ২টি, পিরোজপুরে ২টি মানিকগঞ্জ শরিয়তপুর গাজীপুর পাবনা দিনাজপুর হবিগঞ্জ বাগেরহাট ও ভোলায় একটি করে বধ্যভূমি। এইসব বধ্যভূমির পাশাপাশি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিস্থল সংরক্ষণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। চিহ্নিত করা হয় এক শ’৭৯টি সমাধিস্থল। মূল প্রকল্পের সঙ্গে এই প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি।

সরকারীভাবে চিহ্নিত এইসব বধ্যভূমির বাইরেও অনেক বধ্যভূমি অযতœ অবহেলায় দিনে দিনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। যেমন বগুড়ার শিবগঞ্জের ময়দানহাটার দাড়িদহ বধ্যভূমি। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের দিনের ভয়ঙ্কর ও বীভৎস ঘটনা জানা যায়। এলাকার সমাজসেবী ধনী গৃহস্থ বামাচরণ মজুমদার নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। পাশের গ্রামের রাজাকার হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ডেকে এনে মজুমদার পরিবারের ১১ সদস্য ও ৬ মুক্তিযোদ্ধাকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করার পর বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখে। দুই দিন পর গ্রামের মানুষ লাশগুলোর সৎকার করে। এমন আরও অনেক ঘটনা আছে। বগুড়া শহরের মধ্যেই শিববাটি এলাকায় প্রকৌশলী ও ঠিকাদার হাফিজার রহমান তার স্ত্রী ও ২ ছেলে এক ছেলের শ্বশুর ও শাশুড়িকে হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গুলো করে হত্যার পর লাশগুলো বাড়ির বাইরের আঙিনায় গর্তে পুঁতে রাখে। এই স্থানটি আজও সংরক্ষণ করা হয়নি। বগুড়ার নারুলীতে রেলগেটের কাছে ১৪ মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে রেখে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। এই স্থানটি সংরক্ষিত হয়নি। বগুড়া রেলওয়ে স্টেশনের কাছে এবং অবাঙালীদের প্রতিষ্ঠান জামিল গ্রুপের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হয়।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে