২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

থামছে না ভেজাল ॥ দেশে বছরে ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত

থামছে না ভেজাল ॥ দেশে বছরে ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত
  • ফুটপাথ থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল-রেস্তোরাঁ;###;বা নামীদামী ব্র্যান্ডের পণ্যও ভেজালমুক্ত নয়

শাহীন রহমান ॥ খাদ্যে ভেজাল, খাদ্যে বিষক্রিয়ার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি এর ব্যাপ্তি যে হারে বাড়ছে তাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। দেশী-আন্তর্জাতিক সব গবেষণায় দেশে খাবারের বিষক্রিয়ার বিষয়টি বার বার উঠে আসছে। ফুটপাথ থেকে শুরু করে অভিজাত হোটেল রেস্টুরেন্ট বা নামীদামী ব্রান্ডের পণ্যও এখন ভেজালমুক্ত নয়। গবেষণা থেকে শুরু করে ভেজালবিরোধী অভিযানে এসব প্রমাণ মিলছে। ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজালের কারণে বর্তমানে মানবদেহে ক্যান্সারের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা আগে দেখা যেত না। তারা বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে এসব ক্যান্সারের মূল কারণ খাদ্যে ভেজাল মেশানো, প্রিজারভেটিভ ও বিভিন্ন ধরনের রঙের ব্যবহার।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আমিরুল মোর্শেদ খসরু জনকণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে ক্যান্সারের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে, যা আগে কখনও দেখা যেত না। তিনি বলেন, এসব ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রথমে ডায়রিয়া বা বমিভাব বেশি দেখা দেয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারে রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ভেজাল খাদ্যের কারণে খাদ্যনালীতে ক্যান্সার, লিভার বা ব্লাড ক্যান্সার, মেয়েদের জরায়ুতে ক্যান্সারের প্রবণতা অনেক বাড়ছে, যা আগে খুব কম দেখা মিলত। চিকিৎসায় প্রমাণিত হয়েছে এগুলোর মূল কারণ হচ্ছে খাদ্যে ভেজাল। তিনি বলেন, শিশুদের খাবার হিসেবে যা দেয়া হচ্ছে তাকে বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত বলা যাবে না। এর প্রভাব শুধু শিশুদের নয়, সব মানুষের ওপর পড়ছে কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না। যখন ধরা পড়ছে তখন এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার কোন উপায় থাকে না।

দেশে দূষিত খাবারের ব্যাপ্তি কী পরিমাণে বাড়ছে পরিসংখ্যানেই তার প্রমাণ মিলছে। এছাড়া একাধিক গবেষণায় বারবার খাবারের ভেজালের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছেÑ দূষিত খাবারের কারণে সারাবিশ্বে প্রতিবছর ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মৃত্যু হচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার জনের। গত বৃহস্পতিবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য মিলেছে। এতে দেখানো হয়েছেÑ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে প্রতিবছর দূষিত খাবার খেয়ে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। আর অসুস্থ হয় ১৫ কোটি মানুষ। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি ১০ শিশুর ৩ জনই ডায়রিয়ায় ভোগে। রোগটি এ অঞ্চলের শিশুমৃত্যুর জন্য দায়ী সবচেয়ে ভয়াবহ রোগগুলোর একটি। ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, পরজীবী, বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান ইত্যাদির মাধ্যমে খাবার দূষিত হয়। সেই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে বমিভাব, ডায়রিয়ার মতো প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হয়। আর দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হিসেবে ক্যান্সার, কিডনি ও যকৃৎ বিকল হয়। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর বিভিন্ন অসুখ হয়। কম বয়সী শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রবীণরা খাবারে দূষণের শিকার হন সবচেয়ে বেশি। টাইফয়েড জ্বর এবং হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের আক্রমণে বিশ্বে যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার অর্ধেকের বেশি ঘটনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়Ñ নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে অনিরাপদ খাবারের ছড়াছড়ি বেশি। সেখানে রান্নাবান্নার কাজে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয় না। তাই খাবারবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও ওই অঞ্চলে বেশি। এ বিষয়ে পর্যাপ্ত আইন এবং সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার না থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।

শুধু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নয়, এ ধরনের ভয়াবহতা আরও একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে। কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলেই এ রোগের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ দেশে ক্যান্সার রোগীদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং সরকারী হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ২০১২- ২০১৩ সময়কালে ২ লাখ ৩২ হাজার ৪৫৬ থেকে বেড়ে ৪ লাখ ৭৬ হাজার ২৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য মতে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ার ফলে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় লিভার ও কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য বিষযুক্ত খাদ্যকে দায়ী করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্ককে বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞের মতে, হাসপাতালের রোগীদের অর্ধেকই বাংলাদেশের। এদের মধ্যে বেশির ভাগ কিডনি, লিভার ও প্রজনন সমস্যায় ভুগছে।

এ বছর জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছেÑ রাজধানী ঢাকার পথখাবারের ৫৫ শতাংশে নানা ধরনের জীবাণু রয়েছে। এসব খাবার বিক্রেতাদের ৮৮ শতাংশের হাতে থাকে জীবাণু। এতে উল্লেখ করা হয়Ñ ঢাকা শহরের রাস্তাগুলোতে প্রায় দুই লাখ বিক্রেতা নানা ধরনের খাবার বিক্রি করেন। তাদের বিক্রির খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে আছেÑ শুকনো, তেলে ভাজা, রান্না করা, আগুনে সেদ্ধ-পোড়ানো, তেলে মাখানো ইত্যাদি খাবার। গবেষণায় বলা হয়Ñ এসব খাবার সুস্বাদু হওয়ায় কোন প্রকার যাচাই না করে খেয়ে থাকে লোকজন। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছেÑ চা, ঝালমুড়ি, পিঠা, বাদাম, ছোলা, চটপটি, ফুচকা, চাটনি, আচার, মিষ্টি, ডিম (ভাজা বা সেদ্ধ), রুটি, পরোটা, পুরি, চিপস, মোয়া, গজা, শিঙ্গারা, সমুচা, পেঁয়াজু, শরবত, ফলের রস, আখের রস, হালিম, আইসক্রিম, নুডলস, পোলাও, তেহারি, খিচুড়ি, ভাত, শিক কাবাব ইত্যাদি।

সরেজমিন ভেজালবিরোধী অভিযানে ও বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠনের সমীক্ষায় ভেজালে ভয়াবহতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিষাক্ত সাইক্লোমেট দিয়ে তৈরি হচ্ছে টোস্ট বিস্কুট, বিষাক্ত ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে পাকানো হয় কলা, আনারস। রুটি, বিস্কুট, সেমাই তৈরি করা হচ্ছে বিষাক্ত উপকরণ দিয়ে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে। ফরমালিন দেয়া হচ্ছে মাছ-সবজিতে, মবিল দিয়ে ভাজা হচ্ছে চানাচুর, হাইড্রোজ মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে মুড়ি ও জিলাপি। এছাড়া ক্ষতিকর রং দেয়া ডাল, ডালডা ও অপরিশোধিত পামঅয়েলমিশ্রিত সয়াবিন তেল, ভেজাল দেয়া সরিষার তেল, রঙ ও ভেজালমিশ্রিত ঘি, পামঅয়েলমিশ্রিত কনডেন্সড মিল্ক, ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি প্যাকেটজাত জুস, মিনারেল ওয়াটার, মরা মুরগির মাংসও অবাধে বিক্রি হয় রাজধানীতে। ভেজালের এসব উপকরণসহ অভিযানে হাতেনাতে ধরা পড়েছে ব্যবসায়ীরা। এরপরও ভেজালের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

এখানেই শেষ নয়, টেক্সটাইল রং মেশানো হচ্ছে বেকারি পণ্য, জুসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে। তেল, ঘি, আইসক্রিম, মিষ্টি, দই, ললিপপ, চকোলেট, কেক ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্যেও ক্ষতিকর রং, ফ্লেভার ব্যবহার করা হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের ব্যবহার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরি, হোটেল রেস্টুরেন্টে বাসি, মরা মুরগি, গরু, মহিষ, ছাগলের গোশত খাওয়ানোর ঘটনাও ঘটছে। আবার মিনারেল ওয়াটারের নামে ওয়াসার পানি বোতলজাত করে বাজারজাতকরণের ঘটনাও ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবদেহের বৃদ্ধি এবং পরিচালনার জন্য খাদ্য আবশ্যকীয় উপাদান। খাদ্য দেহের শক্তি বৃদ্ধি করে। তবে এ খাদ্য হওয়া চাই নিরাপদ ও মানসম্পন্ন। পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবহানের মতে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণের জন্য ফসল উৎপাদনের শুরু থেকে খাবার গ্রহণ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে গুণগতমান রক্ষা করা একান্ত আবশ্যক। কারণ যে কোন স্তরে খাদ্যের গুণগতমান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। খাদ্য যে সকল প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করা হয় সেখান থেকে কোন প্রকার দূষণ বিষক্রিয়া আক্রান্ত না হয় তারও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। খাদ্যে অনাকাক্সিক্ষত ও অতিমাত্রার কেমিক্যাল ব্যবহার করলে তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী ঢাকায় ভেজালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছেন ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ আল আমিন। তিনি বলেন, এতসবের পরও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। অভিযানে দেখা গেছে, নামীদামী ব্রান্ডের পণ্য নোংরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হচ্ছে। বারবার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। এছাড়া নামীদামী হোটেলগুলো খাদ্য তৈরিপ্রক্রিয়া অনেক অস্বাস্থ্যকর নোংরা বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিএসটিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার অভিযান চালানো হয়েছে। তারপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। তিনি বলেন, দেশী খাদ্যে যেমন ভেজাল রয়েছে, তেমনি বিদেশ থেকে আসা বিভিন্ন খাদ্যপণ্যেও ভেজাল পাওয়া গেছে। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আপেল আঙ্গুরসহ অনেক উন্নতমানের ফল বিদেশ থেকে আসতে অনেক সময় লাগে। সেগুলো আবার মাসের পর মাস দোকানে রেখে বিক্রি করা হয়। অথচ এগুলো কখনও পচে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবার উৎপাদন ও সরবরাহকারীদের পাশাপাশি ভোক্তাদেরও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য নিরাপদ খাবারের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। আর সরকারকে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।