২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

১৬ ডিসেম্বর ভারত থেকে আরও ১০০ মেও বিদ্যুত আসছে

  • দুই প্রধানমন্ত্রী গ্রিডের উদ্বোধন করবেন

রশিদ মামুন ॥ এবার ভারতের ত্রিপুরা বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে আরও ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত যোগ হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৬ ডিসেম্বর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিতীয় আন্তঃসংযোগকারী গ্রিডের উদ্বোধন করবেন। গত মাসে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ভারত-বাংলাদেশ সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের বিজয় দিবসে নতুন গ্রিডে বিদ্যুত সঞ্চালন শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। বিদ্যুত ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) না হওয়া এবং ভারতীয় অংশে গ্রিড লাইন নির্মাণের শতভাগ কাজ শেষ না হওয়ায় কোন পক্ষই এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশ নিজের নদীতে বাঁধ দিয়ে ত্রিপুরার পালাটান বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের ভারি যন্ত্রাংশ ভারতে পৌঁছাতে সহায়তা করে। ভারত সরকার তখনই ওই প্রকল্প থেকে কৃতজ্ঞতা আর সৌহার্দ্যরে নিদর্শন হিসেবে বাংলাদেশকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে কংগ্রেস সরকারের শেষ সময়ে এসে বিদ্যুত কেন্দ্রটি উৎপাদনে গেলেও বাংলাদেশকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত দেয়ার বিষয়টি আলোচনার টেবিল থেকে অনেকটা হারিয়ে যায়। এমনকি বিদ্যুত কেন্দ্রটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও এ প্রসঙ্গটি তোলা হয়নি। তবে ত্রিপুরা এ বিষয়ে ইতিবাচক ছিল। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘কৃতজ্ঞতাস্বরূপ’ বাংলাদেশকে কেন্দ্রটি থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত দেয়া হবে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত না মেলায় বিষয়টি ঝুলে যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ-ভারত বিদ্যুত খাতের যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকে বিষয়টি আবারও তোলা হয়। এর পর কেন্দ্রীয় সরকারে ইতিবাচক মনোভাবের মধ্য দিয়ে বছরের গোড়ার দিকে গ্রিড লাইন নির্মাণের কাজ শুরু করে উভয় দেশ।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) বলছে বাংলাদেশ অংশের সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আর ভারতীয় অংশে কাজের কিছুটা বাকি রয়েছে। যা আগামী ১০ দিনের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ১৬ ডিসেম্বর ত্রিপুরার বিদ্যুত আসার কথাও জনকণ্ঠকে জানান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম আল বেরুনী।

তিনি বলেন, আমাদের অংশের কাজ একেবারেই শেষ পর্যায়ে দু-একটি জায়গায় সামান্য কিছু কাজ বাকি আছে। তবে ভারতীয় অংশে কিছুটা কাজ বাকি রয়েছে। কিন্তু তারা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লাইন নির্মাণ করে বলে দ্রুত কাজ শেষ করতে পারবে। ডিসেম্বরের শুরুতেই তারা আমাদের জানিয়েছে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তাদের অংশের কাজ শেষ করতে পারবে। আমরা তাদের ১৬ ডিসেম্বরের আগে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শেষ করার অনুরোধ করেছি। তারা সম্মতও হয়েছে। এখন ভারতীয় অংশের লাইনের কাজ শেষ হলেই সঞ্চালন ব্যবস্থা শুরু করা যেতে পারে। ১৬ ডিসেম্বর সঞ্চালন শুরুর বিষয়ে আলোচনা হলেও পিজিসিবিকে সরকারের তরফ থেক আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি বলে জানান তিনি।

বিদ্যুত বিভাগ সূত্র বলছে সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত দুই দেশের বিদ্যুত সচিব পর্যায়ের বৈঠকে ১৬ ডেসেম্বরে বিদ্যুত সঞ্চালনের বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে ত্রিপুরা থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম কি হবে তাও আলোচনা হয়। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কিছুটা মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রস্তাবিত দরের চেয়ে ভারত এক্ষেত্রে বেশি অর্থ দাবি করছে। ভারতের দাবি মেনে নিলে আগে ভারত বাংলাদেশে যে বিদ্যুত বিক্রি করছে তার থেকেও কিছুটা বেশিই পড়বে এই দাম।

এখন ভারত থেকে আনা বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি গড় মূল্য পড়ছে চার টাকা। কিন্তু ত্রিপুরার বিদ্যুতের প্রতি কিলোওয়াট/ঘণ্টা মূল্য হিসেবে ৬ টাকা ৩৪ পয়সা (আট সেন্ট) চাওয়া হচ্ছে। গত গত ২৭ ও ২৮ নবেম্বর সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতি ইউনিটের জন্য ৬ সেন্ট (৪ টাকা ৭৫ পয়সা) প্রস্তাবের বিপরীতে ভারত ইউনিট প্রতি ৯ সেন্ট (৭ টাকা ১৩ পয়সা) দাবি করে। পরে ভারত এক সেন্ট ছাড় দিতে সম্মত হয়। বাংলাদেশ-ভারত উভয়পক্ষ নিজেদের অবস্থানে অটল থাকলে বৈঠকে বিদ্যুত ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মতৈক্য হয়নি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিদ্যুত বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. আহমদ কায়কাউস জনকণ্ঠকে বলেন, এখনও পিপিএ চুড়ান্ত হয়নি। গত মাসে ভারত বাংলাদেশ সচিব পর্যায়ের বৈঠকে কোন সিদ্ধান্তে পৌছানো না গেলেও পিডিবি আলোচনার মাধ্যমে পিপিএ করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।

ত্রিপুরা থেকে বিদ্যুত আনতে কুমিল্লা ও ত্রিপুরা অংশে মোট ৫৪ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন করেছে উভয় দেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে ২৮ কিলোমিটার এবং ভারত অংশে ২৬ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন এই গ্রিড লাইনটি ত্রিপুরার সুরজমনিনগর থেকে বাংলাদেশের কুমিল্লাকে সংযুক্ত করবে।

বাংলাদেশ অংশের ৪০০ কেভি ক্ষমতার আন্তঃদেশীয় ২৮ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন করবে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিঃ (পিজিসিবি)। ‘ত্রিপুরা (ভারত) কুমিল্লা দক্ষিণ (বাংলাদেশ) গ্রিড ইন্টারকানেকশন প্রজেক্ট’ প্রকল্পের আওতায় এই সঞ্চালন লাইন করা হয়। আর ভারতীয় অংশের লাইন নির্মাণের দায়িত্ব তাদের। এ ছাড়া কুমিল্লা (দক্ষিণ) সাবস্টেশন থেকে কুমিল্লা (উত্তর) সাবস্টেশন পর্যন্ত ১৩২ কেভি ডাবল সার্কিটের আরও ১৯ কিলোমিটার লাইন নির্মাণ করা হবে।

এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর থেকে বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা হয়ে প্রতিদিন ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের সরকারী খাত থেকে প্রতিদিন ২৫০ মেগাওয়াট বেসরকারী খাত থেকে আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত আসছে। ভারত সরকারের কাছ থেকে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত ক্রয়ের আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে ভারত সরকারের অনুমোদনের পর ভারত বাংলাদেশ ব্যাক টু ব্যাক সাবস্টেশনের অনুরূপ আরও একটি সাবস্টেশন নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তবে গ্রিড লাইন নতুন করে আর নির্মাণ করতে হবে না। কারণ ভেড়ামারা-বহরামপুর গ্রিড লাইন এক হাজার মেগাওয়াট সঞ্চালন ক্ষমতার। বাংলাদেশ আশা করছে ২০১৭ এর জুনে ওই বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে। আর এই বিদ্যুতের পুরোটাই ভারতের বেসরকারী খাত থেকে বাংলাদেশকে কিনতে হবে। যেখানে দাম বর্তমাণের তুলনায় বেশি পড়বে বলেও মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।