২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হেমন্তের শেষভাগেই শীতের আমেজ রাজধানীতে

হেমন্তের শেষভাগেই শীতের আমেজ  রাজধানীতে
  • শপিংমল, মার্কেট ও ফুটপাথে শীতবস্ত্র বেচাকেনা ॥ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামে শীতের তীব্রতা

নিখিল মানখিন ॥ কাগজে কলমে চলছে হেমন্তকাল। আর দেড় সপ্তাহ পরই শুরু হবে শীতকাল। তবে দেশে শীতের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত রাজধানীতেও অনুভূত হচ্ছে হালকা শীত। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের গ্রাম এলাকায় শীতের তীব্রতা যেন একটু বেশি। রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় দেশের সর্বত্র ভোরের দিকে হালকা কুয়াশা পড়ছে। গ্রামাঞ্চলের নদীর কিনারায়, বিস্তীর্ণ বিল ও বনের ধারে কুয়াশার মাত্রা বেড়েই চলেছে। শুক্রবার দিনভর রাজধানীর আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। রাজধানীর নামিদামি শপিংমল, মার্কেট ও ফুটপাতগুলোতে শীতবস্ত্র বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে দেশের সর্বোচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রা অনেক হ্রাস পেয়েছে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা আরও দু’ডিগ্রী সেলসিয়াস হ্রাস পেলেই দেশে শুরু হবে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। ডিসেম্বর বয়ে যাবে শৈত্যপ্রবাহ।

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, ডিসেম্বর মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ মাসে রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাবে। শেষরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের উত্তরাঞ্চল ও নদ-নদী অববাহিকায় মাঝারি অথবা ঘন কুয়াশা এবং অন্যত্র হালকা অথবা মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। তবে সারাদেশে একটানা দুই থেকে তিন দিন ঘন অথবা মাঝারি ধরনের কুয়াশা পড়তে পারে। ডিসেম্বর মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ মাসে রাতের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পারে। দেশের প্রধান নদ-নদীসমূহে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে। চলতি মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ঢাকা বিভাগে ১০ মিলিমিটার, চট্টগ্রামে ৯ মিমি, সিলেট ১০ মিমি, রাজশাহীতে ১১ মিমি, রংপুরে ৮ মিমি, খুলনায় ১০ মিমি ও বরিশালে ৯ মিলিমিটার হতে পারে।

এদিকে, বিকেল না গড়াতেই রাজধানীর পাড়া-মহল্লা ও ফুটপাথে শীতের পিঠার পসরা সাজিয়ে বসছেন দোকানিরা। বেলা গড়ালেই মলিন আবছা অন্ধকার ঘনিয়ে আসে এখন। খুব তাড়াতাড়ি নেমে আসে সন্ধ্যা। আকাশে জমে ওঠে হালকা কুয়াশার স্তর। গা শিরশির করা হিমেল স্পর্শ বুলিয়ে দেয় মৃদু হাওয়া। এসবই জানিয়ে দিচ্ছে শীতের উপস্থিতি। অগ্রহায়ণ মাসের ২১ দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে আজ শনিবার।

দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোতে, বিশেষত উত্তরাঞ্চলে এখন বেশ শীত। বরাবরই রাজধানীতে শীত আসে একটু দেরিতে। তবে এবার সন্ধ্যার পর হালকা শীত অনুভূত হচ্ছে। এই হালকা শীতে এখনও গরম কাপড়চোপড় দেখা যাচ্ছে না নগরবাসীর গায়ে। কোট-জাম্পার-চাদরের বাক্সবন্দী দশা ঘুচতে শুরু করেছে, তবে লেপ-কম্বলের আরও অন্তত সপ্তাহ দুয়েক আটক থাকতে হবে। সাধারণত ডিসেম্বরের আধাআধি না যাওয়া পর্যন্ত ঢাকার শীত লোকজনকে লেপ মুড়ি দিতে বাধ্য করার মতো শক্তিমান হয়ে ওঠে না। আবার ফেব্রুয়াারি শুরু হতে না হতেই হাওয়া বদলের রেশ। দাপুটে হোক বা দুর্বল, রাজধানীতে কিন্তু শীত নিয়ে রকমারি আয়োজনের কোনও ঘাটতি থাকে না। হেমন্তের শুরু থেকেই পাড়া-মহল্লা, বাজার, অফিস এলাকার ফুটপাত দিয়ে বসে গেছে পিঠা তৈরির দোকান। বিকেল থেকে ভাঁপা, চিতই, তেলের পিঠা বিক্রি হচ্ছে দেদার। কাঁচাবাজারে শিম, মুলা, কপি, বরবটি, টমেটোসহ শীতের সবজিগুলো এসেছে শীত আসার আগেই। খেজুরের রস দুর্লভ, তবে চলে এসেছে নতুন পাটালি। রসনায় শীতের স্বাদ পাওয়া যাচ্ছে পুরোপুরি। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পড়েছে শীতের সাড়া। নানা ধরনের আয়োজনে উৎসবমুখর হয়ে উঠছে ঢাকার মঞ্চ-মিলনায়তনগুলো। অগ্রহায়ণের পাকা ফসল কৃষিনির্ভর আমাদের জনজীবনে নিয়ে আসে সচ্ছলতা। শীতকালটি তাই আমাদের দেশে আনন্দময়, উৎসবমুখর হয়ে আছে আবহমানকাল থেকে।

আবহাওয়াবিদরা জানান, ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে। তবে এবার শীতের তীব্রতা কেমন হতে পারে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। হিমালয় অঞ্চল থেকে আগত শীতল বায়ু উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এ বায়ু সর্বপ্রথম উত্তরাঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে বলে দেশের উত্তর দিকে সবার আগে শীতের তীব্রতা দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের দেশে মূলত ডিসেম্বর মাসে শীত বেশি অনুভূত হয়। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতের আমেজ থাকে। এর আগে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে থাকে বলে শীত অনুভূত হয়। মৌসুম পরিবর্তনের সময় সাগর অস্থিতিশীল থাকে। আর এ সময়ে সাগরে বিভিন্ন সময়ে লঘুচাপ ও নি¤œচাপ সৃষ্টি হতে পারে। বছরের এ সময়ের নি¤œচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। আমাদের দেশে বছরের এপ্রিল-মে ও অক্টোবর-নবেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সাধারণত বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ বছর নবেম্বর মাসে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস থাকলেও তা এখন পর্যন্ত সৃষ্টি হয়নি।

রাজধানীর ফুটপাথ থেকে শুরু করে শপিংমল ও মার্কেটগুলোতে সাজানো বস্ত্রগুলোও শীতের উপস্থিতির সাক্ষ্য দিচ্ছে। জমজমাট হতে শুরু করেছে শীতবস্ত্রের নামিদামি শপিংমল, মার্কেট ও ফুটপাথগুলো। মানুষ ছুটছেন মোটা কাপড় ও লেপ তোশকের দোকানে। সকাল ৮টা পর্যন্ত কুয়াশায় ঢেকে থাকছে আকাশ। সূর্য দেরিতে ওঠায় দিনের প্রথম অংশে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলছে প্রাইভেটকার, বাস ও দূরপাল্লার গাড়ি। ভোর রাতে শীতের তীব্রতা একটু বেশি থাকায় কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। সকালবেলা যারা নানা কারণে বাইরে বের হচ্ছেন গায়ে মোটা কাপড় ও চাদর জড়িয়ে নিচ্ছেন।

এদিকে আবহাওয়া পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে জ্বও, ঠা-া, মাথাব্যথা, সর্দি-কাশিসহ শীতজনিত বিভিন্ন অসুখ-বিসুখও বাড়ছে। অবস্থা সম্পন্ন ও প্রতিপত্তিশালীরা ছুটছেন নামিদামি মার্কেট ও শপিংমলে আর নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ ছুটছেন ফুটপাত ও অপেক্ষাকৃত কম দামের মার্কেটে। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা লেপ তোশকের। তাই অন্যান্য সময়ের চেয়ে এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন লেপ-তোশক প্রস্তুতকারী ও দোকান মালিকরা। তাদের কাছে লেপ-তোশকের বায়নার সংখ্যা বাড়ছে। আর অনেকেই রেডিমেড মালই কিনে নিচ্ছেন পরিবারের জন্য।

রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের এক দোকানী বলেন, মার্কেট এখনও জমে ওঠেনি। তবে আস্তে আস্তে শীত বেড়ে যাচ্ছে বলে আমরা আগে থেকেই দোকানে শীতের কাপড় তুলেছি। ক্রেতা কম, তবে দুয়েক দিনের মধ্যেই বেঁচাকেনা জমবে বলে আশাবাদী তিনি। গুলিস্তানের এক ফুটপাতের দোকানদার মোঃ ইলিয়াস বলেন, দোকানে শীতের কাপড়-চোপড় তুলেছি। অনেকেই শীতের কাপড়ও কিনেছেন। সামনের সপ্তাহেই জমজমাট ব্যবসা হবে বলে তিনি জানান।

পল্টনের ফুটপাতে আগত খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা হযরত আলী জানান, তিনি তার দুই ছেলের জন্য জ্যাকেট কিনতে এসেছেন। তবে সব দোকান এখনও খোলেনি বলে দাম যেমন বেশি তেমনি ভালমানের পোশাকও পাচ্ছেন না বলে তিনি জানান। মগবাজার এলাকার এক লেপ-তোশক ব্যবসায়ী জানান, দোকানে তোশকের চাহিদা বেড়েছে। অনেকেই লেপ-তোশকের বায়না দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, সারাবছরই লেপ-তোশকের চাহিদা থাকে। তবে শীতকালে চাহিদা অনেক বাড়ে। এখন পুরোপুরি শীত পড়েনি। তবে যতই দিন যাচ্ছে লেপ-তোশকের চাহিদা ততই বাড়ছে।