২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহাস্থানগড়ে দৃষ্টিনন্দন কার্যক্রম, পর্যটক আকর্ষণের উদ্যোগ

মহাস্থানগড়ে দৃষ্টিনন্দন কার্যক্রম, পর্যটক আকর্ষণের উদ্যোগ
  • দুয়ারে পর্যটন বর্ষ

সমুদ্র হক

সারা বছর পর্যটক আসবে বাংলাদেশে। ইতোমধ্যে ২০১৬ সালকে পর্যটনবর্ষ ঘোষণা করা হয়েছে। তার আগেই দেশের প্রাচীন নগরী বগুড়ার মহাস্থানগড়ে পর্যটক আর্কষণে দৃষ্টিনন্দন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রম অনেক আগেই হাতে নেয়া। বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরকে পর্যটন ও অবকাশ কেন্দ্রে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয় বছর দশেক আগে। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে গত বছর (২০১৪) এপ্রিল মাসে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে সাউথ এশিয়া ট্যুরিজম ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় মহাস্থানগড়ে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পর্যটকদের আনন্দদায়ক ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

এমনিতেই মহাস্থানগড় সংরক্ষণে ও ইতিহাস উদ্ধারে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর তাদের খনন কাজসহ নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তার ওপর সামনেই পর্যটনবর্ষ চলে আসায় পর্যটক আকর্ষণে তারাও বাড়তি কাজ হাতে নিয়েছে। প্রাচীন যে স্থাপনার দেয়াল ভেঙ্গে গেছে কোথাও নষ্ট হয়ে গেছে তা পুনরায় মেরামত করা হচ্ছে সেদিনের নক্সায়।

এ জন্য প্রাচীন ইটের আদলে ও নকশায় ইটভাঁটি থেকে ইট বানিয়ে নেয়া হচ্ছে। প্রতœতত্ত্ব¡ অধিদফতরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানালেন, প্রতœ নিদর্শন সংরক্ষণে বিশ্বে এ ধরনের কাজ স্বীকৃত। মহাস্থানগড়ে প্রতœ সম্পদ সংস্কারে প্রাচীন ইট বানিয়ে তা মূল স্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত করে সংরক্ষণ ও পর্যটক আকর্ষণে দৃষ্টিনন্দন করতে সহযোগিতা দিচ্ছে শ্রীলঙ্কার প্রতœতত্ত্ব¡ বিভাগ। শ্রীলঙ্কার কনজারভেশন আর্কিটেক্ট নিলান কোরে তার সহযোগীদের নিয়ে শ্রীলঙ্কার মেসন (রাজমিস্ত্রির) কাজগুলো করছে। বিশ্বের অনেক দেশে শ্রীলঙ্কা এই ধরনের কাজ করে দেয় এবং এ কাজে তারা অভিজ্ঞ। ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক টেন্ডারে শ্রীলঙ্কা অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রতœ সংরক্ষণে এই কাজ পেয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স প্রতœতত্ত্ব বিভাগ যৌথভাবে মহাস্থানগড়ে প্রতিবছর খনন কাজ করছে। এ বছর নবেম্বরের শেষে ১৯তম খনন কাজের ফ্রান্স তার অংশের কাজ শেষ করেছে। বাংলাদেশ প্রতœ অধিদফতরের কাজ চলমান। এবারের খননে মহাস্থান দুর্গনগরীর মধ্যভাগে লইয়েরকুড়ি মাঠ নামে পরিচিত ভিটার উত্তর কোণে বৈরাগীর ভিটার দক্ষিণ অংশে খননকালে নর্দার্ন ব্ল্যাক পলিশ্ড ওয়্যার (এনবিপিডাব্লিউ) নামের চকচকে কালো মৃৎপাত্রের টুকরো, ইটের নির্মিত দেয়াল, নক্সা করা ইট, টালি, কাচের গুটিকা, মাছ ধরার জালে ব্যবহৃত পোড়া মাটির বল ফুলাঙ্কিত পিরামিড আকারের ইট এবং নক্সা করা ইটসহ নানা নিদর্শন মিলেছে। আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বললেন, চলমান এই কাজের মধ্যেই ২০১৬ সাল শুরু হচ্ছে। পর্যটনবর্ষ হওয়ায় দেশে বিদেশের পর্যটকরা যাতে প্রাচীন এই নগরীতে ভ্রমণে এসে অভিজ্ঞতা অর্জন করে বাংলাদেশ সম্পর্কে জেনে পর্যটক দূত হয়ে ফিরে গিয়ে প্রচার করে সেদিকে দৃষ্টি রাখা হচ্ছে। দেশে প্রতœতাত্ত্বিক স্থানে পর্যটন ও অবকাশ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি উত্থাপিত হয় বছরদশেক আগে একটি আঞ্চলিক বৈঠকে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বাংলাদেশ ও নেপালের ঐতিহ্যবাহী প্রতœতাত্ত্বিক স্থানগুলো কেন্দ্র করে হেরিটেজ হাইওয়ে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। এরই আওতায় চার প্রতœতাত্ত্বিক স্থান বগুড়ার মহাস্থানগড় নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো স্থাপনার সঙ্গে পর্যটকদের জন্য অবকাশ কেন্দ্র বাংলো বাড়ি, রেস্তরাঁ, রাস্তাঘাট-ফুটপাত নির্মিত হচ্ছে। এ জন্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ কোটি টাকা। যার মধ্যে এডিবি অর্থায়ন করছে ১২ কোটি টাকা। বাকি ৩ কোটি টাকা সরকরী অর্থায়ন। মহাস্থানগড়ে যে কাজগুলো হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে- সুভেনির শপ (দৃষ্টিনন্দন শপিংমল), প্রবেশ কমপ্লেক্স, দেশীয় খাদ্যের আয়োজন, কাঠের নির্মিত শৈল্পিক স্থাপনা, নক্সী সড়ক, ঢালু টিলা, পিকনিক স্পট, নানা ধরনের সেডের নিচে বসবার জয়গা, প্রাচীন দিনের ঐতিহ্যের আলোকে অবকাঠামো, জাদুঘর সৌন্দর্যকরণ ইত্যাদি।

দেশের প্রাচীন নগরী মহাস্থানগড় পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুন্ড্রনগর। মৌর্য গুপ্ত পাল সেন সুঙ্গাসহ কয়েকটি কালের অস্তিত্ব মিলেছে মহাস্থানগড়ে। একদার এই দুর্গনগরীর নিচে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের খেরোখাতার স্বর্ণালী অধ্যায়। খননে সবই উদঘাটিত হচ্ছে। মহাস্থানগড়ের সামন্য দক্ষিণে বেহুলার বাসর নামে পরিচিত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মঠ, কিছুটা উত্তরে ভাসু বিহার বৌদ্ধদের উচ্চতর বিদ্যাপীঠ, প্রাচীন মন্দির, গড়ের কাছেই উদ্্ঘাটিত পরশুরামের প্যালেস, শুঁড়ি পথের মন্দির, বানারসি বিলের এ্যাংকরসহ খননে বের হয়ে আসছে ইতিহাস। সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেন যখন অসুস্থ ছিলেন তখন এই গড় ছিল অরক্ষিত। তারপর কালের বিবর্তনে সভ্যতার দুয়ারগুলো খুলে যায়। পর্যটনবর্ষে মহাস্থানগড় দেশে দেশে মানুষে মানুষে মিলন ঘটিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে দূর বহুদূর...।

নির্বাচিত সংবাদ