২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ময়মনসিংহে ইসলামী ব্যাংক ভবন বধ্যভূমির ওপর

ময়মনসিংহে ইসলামী ব্যাংক ভবন বধ্যভূমির ওপর
  • স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও চিহ্নিত হয়নি ছোট বাজার বধ্যভূমি

বাবুল হোসেন, ময়মনসিংহ থেকে ॥ একাত্তরে ময়মনসিংহের ছোট বাজার কুয়ার বধ্যভূমিটি স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছরেও চিহ্নিত করা হয়নি। উদ্যোগ নেয়া হয়নি সংরক্ষণের। ফলে বিনা বাধায় আলোচিত এ বধ্যভূমি মুছে ফেলে তার ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংক ভবন! এ নিয়ে হতাশ ও ক্ষুব্ধ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা। ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ধর্মমন্ত্রী আলহাজ অধ্যক্ষ মতিউর রহমান এ বিষয়ে জনকণ্ঠকে জানান, বধ্যভূমিটি চিহ্নিত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হবে। ইতোমধ্যে শহরের ডাকবাংলোর পেছনে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্ট হাউসের পেছনে, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্কের বধ্যভূমিসহ জেলার মুক্তাগাছার মানকোন বিনোদবাড়ি, গফরগাঁওয়ের চরআলগী, ফুলপুরের সরচাপুর বধ্যভূমি চিহ্নিত করে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।

একাত্তরে ময়মনসিংহ শহরের ছোটবাজার কুয়ার ভেতরে মিলেছিল অসংখ্য নারী পুরুষ ও শিশুর পচা ও অর্ধগলিত লাশ। রাজাকার, আলবদর ও অবাঙালী বিহারী কিলাররা মুক্তিকামী বাঙালীদের ধরে এনে হত্যার পর লাশ ফেলে দিত ছোটবাজারের এই কুয়ার ভেতরে। একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত হলে মুক্তিযোদ্ধা জনতা যখন শহরজুড়ে হারানো স্বজনদের খুঁজতে বের হয় তখনই সন্ধান মেলে কুয়ার ভেতরে অসংখ্য লাশ স্তূপাকারে পড়ে থাকা এ বধ্যভূমিটির। অথচ সংরক্ষণ না করে ভয়াল স্মৃতির সেই কুয়ার চিহ্নহ্নটি মুছে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাকের দাবি, বধ্যভূমির সেই কুয়ার ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংক ভবন। গত ১৯৯৬Ñ২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ আমলে এ বধ্যভূমির ওপর সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিট কমান্ড-ময়মনসিংহ থেকে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কাছে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণে আবেদন জানান হয়েছিল। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জায়গাটি উদ্ধারের দাবিতে শহরে মানববন্ধনও করেছেন। কিন্তু তারপরও এ নিয়ে কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। গত এক/এগারোর সময় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে তথ্য প্রমাণও সংগ্রহ করা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটিও আর আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিট কমান্ডের সাবেক কমান্ডার ও ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাডভোকেট নাজিম উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেন, শহরের ছোটবাজারে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক, ময়মনসিংহ শাখা ভবনটির বর্তমান স্থলেই ছিল একাত্তরের সেই বধ্যভূমি। একাত্তরে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদররা বাসা থেকে হাসপাতালে যাওয়ার পথে শহরের গাঙিনাপাড় এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যায় রতন খন্দকারকে। আলবদরদের আস্তানা শহরের ডাকবাংলো, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাকসেনাদের নানান আস্তানায় খুঁজেও ভাইয়ের কোন সন্ধান পাননি সহোদরা শেফালী খন্দকার। একাত্তরে ১০ ডিসেম্বরে ময়মনসিংহ মুক্ত হলে মুক্তিযোদ্ধা জনতার সঙ্গে সেদিন শেফালী খন্দকারও ভাই রতনের লাশ খুঁজতে বের হয়েছিলেন। শেফালী খন্দকার জানান, ডাকবাংলা ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেস্টহাউসে ভাইয়ের কোন লাশ না পেয়ে শহরের ছোটবাজারের কুয়া দেখতে গিয়েছিলাম। কুয়ার ভেতরে নারী পুরুষের গলিত অর্ধগলিত পচা অসংখ্য লাশ দেখা গেলেও ভাইয়ের লাশ পাইনি। কুয়ার চারপাশজুড়ে তখনও ছোপ ছোপ রক্তের দাগ লেগেছিল। ব্লাউস, পেটিকোট ও শাড়ি ছিল স্তূপাকারে কুয়ার ভেতরে। ময়মনসিংহ সদরের চরঈশ্বরদিয়া গ্রামের শহীদ আলী হোসেন গরু দিতে এসেছিলেন বিহারী কসাইদের কাছে। কিন্তু পরে আর ফিরে যাননি। এমনকি লাশেরও কোন সন্ধান পায়নি তার পরিবার। পরিবারের অভিযোগ বিহারী কিলাররা আলী হোসেনকে হত্যার পর লাশ ফেলে দিয়েছিল এই কুয়ায়। সাবেক কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব আক্ষেপ করে জানান, গত আশির দশকেও কুয়াটি ছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার মেয়াদে জায়গাটির মালিকানা বদল হলে ওই জমিতে বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক, ময়মনসিংহ শাখার ভবন নির্মাণ করা হয়। আর এতে সেই কুয়ার বধ্যভূমি চাপা পড়ে। বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের জন্য দুবার এই জায়গায় সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়েছিল। মানববন্ধনও হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করার আবেদনও করা হয়েছিল। অথচ কোন আবেদন নিবেদনেই কাজ হয়নি। প্রশাসনেরও সাড়া মেলেনি। ফলে বধ্যভূমির স্মৃতি চিহ্নটি মুছে এর ওপর ইসলামী ব্যাংক ভবন করা হয়েছে।