২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরিচয় লুকিয়ে ৪৪ পৌরসভায় প্রার্থী দিয়েছে জামায়াত

  • ২০ দলীয় জোটের সমর্থন চায় ২২ পৌরসভায়

বিভাষ বাড়ৈ ॥ দলের নিবন্ধন নেই, তাই পরিচয় গোপন করে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নামে ৪৪ পৌরসভায় মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াত। বাইরে প্রকাশ না করলেও জামায়াত সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে ইতোমধ্যে স্ব স্ব স্থানে নির্বাচন কমিশনে স্বতন্ত্র হিসেবে জামায়াত নেতারা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। ৪৪টির মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের কাছে ২২ পৌরসভায় সমর্থন চায় জামায়াত। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে ইতোমধ্যেই বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে জামায়াতের চাওয়া পাওয়া নিয়ে আপত্তি আছে বিএনপি ও শরিক দলের অনেকেরই। এ অবস্থায় ২০ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে এখনও বিষয়টি পরিষ্কার করা হচ্ছে না। এদিকে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া নিয়ে আপত্তি উঠেছে।

আসন্ন পৌর নির্বাচনে অযোগ্য দল হিসেবে জামায়াতের অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। জামায়াত বা ২০ দলের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা না হলেও ইতোমধ্যেই জামায়াত নেতাদের একটি তালিকা মিলেছে। জানা গেছে, নির্বাহী পরিষদ সদস্য হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম বুলবুল, কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক ইজ্জত উল্লাহ, আবদুর রবের সমন্বয়ে একটি নির্বাচনী কমিটি রয়েছে জামায়াতের। এই কমিটি সারাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং আঞ্চলিক পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে এই ৪৪ প্রার্থীর বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। জামায়াত নেতারা বলছেন, ২০ দলীয় জোটের কাছে যেসব আসনে সমর্থন পাওয়া যাবে সেখানে জোটের অন্য কারও নির্বাচন করা যাবে না। তাহলে অন্য আসনেও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন। এর আগে নিবন্ধন বাতিল হওয়ার জাতীয় নির্বাচনের পর এবার ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভাসহ সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অযোগ্য হয় জামায়াত। আগামীতে স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন নিবন্ধন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন ও প্রতীকে হওয়ায় সে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না বিএনপির রাজনৈতিক এ মিত্র। দলীয়ভাবে নির্বাচন হওয়ায় কেবল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোই তাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ফলে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াত আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ হারায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা জামায়াত। তবে দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে না হওয়ায় এতদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুযোগ পায় এ দলটির প্রার্থীরা। এবার সে সুযোগও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

২০১৩ সালে ১ আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে জামায়াত এর পরই দলীয়ভাবে কোন নির্বাচনে অংশ নেয়ার অযোগ্য হয়ে যায়। তবে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করেছে জামায়াত। সেটির এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব মাওলানা সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ ২৫ ব্যক্তি জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে এক রিট পিটিশন দায়ের করেন। কয়েক দফা শুনানির পর হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১ আগস্ট এক রায়ে, জামায়াতকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দেয়াকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত অকার্যকর মর্মে ঘোষণা করায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়। এ অবস্থায় এবারের নির্বাচনে দলটি কি করতে তা নিয়ে ছিল কৌতূহল। তবে জানা গেছে, ৪৪ পৌরসভায় মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে জামায়াত। একাত্তরে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দলটি রংপুর বিভাগে ৯, রাজশাহী বিভাগে ১৭, খুলনা বিভাগে ১০, সিলেট বিভাগে ৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪ এবং ঢাকা বিভাগে মাত্র একজনকে মনোনীত করেছে। ইতোমধ্যেই স্ব স্ব স্থানে তারা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এই ৪৪টি মধ্যেই জোটের কাছে ২২ পৌরসভায় সমর্থন চেয়েছে দলটি।

জামায়াতের একাধিক নেতা গোপনীয়তার বিষয়টি স্বীকার করলেও বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি, মামলা, গ্রেফতার এড়াতেই মনোনীতদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবে দলের নেতাকর্মীদের কাছে তথ্য আছে। ২০ দলের সমর্থন সম্পর্কে নেতারা বলছেন, কতটি পৌরসভা এলাকায় সমর্থন পাওয়া যাবে, সেটি নিশ্চিত হয়নি। বিএনপিকে জানানো হয়েছে। তবে ন্যূনতম ২২টিতে সমর্থন পাবে এমন দাবি করে জামায়াত নেতারা বলেছেন, এটি অধিকার। সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ দেশের নানা স্থানে আমাদের নেতাকর্মীদের অবদান তো বিএনপির চেয়ে বেশি। এটা অস্বীকার করতে পারবে না বিএনপি। এদিকে শরিকদের বিষয়ে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা শামসুজ্জামান খান ইতোমধ্যেই বলেছেন, জোটের শরিকদের কে কত পৌরসভায় সমর্থন পাবে, এটি নিয়ে জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। দু-একদিনের মধ্যে জোটের বৈঠক হতে পারে। ওই বৈঠকেই জানা যাবে কে কোথায় সমর্থন পাচ্ছেন।

বর্তমানে চারটি স্থানে মেয়র পদে এবং একটি স্থানে প্যানেল মেয়র পদে রয়েছে জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এই পাঁচটি স্থানে কোন ছাড়ের পক্ষে নয় দলটি। এলাকাগুলো হচ্ছে দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জ (মেয়র মাওলানা মোহাম্মদ হানিফ), রাজশাহী বিভাগে গোদাগাড়ী (মেয়র আমিনুল ইসলাম), পবার কাটাখালী (মেয়র মাজেদুর রহমান), রায়গঞ্জ মেয়র মোশাররফ হোসেন আকন্দ) এবং যশোর জেলার চৌগাছায় প্যানেল মেয়র হিসেবে রয়েছেন মাস্টার কামাল আহমেদ।

মনোনয়নপত্র দাখিল করা এলাকার মধ্যে আছে- পঞ্চগড়। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশৈংকল, নীলফামারীর জলঢাকা, সৈয়দপুর, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ। ফুলবাড়ী, গাইবান্ধা, গোবিন্দগঞ্জ, রাজশাহীর পুঠিয়া, গোদাগাড়ী, চারঘাট, তানোর-মু-ুমালা, পবা-কাটাখালী, নওহাটা, নাটোর-সিংড়া, নলডাঙ্গা, নওগাঁ-নজিপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ, নাচোল, রহনপুর, বগুড়া-কাহালু, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ-বেলকুচি, রায়গঞ্জ, খুলনার পাইকগাছা, যশোরের চৌগাছা, কেশবপুর, ঝিনাইদহের মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, মিরপুর, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, দর্শনা, সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া, সিলেটের কানাইঘাট, মৌলভীবাজার-বড়লেখা, কমলগঞ্জ, চট্টগ্রাম বিভাগে আছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ-বসুরহাট, চাটখিল, সীতাকু-। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে আছে- ফরিদপুরের বোয়ালমারী।

অন্যদিকে নিবন্ধনের বিষয়ে জামায়াত এখন কি করবে? এ নিয়ে জামায়াত সূত্রগুলো বলছে, রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে সম্ভাব্য সব পথেই হাঁটছেন দলটির বর্তমান শীর্ষ নেতারা। মানবতাবিরোধী অপরাধে শীর্ষ নেতাদের মুক্তির জন্য চলমান আন্দোলন অব্যাহত রাখবে জামায়াত-শিবির। এ ক্ষেত্রে কিছু কৌশলী কর্মসূচীতে যাবে তারা। অন্যদিকে দলের নিবন্ধন ফিরে পেতে আপীল বিভাগে লড়বে আইনজীবী প্যানেল। তবে শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন ফিরে পাওয়া সম্ভব হবেনা, বরং নিষিদ্ধ হবে-এ কথা ধরে নিয়েই এগোচ্ছেন দলটির নেতারা। সে ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখছেন তারা। জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, একটি মধ্যপন্থী ইসলামী দল হিসেবে আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশগুলোর সঙ্গে জামায়াত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে অনেক আগেই।

এরই ধারাবাহিকতায় পাশের দেশ ভারতের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় জামায়াত। এ জন্য জামায়াতের একটি কূটনৈতিক মিশন কাজ করছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব সফর করে দলের পক্ষে আন্তর্জাতিক লবিংয়ের কাজ করছেন সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। নতুন পরিকল্পনাকে সফল করতে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের আইনজীবী রাজ্জাক এ মুহূর্তে অবস্থান করছেন আমেরিকায়। ছুটে বেড়াচ্ছেন কখনও নিউইয়র্ক, কখনও ওয়াশিংটন বা ক্যালিফোর্নিয়ায়। প্রকাশ্যে তৎপর না থাকলেও ব্যারিস্টার রাজ্জাক নিভৃতে বসে নেই বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে নিউইয়র্কের জামাতী মিডিয়া ও জামাতী মতাদর্শের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে। এ সময় তারা ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ (আইডিএল) নামে তাদের কার্যক্রম চালায়। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকার তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলে জামায়াতে ইসলামী আবারও রাজনীতি করার সুযোগ পায়।

জামায়াত নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় উদ্বেগ, পদক্ষেপ দাবি ॥ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী ও নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াত নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শুক্রবার সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা এ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, জামায়াত দলগতভাবেই যুদ্ধাপরাধী। এটি এখন আর কেবল অভিযোগ নয়, বরং আদালতের বিচারে প্রমাণিত সত্য। শুধু তাই নয়, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদ ফাঁসির আগে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনে এবং জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী সুপ্রীমকোর্টে বিচার চলাকালীন একাত্তরে তাদের স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকা- স্বীকার করে নিয়েছেন।

এ অবস্থায় আগামী ৩০ ডিসেম্বরের পৌরসভা নির্বাচনে তারা অংশ নিতে যাচ্ছেন, যা খুবই উদ্বেগের। বিবৃতিতে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্বশীল ভূমিকা গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা বলেছেন, আমরা আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাত করে জামায়াত সদস্যদের নির্বাচনে প্রার্থিতার বিষয়ে এসব বক্তব্য তুলে ধরেছি। এখন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধান সমুন্নত রেখে জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব।