১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাড়ে তিন লাখ কোটি

সাড়ে তিন লাখ কোটি
  • এডিপির সম্ভাব্য আকার হবে ১ লাখ ১২ হাজার ৯শ’ কোটি টাকা;###;রাজস্ব আয়ের টার্গেট ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯শ’ কোটি টাকা;###;প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ;###;ঘাটতি ৯১ হাজার ১০১ কোটি টাকা

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ আগামী অর্থবছরের (২০১৬-১৭) জন্য আসছে নতুন বাজেট। এর আকার হতে পারে ৩ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা থেকে সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার মধ্যে, যা চলতি অর্থবছরের দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা বেশি। এরই মধ্যে বাজেট তৈরির জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। বাজেট তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণও শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তাছাড়া সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতা পুরোটাই দেয়ার জন্য বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ২৫ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতকে। চলতি অর্থবছরেও এসব খাতে গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে নতুন অর্থবছরের সম্ভাব্য বাজেটের আকারের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়।

বাজেটের পুরো বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উন্নয়ন বাজেট তৈরির দায়িত্বে নিয়োজিত এক কর্মকর্তা। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, বাজেটের এই আকার চূড়ান্ত নয়, এটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। তাছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) বিষয়ে এখনও কাজ শুরু হয়নি। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি এবং নতুন অর্থবছরের এডিপি তৈরির কাজ পাশাপাশি চলবে।

নতুন এ বাজেটকে বরাবরের মতো উচ্চাভিলাষী হিসেবে মনে করছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, চলতি বাজেটে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম শেষ না করে শুধু বরাদ্দ বাড়ালে তা বাস্তবায়নের শঙ্কা থেকেই যায়। নতুন এ বাজেট খুব বেশি আশান্বিত হওয়ার মতো কিছু হবে বলে মনে হয় না। কেননা সরকারী কর্মচারীদের ভাতা কার্যকর করতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। অনুন্নয়ন ব্যয় যেটা ধরা হবে সেটি ব্যয় করা কোন সমস্যা নয়; সেটিতো ব্যয় হবেই। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচী (এডিপি)। এটি বাস্তবায়নের সক্ষমতা না বাড়লে আকার বাড়িয়ে কোন লাভ নেই। অতীতে যেভাবে প্রচুর নতুন প্রকল্প নিয়ে এডিপির আকার বাড়ানো হয়েছিল। আগামী অর্থবছরও যদি তাই করা হয় তাহলে কিছুই হবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে জাহিদ হোসেন বলেন, খাতা-কলমে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) আকার বাড়িয়ে লাভ নেই। এক্ষেত্রে টাকার অঙ্কে আকার বাড়ার চেয়ে প্রকল্প সমাপ্ত করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব বড় প্রকল্প রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে এডিপির আকার না বাড়িয়েও করা যায়। এগুলো প্রকল্পের কাজ শুরু করতে কিংবা বাস্তবায়ন কাজ অব্যাহত রাখতে খুব বেশি অর্থায়ন সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের নতুন বাজেটে ঘাটতি থাকবে ৯১ হাজার ১০১ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটে রয়েছে ৮০ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটে ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ১ লাখ ১২ হাজার ৯শ’ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধি ধরা হচ্ছে ৭ শতাংশ, যা চলতি বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশই ধরা হয়।

প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরার কথা ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সেক্ষেত্রে আগামী বাজেটে সরকার যদি ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেটি হবে বাস্তবতার কাছাকাছি। এটি ভাল উদ্যোগ। কেননা চলতি অর্থবছর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রয়েছে। আমরা (বিশ্বব্যাংক) প্রক্ষেপণ দিয়েছি সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে। কিন্তু বর্তমান যে পরিস্থিতি এতে সাড়ে ৬ শতাংশও প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে যাবে। কেননা অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে আমরা দেখেছি বেশ কিছু বড় প্রকল্পের তালিকা দেয়া হয়েছিল। যেগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছরে বেশ কিছু প্রকল্প শেষ করার কথা ছিল। যেমন ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্প। এটি শেষ হওয়ার তো কোন লক্ষণই নেই। তাছাড়া ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ কিছুটা বাড়লেও রেমিটেন্স প্রবাহ ও বেসরকারী বিনিয়োগসহ বেশ কিছু আর্থিক সূচকের অবস্থা খারাপ। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছরের বাজেটে যেগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়ার কথা ছিল সেগুলো যদি করা না হয় এবং বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে অবকাঠামো সমস্যার সমাধান করা না গেলে আগামী অর্থবছরও ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।

সূত্র জানায়, অষ্টম বেতন স্কেলের আলোকে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পুরো বেতন ও ভাতা পাবেন আগামী অর্থবছরের জুলাই থেকে। তবে এ বছরের জুলাই থেকে নতুন বেতন স্কেলে শুধু বেতন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বেতন ও ভাতা একসঙ্গে কার্যকর করতে আগামী বাজেটে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে এ খাতে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ৬১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। আগামী বছরে বেতন ও ভাতা খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের বিষয়টি বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। অন্যদিকে চলতি বাজেটে নতুন পে-স্কেলে শুধু বেতন দেয়ার জন্য অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বছর কর্মকর্তাদের বেতন খাতে ব্যয় হবে ৬ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা এবং কর্মচারীদের বেতন খাতে ২২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। আর ভাতা খাতে বরাদ্দ রয়েছে ১৬ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ২ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব আয় হচ্ছে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। করবহির্ভূত আয় হচ্ছে ৩৮ হাজার ৯শ’ কোটি টাকা। অবশ্য চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত এ বাজেটে এডিপির আকার ধরা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৯শ’ কোটি টাকা। অবশ্য চলতি বাজেটের তুলনায় এডিপির আকার ১৫ হাজার ৯শ’ কোটি টাকা বেশি ধরা হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নতুন ভ্যাট আইন যদি আগামী বছর জুলাই থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয় তাহলে রাজস্বের ক্ষেত্রে গতি আসবে। সেক্ষেত্রে আবার যেটি খেয়াল রাখতে হবে, সেটি হচ্ছে- এখন যেভাবে আইনটি রয়েছে সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে। কেননা এ আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের চাপ আছে।

বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির বৈঠকে চলতি বাজেটের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, এ সময়ে বাজেটে ৩৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর আওতায় প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। তবে নতুন বাজেট বাস্তবায়নে সকল মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রণালয়গুলো থেকে আয় ও ব্যয়ের হিসাব নেয়া হবে। এরপর বাজেটের আকার চূড়ান্ত করা হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের জন্য করের আওতা বাড়ানো ও আয়করের ব্যাপ্তি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেট বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এর আগে জনকণ্ঠকে বলেন, যেভাবে গত ৫ বছর বাজেটের আকার বেড়েছে এবং সরকার বিনিয়োগ ব্যয় বাড়াতে চাচ্ছে- সেক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরের বাজেট সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকার মধ্যে হলে এটি স্বাভাবিক হবে। কেননা গত অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও আশা করা হচ্ছে লক্ষ্য পূরণ হবে। সেক্ষেত্রে আগামী অর্থবছরেও রাজস্বের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। অর্থনীতি তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলছে। সে বিবেচনায় আগামী বাজেটের এ আকার বাস্তবসম্মত, বাস্তবায়নযোগ্য ও স্বাভাবিক।