২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফেসবুক বন্ধ থাকায় ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্সে ধস

ফিরোজ মান্না ॥ দেশে ফেসবুক বন্ধ হওয়ার পর থেকে ফ্রিল্যান্সিং ও ই-কমার্স ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। ব্যবসা কমেছে মোবাইল অপারেটর ও ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ব্যবসায়ীদেরও। নিরাপত্তার ইস্যুতে ফেসবুক বন্ধ করা হলেও কবে তা খুলে দেয়া হবে তা বলতে পারছেন না কেউ। বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসি, টেলিযোগাযোগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সব কর্তৃপক্ষই বলেছে, যে কোন সময় ফেসবুক খুলে দেয়া হবে। কোন দফতরই সময় বেঁধে কিছু বলছে না। দেশের অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ সময় ধরে চরম সঙ্কটে দিন কাটাতে হচ্ছে। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেই যে প্রভাব পড়েছে তা নয়, এর প্রভাব তরুণ সমাজে আরও প্রকট আকারে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যম দিয়ে দেশ-বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছে না। যারা বিকল্প পথে মাধ্যমটি ব্যবহার করছেন, তাদের প্রতিও সরকারের নজরদারি রয়েছে। দীর্ঘ সময় ফেসবুক বন্ধ থাকায় সরকারের প্রতি একটা বিশাল জনগোষ্ঠী বিরূপ হয়ে পড়েছে।

এদিকে শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভোলার চরফ্যাশনে এক অনুষ্ঠানে বলেন, অচিরেই ফেসবুক খুলে দেয়া হবে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন মনে করবে ফেসবুকসহ যে ১২ এ্যাপলিকেশন বন্ধ করা হয়েছে তা খুলে দেয়া যায়। আমরা তখনই এসব খুলে দেব। কিন্তু এখন পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের এ ধরনের কোন আশ্বাস দেয়নি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে সাময়িকভাবে ফেসবুক বন্ধ রাখা হয়েছে। যখন নিরাপত্তা ঝুঁকি কম মনে হবে তখন ফেসবুক খুলে দেয়া হবে। যারা বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহার করছেন তাদের আইডিও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ব্যবহার রোধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইন্টারনেট চালু রেখে ফেসবুক শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব না। তাই অনেকেই বিভিন্ন এ্যাপস ডাউনলোড করে বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহার করছেন। এটাও বন্ধ করা হবে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, সরকারের নির্দেশে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার ও হোয়াটসএ্যাপ সার্ভিসসহ ১২টি এ্যাপলিকেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকার যখন চাইবে তখনই এগুলো খুলে দেয়া হবে। দেশের নিরাপত্তা যাতে বিঘœ না হয় সেজন্য সরকার আমাদের ওপর এমন নির্দেশ দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসব সাইট চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাখা যায় না। তবে কিছু কিছু খারাপ সাইট যাতে দেখা না যায় সেজন্য ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে ফেসবুক ব্যবহারকারী সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে দেশে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অনলাইন ব্যবসা। কিন্তু ফেসবুক বন্ধ হওয়ার কারণে এখন তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ার উপক্রম হয়েছে। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহার করলেও সেখানে খুব বেশি সাড়া পাচ্ছেন না তারা। ইতোমধ্যে ঢাকার বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো খুলে দেয়ার জন্য ফ্রিল্যান্সারদের মানববন্ধনের মতো ঘটনাও ঘটছে। দেশে ফেসবুক বন্ধ হওয়ার কারণে অনলাইন ব্যবসায় যে প্রভাব পড়ছে তা নিয়ে কয়েক দফায় প্রতিবেদন প্রচার করেছে বিবিসি বাংলা রেডিও। তাদের প্রতিবেদনে সারাদেশের কিছু চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের নিয়মিত অর্ডার পায়। সরকারী নির্দেশে গত ১৭ নবেম্বর থেকে ফেসবুক বন্ধ রয়েছে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেরই ব্যবসায়িক কর্মকা-ে ধস নেমেছে বলে জানাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বাংলাদেশীর নামে ফেসবুক এ্যাকাউন্ট রয়েছে। আর এই সংখ্যার অর্ধেকই হচ্ছে ১৮ থেকে ৩০ বছরের কোটায়। এদের টার্গেট করে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক কর্মকা- চালাচ্ছে।

দেশের অনলাইনে সংবাদ পরিবেশনকারীরা বলছেন, ফেসবুক না থাকার কারণে তাদের পেজে ভিজিটরের সংখ্যা দারুণভাবে কমে গেছে। এই সাইটগুলোর ট্রাফিক অর্ধেকেরও নিচে চলে গেছে। খুব সহজ একটি যোগাযোগ মাধ্যম হওয়ার কারণে বাংলাদেশে ফেসবুকের ব্যবহার খুব দ্রুত বেড়েছে। এর ওপর নির্ভরতাও বেড়েছে।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিদিন তাদের সাড়ে ৪শ’ টেরাবাইট ব্যান্ডউইথ ব্যবহার হতো। এখন ফেসবুক বন্ধের পর ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ৩শ’ টেরাবাইটের নিচে নেমে এসেছে। গ্রামীণফোনের হেড অব কর্পোরেট এ্যাফেয়ার্স মাহমুদ হোসাইন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা বেশিরভাগ সময় ফেসবুক ব্যবহার করেন। এটি খুবই জনপ্রিয় একটি এ্যাপস। এটি বন্ধ থাকার ফলে ব্যান্ডউইথের ব্যবহারের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। ফলে অন্য গ্রাহকরা ব্রাউজিংয়ে গতি বেশি পাচ্ছেন।

এদিকে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি’র সভাপতি এমএ হাকিম সম্প্রতি বলেন, ফেসবুকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ হওয়ার পর ব্যান্ডউইথের ব্যবহার প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

অন্যদিকে টাইমস অব ইন্ডিয়া খবর দিয়েছে, বাংলাদেশে ফেসবুক বন্ধ থাকার কারণে শতকরা ৩০ ভাগ ইন্টারনেট ব্যবহার কমেছে। এতে ইন্টারনেটভিত্তিক অনেক ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীরাও চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন।

জানা গেছে, ফেসবুক বন্ধ হওয়ার পর অনলাইনভিত্তিক ব্যবসায়ীদের দিন খারাপ যাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আইটি সেক্টরের কেউ কোন কথা বলছেন না। এতে আরও ক্ষোভ বাড়ছে। আইটি নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মোটামুটি অনেকগুলো সংগঠন আছে দেশে। আইটি জার্নালিস্টদেরও একটা সংগঠন আছে। এরপরও কারও কাছ থেকেই কোন জোরালো দাবি উঠছে না।

ফেসবুক বন্ধ নিয়ে ই-কমার্স অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ফেসবুক বন্ধ থাকায় আমাদের ব্যবসা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ বন্ধ রয়েছে। কারণ ফেসবুকের কোন বিকল্প আমাদের হাতে নেই। সরকার বলছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য এটি বন্ধ করেছে। এটা না হয় কিছু দিনের জন্য মেনে নেয়া যায়, দীর্ঘ সময়ের জন্য মেনে নেয়া যায় না। সরকার কি অর্থনীতির কথা চিন্তা করবে না? এই চিন্তা মাথায় রেখে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো খুলে দেয়া উচিত। বাংলাদেশে ই-কমার্স সাইট রয়েছে প্রায় এক হাজার ৮০০টি। তাদের প্রোডাক্ট বিক্রির মূল মাধ্যম ছিল ফেসবুক মার্কেটিং। ফেসবুকের মাধ্যমে তারা ক্রেতাদের বিভিন্ন ধরনের অফার দিতেন, যোগাযোগ করতেন, অর্ডারও পেতেন। ই-ক্যাবের তথ্যমতে, এসব ই-কমার্স সাইটের অর্ডার প্রায় ৪৫ ভাগ কমে গেছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রায় চার লাখ তরুণ-তরুণী আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা বিদেশী ক্রেতাদের অর্ডার অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ করেন এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে নিয়ে আসেন। বিদেশে ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের প্রধান কয়েকটি মাধ্যম হচ্ছেÑ ভাইবার, হোয়াটসএ্যাপ ও ফেসবুক। কারণ এসব কাজের জন্য খুব ঘন ঘন বিদেশী ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হয়। এসব যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ থাকায় বিদেশী অর্ডারের পরিমাণ শতকরা ৬৫ ভাগ কমেছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব বন্ধ থাকলে এ খাতে ধস নামবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হিসাবের তথ্য ধরে ই-কমার্স জানিয়েছে, প্রতি মাসে ২শ’ কোটি টাকার লেনদেন হয়। সে হিসাবে গত ২২ দিনে এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পৌনে ২শ’ কোটি টাকা।

তথ্যপ্রযুক্তিবিদরা বলছেন, ফেসবুকের মতো এ্যাপলিকেশন বন্ধ করতে হলে ইন্টারনেটই বন্ধ রাখতে হবে। ইন্টারনেট চালু রেখে এগুলো বন্ধ করা যাবে না। বন্ধ রাখলে সমাজের বেশিরভাগ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা সাইবার ক্রাইম করে তারা ঠিকই বিকল্প পথে তাদের কাজ করে যাবে। কারণ ইন্টারনেটের এতসব জানালা-দরজা যে, কোন না কোন মাধ্যম ব্যবহার করে সব সাইটেই ব্যবহারকারীরা যেতে পারবেন। ইন্টারনেটে হাইসিকিউরিটি ব্যবহারকারী দেশগুলোতেও কোন এ্যাপলিকেশন বন্ধ করে বেশি সময় রাখতে পারেনি। আর দেশে তো ইন্টারনেটের কোন সিকিউরিটিই নেই। এখানে বিভিন্ন প্রক্সি সাভারের মাধ্যমে বিভিন্ন এ্যাপলিকেশনের সঙ্গে সহজেই যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে বিটিআরসি একটি কাজ করতে পেরেছে। সেটা হচ্ছে সাধারণ মানুষজন ফেসবুক, টুইটার, ভাইবারসহ অন্য মাধ্যমগুলো প্রাথমিকভাবে দেখতে পাচ্ছে না। কিছুদিন পর তারাও দেখতে পারবেন।

বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার এ্যান্ড ইনফর্মেশন সার্ভিসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হাবিবুল্লাহ এন করিম বলেন, সামাজিক যোগাযোগসহ অন্যান্য কোন সাইটই বন্ধ করা সম্ভব নয়। যদি শক্তিশালী ইন্টারনেট সিকিউরিটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা না হয়, তাহলে অপারেটরদের নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করা যাবে না। যেসব এ্যাপলিকেশন বন্ধ করা হয়েছে, সেগুলোর কোন সার্ভারই বাংলাদেশে নেই। আমাদের দেশে এসব ব্যবহার হচ্ছে প্রক্সি সার্ভারের মাধ্যমে, যার একটি বন্ধ করলে আরও বহু প্রক্সি সার্ভার উন্মুক্ত থাকছে। উন্মুক্ত ওই সার্ভারগুলোর মাধ্যমে একটার সঙ্গে আরেকটার লিংকআপ তৈরি করে সহজেই যে কোন সাইটে যাওয়া যাচ্ছে।

প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাব্বির বলেন, আসলে কোন সাইটই পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না। বন্ধ করলেও সেগুলো কোন না কোন উপায়ে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরা দেখতে পাবেন। মুশকিলে পড়েন শুধু সাধারণ মানুষ। ইন্টারনেট চালু থাকলে এসব এ্যাপলিকেশন কোনভাবেই বন্ধ করা যাবে না। একেবারে বন্ধ করতে হলে আইআইজি (ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে) বন্ধ করতে হবে।

যুদ্ধাপরাধী সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসির দ- দেশের সর্বোচ্চ আদালত বহাল রাখার পর সরকার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেয়। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহার করে দাঙ্গা ও লুটতরাজ, হিংসা-হানাহানির ঘটনা থেকে জনগণকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বন্ধ রেখে সরকার সমালোচনার মধ্যেই পড়ছে।