২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির খসড়া দলিলে স্থান পেল বাংলাদেশের দাবি

কাওসার রহমান, প্যারিস থেকে ॥ জোর প্রচেষ্টার পর বাংলাদেশের দুই প্রধান দাবি জলবায়ু উদ্বাস্তু এবং জলবায়ু পরিবর্তণের ক্ষয় ও ক্ষতি শেষ পর্যন্ত প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দলিলে ঠাঁই পেয়েছে। গত এক সপ্তাহ দর কষাকষির পর শনিবার সকালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির যে খসড়া দলিল প্রকাশ পেয়েছে তাতে এই দুটি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ৪৮ পৃৃষ্ঠার এই দলিলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধির ব্যাপারে সকল দেশ একমত হয়েছে।

গত দুই দিনে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুটি খসড়া প্রকাশিত হয়। একটি খসড়া দেয় এডহক ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনহেন্সড ডারবান প্ল্যাটফর্ম (এডিপি)-এর কো-চেয়ারপার্সন এবং অন্যটি দেন চেয়ারপার্সন স্বয়ং। এ দুটি খসড়া একত্রিত করে শনিবার প্রকাশিত হয়েছে ৪৮ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত খসড়া দলিল। যা জলবায়ু সম্মেলনের প্রেসিডেন্সির কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এখন কপ প্রেসিডেন্সি নিজের মতো করে এটি কাটাছেঁড়া করে আরও একটি খসড়া চূড়ান্ত করবেন এবং তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য আগামী ৭ ডিসেম্বর থেকে অনুষ্ঠেয় মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থাপন করবেন। এ পর্যন্ত চূড়ান্ত হওয়া খসড়ায় সব দেশ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখতে সম্মত হয়েছে। সেই সঙ্গে প্যারিসে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা বলা হয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলো অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে কোন বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে রাজি হচ্ছে না। যদিও জলবায়ু কনভেনশনে উল্লেখ রয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলো অগ্রাধিকার পাবে।

জলবাযু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হচ্ছে উপকূলের চার কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা। সেই সঙ্গে তাদের আর্থিক ও পেশাগত ক্ষয় এবং ক্ষতি (লস এ্যান্ড ডেমেজ)। কানকুন জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু উদ্বাস্তু ইস্যুটি জলবায়ু আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত হলেও, পরবর্তীতে তা বাদ পড়ে যায়। অন্যদিকে ওয়ারশো জলবায়ু সম্মেলনে লস এ্যান্ড ডেমেজ নিয়ে একটি ম্যাকানিজম গঠন করা হলেও, পেরু সম্মেলনে এসে সেই ম্যাকানিজমের কার্যক্রমও বাদ পড়ে। ফলে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো জোর লবিং করে আসছিল এ দুটি ইস্যুকে মূল প্যারিস চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করতে। সে প্রচেষ্টা আপাতত সফল হয়েছে। যদিও উন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে জলবায়ু উদ্বাস্তু ইস্যুর ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও, তাদের মাইগ্রেশনের ব্যাপারে তাদের আপত্তি আছে। উন্নত দেশগুলো চায় জলবায়ু উদ্বাস্তুদের দেশের মধ্যেই পুনর্বাসন করতে। অন্য দেশে মাইগ্রেশনে তাদের আগ্রহ নেই। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয় ও ক্ষতির ব্যাপারে শুরু থেকেই উন্নত দেশ আপত্তি জানিয়ে আসছে।

এই দুটি ইস্যু যাতে শেষ পর্যন্ত প্যারিস চুক্তিতে থাকে এজন্য বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক লবিং জোরদার করেছে। দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত লাইক মাইন্ডেড গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সমন্বয়কারী ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, এ পর্যন্ত জলবায়ু সম্মেলনে ধারণাগত অগ্রগতি হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় প্যারিসে একটি চুক্তি হবে। তবে তা বাস্তবায়নে আইনী বাধ্যবাধতকা থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘সম্মেলনে অভিযোজন অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি। আর কার্বন নির্গমন দুই ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে লাখতে হলে উন্নত দেশগুলোকে স্বেচ্ছায় কার্বন কমানোর অঙ্গিকার আরও বাড়াতে হবে। অন্যথায় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রীর নিচে রাখার লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না।’

বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক লবিং জোরদার ॥

নিজেদের স্বার্থ আদায়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক কার্যক্রম জোরদার করেছে। বাংলাদেশ চাইছে দ্বিপাক্ষিকভাবে অর্থ প্রবাহ বাড়াতে। শনিবার সকালে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে উভয় দেশই স্বীকার করে নিয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশের উপকূলের বাস্তুচুত্য না হয় সে ব্যাপারে তারা বাংলাদেশে সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়াবে।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত দেশ। কার্বন নিঃসরণ না করেও বাংলাদেশ কার্বন কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। বায়ো গ্যাস, সোলার সিস্টেম প্রভৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্বন কমানোর চেষ্টা করছে। যাতে ২১০০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে থাকে। এছাড়া বাংলাদেশ সামর্থ্য অনুযায়ী নিজেদের অর্থ দিয়ে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলার চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড নামে একটি ফান্ড গঠন করেছে এবং তাতে এ পর্যন্ত ৪০ কোটি ডলার অর্থ বরাদ্দ করেছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ইনটেনডেন্ট ন্যাশনালী কনট্রিবিউশন (আইএনডিসি) পরিকল্পনা প্রণয়ন করে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার অভিযোজন ও কার্বন কমানোর প্রশমন কার্যক্রম করছে। তবে উন্নয়ন কার্যক্রম বিঘিœত না করে বাংলাদেশ স্বেচ্ছায় ৫ শতাংশ এবং শর্ত সাপেক্ষে আরও ১৫ শতাংশ কার্বন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সীমিত সম্পদের কারণে এই কাজ বাংলাদেশের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এজন্য উন্নত দেশগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।

উভয় দেশ বাংলাদেশের এসব কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি দলের নেতা সিনেটর কুরি বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার ভাল ধারণা আছে। বাংলাদেশ জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় প্রশংসনীয় কাজ করছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বাস প্রদান করেন।

যুক্তরাজ্য স্বীকার করে নেয় যে বাংলাদেশ একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ফোরামে সব সময় ইতিবাচক অবস্থান নেয় বলে যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে। প্যারিসে একটি জলবায়ু চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে বাংলাদেশকে আরও সোচ্চার ভূমিকা রাখার আহ্বান জানায় দেশটি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশ সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের বৈঠক ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা দুটি দেশকেই বুঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। তারা আগ্রহ নিয়ে আমাদের কথা শুনেছে এবং এ ব্যাপারে একমত প্রকাশ করেছে।’

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পরিবেশ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সমন্বয়কারী ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, পরিবেশ সচিব ড. কামাল উদ্দিন আহমদ ও প্রতিনিধি দলের সদস্য নুরুল কাদির।