২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ॥ কৃষি জাদুঘর

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। এদেশের কৃষিই সকল কৃষ্টির মূল। কৃষির উন্নতিই আমাদের দেশের উন্নতি। তাই তো আমাদের ঐতিহ্যগত দেশীয় কৃষি যন্ত্রপাতি, উৎপাদন, সংরক্ষণের, প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তি ও কলাকৌশল যোগাযোগ ও বিপণনের প্রাচীন ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়ে লাগসই ও টেকসই কৃষিপ্রযুক্তির আবির্ভাব হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমেই কৃষিতে উন্নয়ন সম্ভব। তাই যুগের ক্রমবিকাশে কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটেছে। প্রাচীনকালে ব্যবহৃত কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আজ বিলুপ্তপ্রায়। আধুনিক শহরের মানুষসহ গ্রামের কৃষকদের সন্তানরাও সেই ঐতিহ্যর কৃষি যন্ত্রপাতি ও কৃষকের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ভুলতে বসেছে। প্রাচীন যুগের কৃষকের ও কৃষি যন্ত্রপাতির সঙ্গে বর্তমান কৃষক ও কৃষির সমন্বয় ঘটাতে বাংলাদেশে কৃষিসংশ্লিষ্ট ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জাতীয় চেতনা ও উপলব্ধিকে শাণিত করতে কৃষির বিবর্তন ও ক্রমবিকাশের পরিষ্কার ধারণা দিতেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) চত্বরে প্রথম কৃষিভিত্তিক ‘কৃষি জাদুঘর’।

ইতিহাসের পাতা থেকে ॥ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে ৫০০ মিটার পশ্চিমে ও বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে সবুজ শ্যামল দেবদারু গাছে ঘেরা মনোরম পরিবেশে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলী দেশের একমাত্র কৃষি মিউজিয়াম এটি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ হোসেন কৃষির বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, কৃষি ও কৃষকের সঙ্গে সম্পৃক্ত রূপসী গ্রাম-বাংলার হারিয়ে যাওয়া ও বিলুপ্তপ্রায় বিভিন্ন ধরনের কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের নিমিত্তে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ‘কৃষি মিউজিয়াম’ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। তারই আলোকে ২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন ভিসি প্রফেসর মু. মুস্তাফিজুর রহমান উক্ত মিউজিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এটি ৬২০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট অষ্টভুজ ভবন। এ সুদৃশ্য ভবনের মধ্যবর্তী অংশ সূর্যালোকের জন্য উন্মুক্ত রেখে প্রবেশ লবিও অফিসের জন্য বর্তমানে একটি করে মোট ২টি অফিস রুম এবং প্রদর্শনীর জন্য ৬টি সুসজ্জিত ও মনোরম কক্ষ রয়েছে। ২০০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রাক্তন ভিসি প্রফেসর ড. মোহাঃ আমিরুল ইসলাম মিউজিয়াম ভবনের শুভ উদ্বোধন করেন। জনবল সঙ্কট ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক কারণে এটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে। অবশেষে ২০০৭ সালের ৩০ জুন সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. মোশারফ হোসাইন মিঞাঁ মিউজিয়ামটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেন।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ॥ বাংলাদেশের কৃষি সংশ্লিষ্ট ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জাতীয় চেতনা ও উপলব্ধিকে শাণিতকরণ এবং কৃষির বিবর্তন ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা প্রদান। বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় কৃষি উপকরণাদি নমূনা সংগ্রহ, মডেল তৈরি, সংরক্ষণ, তথ্যায়ন, গবেষণা ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থাসহ শিক্ষা ও তথ্য সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ।

ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, গবেষক ও সম্প্রসারণ কর্মীদের জন্য দেশের কৃষির ঐতিহ্য ও বিবর্তনের সামগ্রিক অবস্থা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশ্বের কৃষি প্রযুক্তির সর্বশেষ অগ্রগতিবিষয়ক তথ্যাবলী সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ সহযোগে উপস্থাপন। আগ্রহী কৃষি কর্মী ও কৃষকদের জন্য সাধারণ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা গ্রহণ। সংরক্ষণসহ অপরাপর নিদর্শনাদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা গ্রহণ। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মিউজিয়ামের সঙ্গে তথ্যাদি ও উপকরণের পারস্পরিক বিনিময় ও সহযোগিতা প্রদান।

অবস্থান ও পরিকল্পনা ॥ কৃষি মিউজিয়াম ভবনসংলগ্ন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে পাঁচ একর জায়গা রয়েছে যা উন্নতি সাধন করে অদূর ভবিষ্যতে সেখানে বিরল উদ্ভিদ প্রজাতিসমূহের চাষ, ঔষধি গাছসমূহ রোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা এছাড়াও বিলুপ্তপ্রায় শস্যাদির চাষ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। এক কথায় বিলুপ্তপ্রায় গাছপালা ও শস্যদির জীবন্ত মিউজিয়াম গড়ে তোলাও মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা রয়েছে।

উপকরণ সংখ্যা ॥ এ পর্যন্ত কৃষি মিউজিয়ামে সংগৃহীত ও প্রদর্শিত উপকরণের সংখ্যা প্রায় চার শতাধিক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বিভিন্ন অঞ্চলের লাঙ্গল, জোয়াল, মই, বিন্দা, নিড়ানী, কাঁচি, মাতলা, ঢেঁকি, গাইল, ডুলি, ঢালা, সের, পোয়া, যাঁতি, মটকা, তেলের ঘানি, হাল চাষের মডেল, বিভিন্ন প্রকার শস্য বীজ, বিভিন্ন প্রকার মাটি, মাছ ধরার বিভিন্ন প্রকার উপকরণাদি, কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের খনার বচনসহ কৃষকের বসতবাড়ির নমুনা ইত্যাদি।

উপকরণ সংগ্রহ ॥ মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ সাধারণত দুই ভাবে উপকরণ সংগ্রহ করে থাকে। ক) অর্থের বিনিময়ে এবং খ) দান/সৌজন্য (কৃষি মিউজিয়ামে কোন সংস্থা/ব্যক্তি কোন কিছু দান করলে স্বীকৃতিস্বরূপ তার নাম ও ঠিকানা উপকরণের পাশে লিখে রাখা হয়)।

প্রদর্শনীর সময়সূচী ও নিয়ম ॥ শনিবার ছাড়া সপ্তাহে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। বর্তমানে প্রদর্শনীতে কোন টাকা নেয়া হয় না তবে অদূর ভবিষ্যতে টিকেটের বিনিময়ে মিউজিয়াম পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান কর্তৃপক্ষ।

শেষকথা ॥ কৃষিসংশ্লিষ্ট এত বিশাল সংগ্রহশালা দেশের ভেতর আর কোথাও নেই। তবে শহরের ইট, পাথর কাঁচঘেরা মানুষের মনের খোরাক তথা রূপসী বাংলার প্রকৃতি ও হারিয়ে যাওয়া দৃশ্য একনজরে উপভোগ করার জন্য কৃষি মিউজিয়ামে আসতে পারেন। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য কৃষি মিউজিয়াম পরিদর্শন, বাংলাদেশের কৃষি, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অনন্য পরিচায়ক হতে পারে। বিশেষ করে নগরায়নের ফলে শহরের সঙ্গে গ্রামীণ জনপদের দূরত্ব বেড়েই চলছে। ফলে নগরের বাসিন্দাদের জন্য বাকৃবির কৃষি মিউজিয়াম কিষান-কিষানিদের জীবনযাত্রা এবং ব্যবহারের বেশ খানিকটা আমেজ পাওয়া যেতে পারে।

মোঃ শাহীন সরদার