১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভেষজ চাষে সম্ভাবনা

  • এস এম মুকুল

চিকিৎসার জন্য ভেষজ উদ্ভিদের উপর নির্ভরশীলতা চিরায়ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীর প্রায় ৭০ ভাগ লোক রোগের নিরাময়ক হিসেবে ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করছে। ইউনানী, আয়ুর্বেদীয়, এলোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, কবিরাজিসহ বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ভেষজ উদ্ভিদ দিয়ে ওষুধ তৈরি করে থাকে। বিশ্বব্যাপী ভেষজ ওষুধের বাজার দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, ২০৫০ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে ভেষজের বাণিজ্য হবে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশও এই বাণিজ্যের অংশীদার। প্রায় শতকোটি টাকার ঔষধি কাঁচামালের স্থানীয় বাজার সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে এ বাজার বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনাও উঁকি দিচ্ছে।

চাহিদা বাড়ছে দেশে

ভেষজ উৎপাদনে চমৎকার সহায়ক প্রাকৃতিক পরিবেশ বাংলাদেশে বিদ্যমান। দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ থাকলেও ওষুধ শিল্পে বর্তমানে ১০০ ধরনের উদ্ভিদ থেকে দেড় শতাধিক ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়। ইউনানী, আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি ওষুধ উৎপাদনে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি বিউটি পার্লারেও প্রসাধন শিল্পে এখন প্রচুর পরিমাণে ভেষজ উপাদান ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ভেষজ উদ্ভিদের চাহিদা বেড়েছে। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেসরকারী উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদের চাষাবাদ ও উৎপাদন শুরু হয়েছে।

ভেষজের আন্তর্জাতিক বাজার

যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদিআরব, কুয়েত, কাতার, পাকিস্তান, কোরিয়া ভেষজ উদ্ভিদের প্রধান আমদানিকারক দেশ । বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বে শুধু ঔষধি উদ্ভিদের বাজার রয়েছে ৬২ বিলিয়ন ডলারের। এই বিশাল বাজারের অধিকাংশই ভারত ও চীনের দখলে। অন্যদিকে ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভেষজসামগ্রী আমদানি করে থাকে। অথচ দেশের ওষুধ শিল্পে বর্তমানে যে পরিমাণ ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহৃত হয়, তার ৭০ ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। কেবল প্রয়োজন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিক উদ্যোগ।

আফাজ পাগলার ঔষধিগ্রাম

নাটোরের ‘খোলাবাড়িয়া’ একটি গ্রামের নাম। গ্রামের বৃক্ষপ্রেমিক আফাজ পাগলা বাড়ির পাশে ৫টি ঘৃতকুমারীর গাছ রোপণ করেছিলেন বছর ত্রিশেক আগে। সেই ঘৃতকুমারীরর গাছই বদলে দিয়েছে গ্রামটির নাম। খোলাবাড়িয়া এখন ঔষধি গ্রাম নামেই পরিচিত। গ্রামের প্রায় ষোলশ পরিবারের জীবিকা ঔষধি গাছের ওপর নির্ভর করছে। গ্রামে মোট ২৫ হেক্টর জমিতে ঔষধি গাছের চাষাবাদ করা হচ্ছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ভেষজ উদ্ভিদ বিক্রির দোকান। বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য সেখানে গড়ে উঠেছে ‘ভেষজ বহুমুখী সমবায় সমিতি’। এর মাধ্যমে ক্রেতা-বিক্রেতা আর উৎপাদনকারীর সমন্বয়ে জমে উঠেছে ভেষজ বিপ্লব।

আফাজ পাগলের ১৭ কাঠার চাষী জমিতে ৪৫০ প্রজাতির ভেষজ নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছে। গ্রামে এ রকম আরও ৮টি নার্সারি আছে। বাসক, সাদা তুলসী, উলটকম্বল, চিরতা, নিম, কৃষ্ণতুলসী, রামতুলসী, ক্যাকটাস, সর্পগন্ধা, মিশ্রিদানা, হরীতকী, লজ্জাবতীসহ হরেক রকমের ঔষধি গাছ এসব নার্সারিতে পাওয়া যায়। ঔষধি গ্রামের এই ভেষজ চাষাবাদ এখন ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবেশী গ্রামগুলোতেও। এ যেন এক ভেষজ বিপ্লব কাহিনী। আফাজ পাগলার দেখানো পথেই ঘটেছে এই ভেষজ বিপ্লব।

গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম

‘ঔষধি গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের ২৪ গ্রাম। এসব গ্রামের আদিবাসীরা ঔষধি গাছের নার্সারি করে ভাগ্যের পরিবর্তনে দিনরাত খেটে যাচ্ছেন। ‘সোসাইটি ফর বায়োডাইভারসিটি কনজারভেশন’ (এসবিসি) নামের সংগঠনটি ২০০৮ সাল থেকে ঝিনাইগাতী উপজেলার পাহাড়ী গ্রামসহ সীমান্তবর্তী ৪ ইউনিয়ন কাংশা, নলকুড়া, ধানশাইল ও গৌরীপুরের ২৪ গ্রামে ৩৭টি কৃষকমৈত্রী সংগঠনের মাধ্যমে ঔষধি গাছ রোপণ ও পরিচর্যার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে।

ভেষজ উদ্ভিদের চাষকে যদি আরো জনপ্রিয় করে তোলা যায় এবং সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে ভেষজ উদ্ভিদ চাষের বিস্তার ঘটানো যায়, তবে কেবল আমদানী ব্যয় হ্রাসই নয়, বিদেশেও রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

writetomukul36@gmail.com