২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি ভেবে দেখা হচ্ছে ॥ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ একাত্তরে যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানের সঙ্গে স্থায়ীভাবে সবধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের প্রচ- দাবি উঠেছে সর্বত্র। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারী একাত্তরের খুনী ও ব্যর্থ এ রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের দাবিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের মতোই একাট্টা হচ্ছে স্বাধীনতার পক্ষের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ। নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন তারা। শনিবার এক অনুষ্ঠানে প্রবল দাবির মুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী জানিয়েছেন, সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি মূল্যায়ন করছে। কী করা দরকার সেটি নিয়েও ভাবছি। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকি জল্লাদদের ভয়াল গণহত্যার ঘটনা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হলেও এ নিয়ে দেশটির নির্লজ্জ মিথ্যাচারে বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে গোটাদেশে। সে সময়ের গণহত্যার বিষয়টি পুরো অস্বীকার করে খুনী এ রাষ্ট্রের হাস্যকর বিবৃতির কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে একাত্তরে বিজয়ী বাংলাদেশ সরকার। শুধু সরকারই নয়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ও রণাঙ্গণের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানকে সরাসরি ‘না’ বলে দেয়ার দাবিতে মাঠে নেমেছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, খোদ পাকিস্তানের সাধারণ মানুষও একাত্তরে তাদের দেশের সেনাবাহিনীর গণহত্যার নির্মমতাকে অস্বীকার করার প্রতিবাদ এবং বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য তাদের সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছে।

একাত্তরের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী ও আলবদর কমান্ডার কুখ্যাত আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ এবং আরেক একাত্তরের খুনী-যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পরই পরাজিত পাকিস্তান ইতিহাস বিকৃতি ও নির্লজ্জ মিথ্যাচারে নেমে পড়ে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ করে সরকারীভাবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ঔদ্ধর্ত্যপূর্ণ বক্তব্য রাখে পাকি সরকার। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার তলব করে এর কড়া প্রতিবাদ জানায়।

জবাবে গত ৩০ নবেম্বর পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে ডেকে একাত্তরের গণহত্যার দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করে খুনী রাষ্ট্র পাকিস্তান। শুধু তাই নয়, সম্পূর্ণ কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে একাত্তরে গণহত্যার দায় অস্বীকারের পাশাপাশি ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিকৃত ব্যাখা দেয় পাকিস্তান। এরপর থেকেই মূলত পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি ওঠে দেশের নানা মহল থেকে।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর পাকিদের এমন ঔদ্ধর্ত্যপূর্ণ বক্তব্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ। স্থায়ীভাবে পাকিস্তানের সঙ্গ ছেদের প্রথম দাবি ওঠে আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কারণ এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েই একাত্তরে গণহত্যা শুরু করেছিল পাকিস্তান। বিষয়ের ঊষালগ্নে পাকি জল্লাদরা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেছে বেছে হত্যা করেছিল জাতিকে মেধাশূন্য করতে।

সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সর্বসম্মতিক্রমে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের প্রস্তাবটি পাস হয়। পহেলা ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বিজয় মিছিল থেকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আআমস আরেফিন সিদ্দিক ঘোষণা দেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র বা শিক্ষক প্রতিনিধি আগামী সময়ে পাকিস্তানে যাবেন না। শুধু ঢাবি কর্তৃপক্ষই নয়, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, মুক্তিযুদ্ধ ৭১, গণজাগরণ মঞ্চসহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে অবিলম্বে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছেদ করার জোর দাবি জানানো হয়।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে আরেফিন সিদ্দিক বলেন, একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই গণহত্যা চালায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। এরপর ২ ডিসেম্বর পুনরায় এ বিশ্ববিদ্যালয়েই গণহত্যা চালিয়ে শেষ করে তাদের মিশন। সুতরাং এ রকম একটি দেশের সঙ্গে ঢাবির সম্পর্ক রাখার কোনই সুযোগ নেই। পাকিস্তানকে একটি ‘নির্লজ্জ রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, একাত্তরে পাকিস্তান যে এ দেশে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায় সে ব্যাপারটি বিশ্ববাসীর কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। হামিদুর রহমানের কমিশনের প্রতিবেদনেও বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। কিন্তু তারা এখন তা অস্বীকার করছে। সুতরাং এ ধরনের একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে কোন ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক আর একদিনও রাখার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

বিশ্লেষকদের মতে, ৪৪ বছরেও পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে পারেনি পাকিস্তান। একাত্তরে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মাথানিচু করে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হলেও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করে রাখতে পাকিস্তান এখনও যে তাদের সহযোগীদের মদদ দিয়ে যাচ্ছে এটা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ‘মাস্টার মাইন্ড’দের বিচার হওয়াতে তাই অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে পড়েছে খুনী এ ব্যর্থ রাষ্ট্রটি। তাদের রাজনীতিকদের বিভিন্ন মন্তব্যে মনে হচ্ছে না বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম কোন রাষ্ট্র। তাদের বক্তব্যে মনে হয় বাংলাদেশ যেন তাদেরই কোন প্রদেশ। পার্লামেন্টে বা মাঠে ময়দানে শুধু মন্তব্য করে থেমে নেই, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে চালাচ্ছে নেতিবাচক প্রচার। এ অবস্থায় পাকিস্তানকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কূটনৈতিকভাবেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া জবাব দিচ্ছে বাংলাদেশ।

শনিবার বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতির ৪৪তম বার্ষিকী উপলক্ষে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত ‘কালের কষ্টিপাথরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানেও বক্তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছেদের দাবি তোলেন। এমন দাবির জবাব দিতে গিয়ে অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, ‘তাদের (পাকিস্তান) সঙ্গে সম্পর্ক আমরা অবশ্যই এ্যাসেসমেন্ট (মূল্যায়ন) করছি। কী করা দরকার, সেটিও ভাবছি। কিন্তু সম্পূর্ণ জিনিসটা একটি চলমান প্রক্রিয়া।

এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ১৯৭১ সালের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষা অতটা শক্ত ছিল না, কিন্তু তিনি ক্ষমা চেয়েছিলেন। আসমা জাহাঙ্গীর, হামিদ মীরসহ পাকিস্তানের অনেক বিশিষ্ট নাগরিকও যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।