২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যেদিকে চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদ, মধ্যখানে মৌমাছির নাচানাচি

  • মুন্সীগঞ্জের সাতগাঁও চকে মৌ চাষ

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ ॥ সাতগাঁও চক। হলদে রঙে ছেয়ে গেছে গোটা বিল। যে দিকে চোখ যায় শুধুই হলুদ আর হলুদ। অন্য বিলে সবুজে মেলা থাকলেও সাতগাঁও চকে যেন হলুদের মেলা বসেছে। এটি আর কিছু নয় সরিষার বাগান। তাই শ্রীনগর উপজেলার বীরতারা ইউনিয়নের কয়েক একরের বিশাল এই চক যে কারোর দৃষ্টি কাড়বে। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের হাসাড়ার কোয়াটার কিলোমিটার পূর্বদিকে বি চৌধুরীর রোডের পাশেই এ বিল। দূর থেকেই বোঝা যায় এর জৌলুস। কাছে আসতেই দেখা মিলবে প্রকৃতির আরেক বিস্ময়! হলুদ রাজ্যে মৌমাছির ব্যস্ততা। মনে হবে কাবিতার পঙ্্ক্তি “মৌমাছি মৌমাছি, কোথা যাও নাচি নাচি, দাঁড়াও না একবার ভাই, ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে, দাঁড়াবার সময়তো নাই...।” মধুসমৃদ্ধ ফুলের খোঁজে ওদের সারাক্ষণ ছুটাছুটি। চষে বেড়ায় দূর-দূরান্ত। উদ্দেশ্য একটাই- মধু সংগ্রহ করা। আর ওরা নিজেদের অজান্তেই ঘটিয়ে চলে ফুলের পরাগায়নের কাজটি। বাস্তবতা হলো- সময়ের পরিক্রমায় মৌমাছির শ্রমও যেন কমে এসেছে। এখন আর দূরের কোন বন-বাগানে ফুলের খোঁজে ওদের দীর্ঘ পথ উড়ে যেতে হচ্ছে না। এক শ্রেণীর বাণিজ্যিক মৌচাষী পালিত মৌমাছি নিয়ে যাচ্ছে ফসলের ফুল ফোটা জমিতে। আর সেখানে অজস্র ফুল থেকে মধু আহরণ করে মৌচাকে জমা করছে মৌমাছির দল। এতে মৌচাষী আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকও বাড়তি উপার্জনসহ পরাগায়নের মাধমে জমিতে বাড়তি ফসল উৎপাদন করছে। মৌমাছির আহরিত মধু আবার নিয়ে আসা হচ্ছে নানা কৌশলে। সহজ এ পন্থায় কৃষকের এখন বাড়তি আয়।

সরিষা চাষের পাশাপাশি মৌমাছির খামার করে স্বাবলম্বী হচ্ছে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার সাতগাঁও গ্রামের কৃষক। মৌমাছির মধু আহরণের কর্মযজ্ঞ চলছে এখানে। দিনভর মৌমাছি তিল তিল করে মধু এনে জমাচ্ছে মৌচাষীর পেতে রাখা বাক্সে। আর সেই বাক্স থেকে সুকৌশলে মধু কেটে বের করে আনছেন মৌচাষী। এ দৃশ্য এখন এ এলাকায় নিত্যদিনের। হেমন্তের অগ্রহায়ণ আসতেই বসেছে এ কর্মযঞ্জ। তবে সপ্তাহ খানেক ধরে তা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। মৌমাছি আর কৃষকের ব্যস্ততা যেন প্রকৃতির নয়নাভিরাম হলুদ রাজ্যে একাকার হয়ে গেছে। ভোরের শিশির বিন্দু ঝরছে ফুলে ফুলে। ভোরের সূর্য উঠতেই শুরু হয়ে যায় মৌমাছির মধু সংগ্রহের ব্যস্ততা। তা চলে সূর্যের আলো নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। আর সকাল, দুপুর, বিকেল প্রতিটি ক্ষণেই যেন প্রকৃতির নানারূপ ভর করে সাতগাঁওয়ের এই মধুপল্লীতে।

ঢাকার সুরিটোলার মৌচাষী বেলায়েত হোসেন বংশ পরম্পরায় বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছির চাষ করছেন। ছোট-বড় মিলিয়ে মৌমাছির চারটি ভ্রাম্যমাণ বাক্সবন্দী খামার রয়েছে তার। দেশের চারটি অঞ্চল থেকে তিনি এখন ফসলি জমিতে বাক্সবন্দী মৌমাছি নিয়ে গিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন। এবার সাতগাঁও বিলে ১০৫টি বাক্সে একটি ছোট মৌমাছির খামার নিয়ে বসেছেন। মৌমাছিগুলো বাক্স থেকে নির্দিষ্ট পথে বের হয়ে সরিষা ক্ষেতের ফুলে ফুলে বসে মধু সংগ্রহ করে ফিরে আসছে বাক্সে। আর বাক্সের ভেতরে থাকা বিশেষ ফ্রেমে মৌচাকে মধু জমা করছে। প্রতিটি বাক্সে রয়েছে সাত থেকে ১০টি ফ্রেম। বেলায়েত হোসেন জানান, অন্যান্য বছরের মতো এবারও তিনি সাতগাঁওয়ের সরিষা জমি থেকে মৌমাছির আহরিত মধু সংগ্রহ করছেন। প্রতি পাঁচ-ছয় দিন পর পর বাক্সের ফ্রেম থেকে মৌচাক কেটে মধু সংগ্রহ করে চলেছেন। প্রতিটি বাক্সে ১০ থেকে ১২ কেজি মধু পেয়ে থাকেন তিনি। পাঁচ বছর ধরে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে মধু সংগ্রহ করে তিনি আজ স্বাবলম্বী। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিন বছর আগে জাতীয় প্রেসক্লাবে মৌ সম্মেলনে তিনি শ্রেষ্ঠ মৌচাষীর পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। এলাকাবাসী মোহন মোড়ল জানান, গেল বছরের চেয়ে এবারের এ মধু আর সরিষা আরও বেশি প্রসারিত হয়েছে। মৌমাছির যেন এলাহি কা-। সরষে জমির কয়েক হাত পরপর বসানো বাক্সগুলো আর মৌমাছির আনাগোনা দেখে মন যেন প্রকৃতির সঙ্গে একাকার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অদিধফতরের উপ-পরিচালক হুমায়ুন কবির জানান, মৌমাছির এ চাষ শুধু মৌচাষীকেই স্বাবলম্বী করছে না। বরং দেশের শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করছে। সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি এক ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে অন্য ফুলে গিয়ে বসছে। এতে মৌমাছির পায়ে পায়ে এক ফুল থেকে অন্য ফুলে পরাগায়ন হচ্ছে। এতে ফসলের উৎপাদন বেড়ে যাচ্ছে ১৫ থেকে ২০ ভাগ।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, যথাযথ প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণের অসুবিধা দূর এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। বহির্বিশ্বে ফসলের পরাগায়নের জন্য এ জাতীয় মৌচাষীদের অর্থ দিয়ে জমিতে নিয়ে যেতে হয়। আর আমাদের দেশে উল্টো জমির মালিককে টাকা দিয়ে জমি থেকে মধু আহরণ করতে হচ্ছে। অনেকটা অসচেতনতা থেকেই কৃষকরা তাদের জমিতে এসব মৌমাছির মধু সংগ্রহে বাধা দিয়ে থাকে। তাদের ধারণা, শস্যক্ষেত থেকে মৌমাছি মধু নিয়ে গেলে শস্যের উৎপাদন ব্যাহত হবে। এজন্য কৃষকদের সচেতন করতে জাতীয় উদ্যোগ দরকার বলে অভিজ্ঞরা মনে করেন।

পরিবেশবিদ মোঃ আরিফুর রহমান জানান, এ মধু দেশের জন্য লাখ-কোটি ডলারের ব্যবসায়ে পরিণত করা সম্ভব। এতে সৃষ্টি হবে বহু কর্মসংস্থান। দেশে মধু চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের মধুর এখনও অনেক চাহিদা রয়েছে। বছরের ৬ মাস দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মধু সংগ্রহ করা হলেও দেশে মধু প্রক্রিয়াকরণ কারখানা নেই। অথচ ইউরোপের দেশগুলোতে মাত্র ৬ সপ্তাহ চলে মধু সংগ্রহের কাজ। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ টন মধু উৎপাদন সম্ভব এবং তা বিদেশে রফতানিরও একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। শুধু মধু নয় রাণী মৌমাছি, মোম ও আঠাও রফতানি সম্ভব।