১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্যাংকের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জে দিশেহারা গ্রাহক

  • সেবা চার্জ ব্যাংকের ভেতরে উন্মুক্ত রাখার বিধান থাকলেও রাখা হচ্ছে আড়ালে-আবডালে;###;অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা ॥ গবর্নর

রহিম শেখ ॥ গ্রাহকদের কাছ থেকে বেপরোয়া সার্ভিস চার্জ আদায় করছে কিছু বেসরকারী ও বিদেশী ব্যাংক। এ্যাকাউন্ট খোলার কাগজ প্রসেসিং থেকে শুরু করে এ্যাকাউন্ট ক্লোজিং-সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করছে ব্যাংক। ডিপোজিটর কিংবা লোন এ্যাকাউন্টধারী কোন গ্রাহকই বাদ যাচ্ছে না ব্যাংকের অতিরিক্ত চার্জ কর্তনের কবল থেকে। বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক পরিদর্শনেও ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত চার্জ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এসব সেবা চার্জ ব্যাংকের ভেতরে উন্মুক্ত রাখার বিধান থাকলেও রাখা হচ্ছে আড়ালে-আবডালে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত বা হিডেন চার্জ ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের প্রতারণা। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবর্নর।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কয়েকটি বেসরকারী ব্যাংকে প্রতিবছর একটি হিসাবের বিপরীতে একজন গ্রাহকের সার্ভিস চার্জ বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। এর মধ্যে হিসাব পরিচালন ফি ৫০০ টাকা ও এটিএম কার্ড ফি ৫০০ টাকা। বিভিন্ন সময় ব্যাংকটি এসএমএস পাঠানো ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের জন্যও বছরে ৫৭৫ টাকা কেটে রাখছে। কোন গ্রাহক এসএমএস পেতে আগ্রহী না হলেও এ চার্জ নেয়া হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা না দিলেও গ্রাহকের কাছ থেকে গণহারে এ ফি নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু ক্ষেত্রে তফসিলি ব্যাংকের বিভিন্ন সেবার সর্বোচ্চ চার্জ আদায়ের সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন বেসরকারী ব্যাংক এ সীমার বাইরে গিয়ে তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছে দেশে পরিচালিত বিদেশী ব্যাংকগুলো। তারা বিভিন্ন সেবার বিনিময়ে ‘গলাকাটা’ অর্থ গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, নির্ধারিত সার্ভিস চার্জের বাইরে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত অর্থ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করছে কিনা এটি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর মনিটরিং করা হচ্ছে। যেসব ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ বেঁধে দেয়া হয়েছে সেগুলোও মনিটরিং করা হচ্ছে। যেসব খাতে সার্ভিস চার্জ বেঁধে দেয়া হয়নি সেগুলোতে ব্যাংকগুলো মাত্রাতিরিক্ত চার্জ আদায় করছে বলে আমরা অভিযোগ পাচ্ছি। এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে নিয়মিতভাবে। সময় সময় নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ব্যবস্থা।

সম্প্রতি ব্যাংকের অতিরিক্ত বা হিডেন চার্জের বিষয়টি নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। গত রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ অনুষ্ঠানে ব্যাংকের অতিরিক্ত বা হিডেন চার্জ সম্পর্কে মুখ খুলেছেন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সভাপতি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার। তিনি বলেন, হিডেন চার্জ ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের প্রতারণা। ব্যাংকিং সেবার এ চার্জ সম্পর্কে গ্রাহক জানেন না। অথচ নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকের এ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা। এসব সেবা চার্জ ব্যাংকের ভেতরে উন্মুক্ত রাখার বিধান থাকলেও রাখা হচ্ছে আড়ালে-আবডালে। একই অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে গবর্নর ড. আতিউর বলেন, গ্রাহককে না জানিয়ে কোন ব্যাংক কোন প্রকার চার্জ কর্তন করতে পারবে না। এ ধরনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ওই ব্যাংকের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, ব্যাংকগুলোকে সেবা চার্জ দৃশ্যমান জায়গায় রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বহু আগে। সেক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। কনজ্যুমার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট (ক্যাব) ও সাবেক দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, হিডেন চার্জ প্রক্রিয়াটি বন্ধ করা উচিত। কারণ এটা এক ধরনের প্রতারণা।

হিডেন চার্জের মাধ্যমে গ্রাহক তথা ভোক্তা প্রতারিত হচ্ছে বলে মত দেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র চালুর পর থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৬ হাজার ৫৬০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে গেল অর্থবছরেই এসেছে ৩ হাজার ৯৩০টি। এর অর্থ ব্যাংকের সেবা পেতে গ্রাহকদের প্রতিনিয়ত নানা হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হতে হচ্ছে। সাধারণ ব্যাংকিং, ঋণ ও অগ্রিম, স্থানীয় ও বৈদেশিক বিল, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, ব্যাংক গ্যারান্টি, মোবাইল ব্যাংকিং কিংবা রেমিট্যান্স সেবা সব ক্ষেত্রেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন গ্রাহক। এসব সেবার সঙ্গে চার্জের বিষয়টিও জড়িত রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রমের ওপর প্রণীত বার্ষিক প্রতিবেদনে আলোচিত ১০টি অভিযোগ নিষ্পত্তির কেস স্টাডিও উল্লেখ করা হয়েছে। কেস স্টাডি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে গ্রাহকের সঙ্গে অনিয়মের পাশাপাশি হয়রানিও করা হয়েছে। এসব অনিয়মের ক্ষেত্রে হিডেন ব্যাংকিং কাজ করেছে। গ্রাহককে সত্যটা বুঝতে দেয়া হয়নি। বর্তমানে ব্যাংক খাতে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার বেশি মন্দ ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) করা হয়েছে। এখানেও গোপনীয়তার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম বলেন, আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকার কম হবে না। যেভাবে ঋণ অবলোপনের হিসাব দেখানো হচ্ছে, তা সঠিক নয়। এখানে শুভঙ্করের ফাঁকি আছে। প্রকৃত চিত্র এটা নয়। শুধু রাইট অফ দেখানো হচ্ছে। সুদের হিসাব নেই। তিনি আরও বলেন, ২০০২ সালে রাইট অফ পদ্ধতি শুরু করা হয়। ৫ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে যে ঋণ উত্তোলন সম্ভব হয় না, তা নিয়মিত খাতায় না লিখে আলাদা খাতায় লেখার নামই রাইট অফ বা ঋণ অবলোপন। মন্দ ঋণ নিয়মিত খাতায় থাকলে ব্যাংকের লেনদেনে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সে কারণে আলাদা খাতায় লেখা হয়। এর অর্থ আরও যতœসহকারে অবলোপিত ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রক্রিয়াটি চালু রয়েছে। এ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে তারা ঋণ আদায় করছে। কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। এখানে রাইট অফ মানে ওই ঋণ আর পাওয়ার আশা নেই। একইভাবে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।