১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘ব’তে বাবা, ‘ব’তে বন্ধু

  • অঞ্জন আচার্য

বলি বলি করেও কথাগুলো বাবাকে বলতে পারছে না গদ্য। অথচ এতদিন পর্যন্ত বাবা ছিল তার সেরা বন্ধু। কলেজ থেকে ফিরে বাবাকে সব কথা না বলা পর্যন্ত স্বস্তি পেত না সে। এ বছর গদ্য এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চলছে জোর প্রস্তুতি। চলছে কোচিং। সেই কোচিংয়েই পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে তন্বী নামের এক মেয়ের সঙ্গে। তন্বী যতদিন সাধারণ বন্ধু ছিল ততদিন কোন সমস্যা হয়নি। বাবার সঙ্গেও পরিচয় হয়েছে তন্বীর, ওদের বাসায়ও এসেছে সে। মাত্র কয়েক দিন আগেই সম্পর্কটা মোড় নিয়েছে অন্যদিকে। তন্বীর ফেসবুক প্রোফাইলে দেখা যাচ্ছে ‘ইন আ রিলেশনশিপ’। কিন্তু এই ঘোষণাটা জোরেশোরে এখনও দিতে পারছে না গদ্য। কারণ বাবাও যে রয়েছেন তার ফ্রেন্ডলিস্টে। বাবাকে না জানিয়ে এমন একটি ঘোষণা দিলে তিনি নিশ্চয়ই কষ্ট পাবেন। আবার কথাটা বলতেও সঙ্কোচ বোধ করছে সে। এদিকে একটু অভিমান নিয়েই মুখ ভার করে রেখেছে তন্বী। সব মিলিয়ে বেশ সঙ্কটেই পড়েছে গদ্য।

গদ্যের মতো এমন সঙ্কটে পড়ছে আজকাল কিশোর-কিশোরী। এটা সত্য, গত দশ-পনেরো বছরে অনেক বদলে গেছে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক। আজ থেকে ত্রিশ বা চল্লিশ বছর আগে আমাদের সমাজে বাবারা ছিলেন রাশভারী ব্যক্তিত্বের মানুষ। সেসময় সন্তানরা খোলামেলা কথা বলতে ভয় পেত বাবার সঙ্গে। পরিবারের কর্তাসুলভ এক বিশাল দূরত্বে ছিল তাদের অবস্থান। এমনকি বয়সে একটু বড় হলে ভাইবোনরাও কেমন যেন মাপা দূরত্বে অবস্থান করত। বিশেষ করে মনের কথা পরিবারের কারও কাছেই খুলে বলা সহজ ছিল না তেমনভাবে। কিন্তু অবস্থাটা পাল্টে গেছে ধীরে ধীরে। এখন বাবা-মা হয়ে উঠছেন সন্তানের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। এখন হয়ত দেখা যায়, ফেসবুকে কিংবা সামাজিক যোগাযোগের অন্য মাধ্যমগুলোতে বন্ধুর তালিকায় রয়েছেন বাবা-মাও। তখন আবার সৃষ্টি হতে পারে অন্য সঙ্কটের। এখানে বাবা যেন বন্ধু হয়েও ঠিক বন্ধু নন, এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে বাবা যত বেশি বন্ধু হয়ে উঠবেন, সন্তানের পক্ষে ততোই সহজ হবে জীবনের কঠিন পথে হাঁটা।

বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ষোল বছর বয়স হলে পুত্রের সঙ্গে বাবাকে আচরণ করতে হবে ‘মিত্রবৎ’ অর্থাৎ বন্ধুর মতো। বর্তমান যুগে ছেলেমেয়ে দুজনেরই বন্ধু হয়ে উঠতে পারলে বাবা-সন্তান দুজনের জন্যই সম্পর্কটা সহজ হয়। এই যেমন বলিউড কিং শাহরুখ খানের কথাই ধরা যাক। উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দিয়েই বলি, শাহরুখের পরবর্তী ছবির নাম ‘এক্কিস তপ্পন কি সালামি’, যার কাহিনী গড়ে উঠেছে বাবা-ছেলের সম্পর্ক নিয়ে। সেই ছবি নিয়ে এক আলোচনায় কিং খান মন্তব্য করেন, ‘বাবা-ছেলের সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুর মতো।’ পিতৃত্ব সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি হলো, ‘আমি আমার তিন সন্তানের সুস্বাস্থ্য কামনা করি। আমার সবচেয়ে সুখ হলো, আমি যখন কাজ শেষে ঘরে ফিরি, তখন আমার সন্তানদের উষ্ণ সান্নিধ্য পাই। আমার সন্তানদের জড়িয়ে রাতে ঘুমাই, তাদের নরম দেহের ছোঁয়াতেই আমার সুখ।’ আর তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর মূলমন্ত্রই হচ্ছে বন্ধুত্ব। সেই জন্য মেনে চলতে হবে কিছু বিষয়।

১. সন্তানের সাথে বন্ধু হওয়ার প্রাথমিক উদ্যোগ বা দায়িত্ব নিতে হবে বাবা-মা দুজনকেই এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হবে উভয়ের মাধ্যমে।

২. ছেলেমেয়ের সাথে কথোপকথনের সময় তাদের সম্মান দিতে হবে। কোন বিষয়ে তাদের সরাসরি ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করা উচিত নয়।

৩. অন্য কার সাথে সন্তানের তুলনা না করাই উত্তম। কারণ এতে করে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়।

৪. আজকালের কিশোর-কিশোরীরা চিন্তা করে স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার। তাই তাদের প্রতি অতিরিক্ত বিরক্তবোধ করা মোটেও ঠিক নয়। একাকী থাকতে বা কিছুটা সময় নিজের মতো কাটাতে দেয়া উচিত তাদের। এর জন্য সময় বের করতে হবে পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে। তবে পাশাপাশি এটাও লক্ষ রাখতে হবে, স্বাধীনতার নামে যেন সন্তান বিপথগ্রস্ত না হয়।

৫. ছবি দেখা বা কেনাকাটায় একসাথে যাওয়া সন্তানকে সময় দেয়ার অন্যতম উপায়। এছাড়া পারিবারিক ট্যুরে ঘুরে আসা যায় যেকোন দর্শনীয় জায়গা থেকে। আবার সপ্তাহে বা মাসে সময় বের করে একসাথে কোন এক রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করতে পারলে তো কথাই নেই।

৬. সন্তানের ভাল কাজের প্রশংসা করতে হবে। তাহলে তারা কাজে উৎসাহী হবে। ভাই-বোনের মধ্যে কখনো বিভেদ আনার চেষ্টা করা উচিত নয়। উভয়ের মানসিকতাই সমানভাবে বোঝার চেষ্টা করতে হবে বাবা-মা দুজনকে।

৭. আগ্রহী করে তুলতে হবে সামাজিক মেলামেশায় এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যেতে হবে একসাথে। তবে এ কথা মনে রাখতে হবে, কোনভাবেই জোরজবস্তি করা উচিত নয়, যদি না সে যেতে চায়।

৮. সন্তানের আগ্রহের বিষয়গুলোতে অংশ নেয়া প্রতিটি বাবা-মায়ের অবশ্য কর্তব্য। জেরা না করে গল্পের ভঙ্গিতে বন্ধুদের কথা জেনে নিতে পারেন। পাশাপাশি অন্য বিষয়গুলোও জানা যেতে পারে কৌশলে।

৯. ঘরের মধ্যে সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে এক সাথে খেলার ব্যবস্থা করা বন্ধুত্বের অন্যতম উপায়। যেমন : দাবা, লুডু, ক্যারাম ইত্যাদি খেলতে পারেন যেকোন অজুহাতে।

১০. ভুল-ত্রুটি নিয়েই আমাদের বসবাস। কিশোর বা তরুণ বয়সে সন্তানদের ভুল হবেই। তাদের ভুলগুলো সহজভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতেই বকাঝকা না করে শুনতে হবে, বুঝতে হবে তাদের কথা। তা না হলে পরবর্তী সময়ে কোন ভুল করলে তা শেয়ার করবে আপনার সঙ্গে।

১১. সবশেষে বলি, প্রতিটি মানুষরই নিজস্ব একটা জগত থাকে। সেই জগত একান্তই তার। সন্তানের সেই জগতে প্রবেশ করতে হলে বাবা-মাকে ধৈর্য ধরতে হবে। ইতিবাচক বিষয়ে সম্মান দেখাতে হবে এবং নেতিবাচক বিষয়ে বন্ধুত্বপরায়ণ সমাধান বের করতে হবে। তবেই হবে সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক, যা অটুট থাকবে চিরকাল।

মডেল : ওমর সানি

ও তার ছেলে